মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

‘ভয়ংকর সিদ্ধান্ত’

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার ০১:৫০ পিএম

‘ভয়ংকর সিদ্ধান্ত’

ঢাকা : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাদের নির্যাতনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট তীব্র ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

আবরারকে ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মী নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার পর ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধে গত শুক্রবার দেওয়া বুয়েট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

সুশীলসমাজ, দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, অভিভাবক, অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করা থেকে ছাত্রসমাজকে দূরে রাখতে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন বিষয়টিকে ‘ভয়ংকর অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং সব ধরনের বিরোধী মত ও তার ভিত্তিতে সংগঠিত শক্তিকে দমনের হাতিয়ার’ বলে মনে করছে। এমনকি ছাত্রলীগ, বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলসহ বেশির ভাগ ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পক্ষে নয়।

ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের দাবি, বুয়েটে ছাত্রদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য ছাত্রলীগের গত প্রায় ১১ বছর ধরে নির্যাতন, অন্যায় ও অনিয়মই দায়ী।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির হলে হলে ছাত্রলীগের নেতাদের টর্চার সেল ও ছাত্রদের ওপর নির্যাতনসহ নানা কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। বাস্তবে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছাত্ররাজনীতির ওপর নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

আবরার হত্যাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বুয়েটে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ছাত্রলীগের একচ্ছত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অগণতান্ত্রিক আচরণ ও দখলদারির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। গত এক দশকে বুয়েটে মূলত সেভাবে ছাত্ররাজনীতিই ছিল না।

সেখানে রাজনীতির নামে ছিল ছাত্রলীগের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্যাতন। বিরোধী কোনো ছাত্রসংগঠন ওই ক্যাম্পাসে কাজ করতে গেলে নির্মমভাবে তাদের দমন করা হয়েছে বলেও তাদের দাবি।

দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের মতে, চলমান পরিস্থিতিতে বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত স্বস্তিদায়ক।

ছাত্ররাজনীতির নামে যে অপরাজনীতি ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি চলছে, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তার অবসান হওয়া জরুরি। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনেই রাজনীতির নামে গুন্ডাবাজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সংঘাত ও সহিংসতাসহ নানা অপকর্মে শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছে।

নিজেদের অধিকার কিংবা দাবি নিয়ে তারা অবশ্যই কথা বলবেন, তবে তা হতে হবে দলীয় ব্যানারের বাইরে থেকে। রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার হওয়ার প্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে হবে। তারা রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পেছনে অনেক সময় শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা থাকে।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এ প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংগঠনিক রাজনীতি চলবে কি না, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে।

যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ দিয়ে চলে, তারা তাদের অধ্যাদেশ অনুযায়ী এবং বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিটি তাদের নিজস্ব আইন দ্বারা পরিচালিত হয়।

এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক রাজনীতি চলবে না বন্ধ হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। বুয়েটে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে হয়তো অপরাজনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ সবকিছু একটি ভূমিকা পালন করেছে।’

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় আশঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলে মৌলবাদী ও জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এছাড়া প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে যাবে, যা মোটেই শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণ হবে না।’

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হবে। আর এটির জন্য ছাত্রলীগই দায়ী থাকবে। কারণ তারাই ক্যাম্পাসগুলোতে দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি চালু করেছে। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলে প্রশাসনের স্বৈরাচারিতা বাড়বে।’

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করাকে ‘একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল’ উদ্যোগ বলে দাবি করেন ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা।

তিনি বলেন, ‘যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কথিত ছাত্ররাজনীতি বন্ধ আছে, সেখানেও প্রকাশ্যে ছাত্রলীগ ও গোপনে ছাত্রশিবিরের তৎপরতা আছে। এ ছাড়া প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র সেখানে প্রবলমাত্রায় চালু থাকবে।’

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট।

জোটের অভিযোগ, বাস্তবে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছাত্ররাজনীতির ওপর নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার বিষয়টি ‘ভয়ংকর অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং এটি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি প্রতারণা’ বলেও জোটের দাবি।

বুয়েটে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলটিমেটামের পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য ড. সাইফুল ইসলাম শুক্রবার (১১ অক্টোবর) বিকালে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন।

এ সময় জোর করতালিতে এ সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানান সমবেত শিক্ষার্থীরা। গত ৯ অক্টোবর গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘বুয়েট কর্তৃপক্ষ চাইলে ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ করতে পারে।’

তবে প্রধানমন্ত্রী সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধে অনাগ্রহ প্রকাশ করে জানান, ‘তিনি নিজেও ছাত্রজীবনে রাজনীতি করেছেন।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে ছাত্রসংগঠন তথা শিক্ষাঙ্গনে দুর্বৃত্তায়িত অসুস্থ রাজনৈতিক প্রভাবের নিষ্ঠুর পরিণতি উল্লেখ করে অবিলম্বে বুয়েটসহ দেশের সব ছাত্রসংগঠনসহ শিক্ষাঙ্গনকে সম্পূর্ণ দলীয় রাজনীতিমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।

বুয়েটের রাজনীতির বিষয়টি নিয়ে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এক বিবৃতিতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ছাত্র সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছে।

লেজুড়বৃত্তির ছাত্র সংগঠনের বিপক্ষে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনও বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি ‘লেজুড়বৃত্তি’ হওয়ার পরিণামে আজ সারা দেশ ভুগছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই