শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

মহাজোটের আসন বণ্টন চূড়ান্ত, ঘোষণা রোববার

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৮, শুক্রবার ১০:০৪ পিএম

মহাজোটের আসন বণ্টন চূড়ান্ত, ঘোষণা রোববার

ঢাকা : মহাজোটের ঐক্য অটুট রেখে একাদশ সংসদ নির্বাচনে টানা তৃতীয় মেয়াদে জয় চান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও নেতাদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জোটের ঐক্য অটুট রাখতে হবে, নির্বাচনে আমাদের জিততে হবে। যেখানে যাকেই প্রার্থী ঘোষণা করব, তার পক্ষেই কাজ করতে হবে।’

বুধবার ও গত রাতে গণভবনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা একের পর এক দেখা করতে গেলে তিনি এমন হুঁশিয়ারি দেন বলে জানা গেছে।

এদিকে রোববার (২৫ নভেম্বর) ঘোষণা করা হচ্ছে মহাজোটের প্রার্থীদের নামের তালিকা। ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগ ও জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও শুক্রবার রাতে কিংবা শনিবার (২৪ নভেম্বর) মহাজোটের শরিকদের সঙ্গে আরেকবার বসছেন মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্রমতে, জোটের ঐক্য ঠিক রাখা ও ‘বিদ্রোহী’ এড়াতে জোটগতভাবে প্রার্থী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই প্রার্থী ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।

জোটের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, জোটগত প্রার্থী ঘোষণা না করা হলে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থী থেকে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। সে কারণে জোটের শীর্ষ নেতারা আসন বণ্টন চূড়ান্ত করেই একযোগে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর মহাজোট শরিকদের কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে নিজ নিজ দল থেকে তারা বহিষ্কৃত হবেন। আসন বণ্টন চূড়ান্তকালে এটিও ঠিক করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতা জানান, এবার মহাজোটকে সর্বোচ্চ ৭০টি আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান শরিক জাতীয় পার্টিকে ৪৫, ওয়ার্কার্স পার্টিকে ৫, জাসদ দুই অংশকে ৪, তরিকত ফেডারেশন ও জেপিকে ১ বা ২, যুক্তফ্রন্টকে সর্বোচ্চ ৪, জাকের পার্টিকে ১টি আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ৬০টি আসন নিতে সিদ্ধান্তে অনড়। জাপাসূত্র মনে করছে এটি তারা পাবেন।

আওয়ামী লীগ সূত্র বলেছেন, যোগ্য প্রার্থী হলে অর্থাৎ বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলে ছাড় দিতে আপত্তি নেই। বুধবার (২১ নভেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত। আমরা ৬৫ থেকে ৭০টি আসন ছেড়ে দেব মহাজোটের প্রার্থীদের। জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা শেষে ২৫ নভেম্বর রোববার জোটগতভাবে চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণা করা হবে।’

দল ও মহাজোট প্রার্থীদের পক্ষে অনড় থাকতে বললেন প্রধানমন্ত্রী : বুধবার রাতে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত নেতাদের সঙ্গে গণভবনে অনির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি এ সময় আগত নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে কথা শোনেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। দল ও জোট প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। কোনোরকম হেরফের হলে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। রাত ৮টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত গণভবনে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র জানান, বৈঠকে ঢাকা মহানগরী সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার কবির বলেন, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বর্তমান এমপি সুকুমার রঞ্জন এবার নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এ আসনের মানুষ দুটি দিক থেকে ভোট দেয়, হয় জনপ্রিয় প্রতীক অথবা জনপ্রিয় প্রার্থী। প্রতীক ও প্রার্থী দুটিই যদি অজনপ্রিয় হয় তাহলে নির্বাচনে জয়লাভ করা কঠিন হবে।

এ সময় গোলাম সরোয়ার কবিরকে বসতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। গোলাম সরোয়ার কবির আবার বলেন, নেত্রী আমার মতো এখানে অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আছেন। সবাই এমপি হতে চান। তবে আমি চাই আপনি আগামীতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হোন।

তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তুমি আমাকে প্রধানমন্ত্রী চাইবা, আবার জোটের বিপক্ষে বলবা? এটা কিন্তু চলবে না। দলকে ক্ষমতায় আনতে হবে। জামায়াত-বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না। দল ক্ষমতায় এলে সবাইকে মূল্যায়ন করা হবে। আমি যাকেই প্রার্থী করব, তার পক্ষেই কাজ করতে হবে।

এ সময় টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকার জাতীয় পার্টির এমপির বিরুদ্ধে কথা বলেন নেতারা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জোটের ঐক্য অটুট রাখার পক্ষে মত দিয়ে জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বলেন। নাটোর সদর আসনের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন এক মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে চান এখানে শিমুলের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থী কে?

জবাবে নেতারা জানান রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। এ সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুলুর বিরুদ্ধে জিততে পারে এমন একজন শক্তিশালী প্রার্থীর নাম বল? জবাবে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের নাম বলা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাকে তো এমপি-প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছিলাম। জরিপে তার নামই নেই।

এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন চাঁদপুর-৩ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী রেদওয়ান খান বোরহান। তিনি বলেন, আপা, চাঁদপুর-৩-এ নৌকা চরে ঠেকে আছে। কেন এবং কোন চরে নৌকা ঠেকে আছে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী।

জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান এমপির নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের কারণে ‘হানচরে’ নৌকা ঠেকে আছে। তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে পাস করতে পারবেন না। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কথা ঠিকমতো বলবা। দীপু মনির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আছে তা জানি না। কেউ বলতে পারবে না তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কথা হিসাব করে বলবা।

নরসিংদী-৩ আসনে সাবেক এমপি জহিরুল হক ভুইয়া মোহন বর্তমান এমপি সিরাজুল ইসলাম মোল্লার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে তো দলের মনোনয়ন দিলাম। পাস করতে পারনি। আবার কথা কও? তখন মনোনয়ন দিলাম ফেল করলা কেন?

জবাবে মোহন বলেন, বিএনপি-জামায়াত সিরাজুল ইসলাম মোল্লাকে হেলপ করছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকার তোমার সঙ্গে থাকার পরও জিততে পারনি? আবার মনোনয়ন চাও? এ আসন থেকে তোমরা কয়জন মনোনয়ন চাও? জবাবে মোহন বলেন, আমরা ছয়জন আছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা সবাই মিলে একজনের নাম দাও। কারও নাম বলতে পারনি।

হাতিয়ার মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে কথা বলেন উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে মোহাম্মদ আলীর মদদে ১৯ জন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছে। বরগুনা সদর আসনের এমপি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন জেলা সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির।

তিনি বলেন, এবার তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে নৌকার জয়লাভ সম্ভব নয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এমপির বিরুদ্ধে বলে দলের মনোনয়ন পাওয়া যাবে না। আমি সবদিক যাচাই-বাছাই করেই দলীয় মনোনয়ন দেব। যাকে প্রার্থী করব তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। এমপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করা মানেই নৌকার বিরোধিতা করা। এটা বরদাশত করব না।

সোনালীনিউজ/এমটিআই