শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬

খামারিদের উদ্বেগ, সরকার বলছে ‘কথার কথা’

মাংস আমদানির সিদ্ধান্তে ‘ধোঁয়াশা’

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার ০৭:৫৭ এএম

মাংস আমদানির সিদ্ধান্তে ‘ধোঁয়াশা’

ঢাকা : ‘বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে রপ্তানি হবে আরো বেশি পোশাক। আর সেখান থেকে বাংলাদেশ আসবে গরুর মাংস’- এমন তথ্যের ভিত্তিতে দেশের খামারিদের মধ্যে দারুণ উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিদেশ থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি না করার দাবি জানিয়েছে এ খাতের সংশ্লিষ্ট ১০টি সংগঠন।

তবে বিষয়টি ‘কথার কথা’ বলে ব্যাখ্যা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ এখনো নেয়নি। মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির আলোচনায় কথা প্রসঙ্গে এ প্রস্তাব উঠেছিল।’

তবে এ নিয়ে খামারিদের উদ্বেগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরাই পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে বিষটি জেনেছি। এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’

প্রসঙ্গত, গত মাসের শেষ দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল মারকোসারভুক্ত অন্যতম চার দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে সফর করেছিলেন। এরপর ওই সফরে ব্রাজিলে পোশাক রপ্তানি ও মাংস আমদানি নিয়ে কথা হয়েছিল বলে জানা যায়। এরপর খামারিসহ সংশ্লিষ্ট ১০টি সংগঠন হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বর্তমান সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে বলে দাবি করেছে। এরপর তারা সেটি বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দেশি খামারি, উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই মর্মে গরুর মাংস আমদানি বন্ধের দাবি জানায়। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে গত সোমবার।

এদিকে গতকাল এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মাসের (বিডিএফএ) সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, সরকার ব্রাজিল থেকে গরুর মাংস আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের দেশের অনেক ছোট ছোট উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ কারণেই আমরা আগেভাগে এর বিরোধিতা করছি। কারণ দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়ে গেলে সেটা বাতিল করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আহকাব) সভাপতি এম নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, দুই দেশের সরকারের মধ্যে এ বিষয়টি আলোচনা করা হচ্ছে। তাই এর বিরোধিতা করা হচ্ছে।

দেশে মাংসের দাম গত কয়েক বছরে অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় বিদেশ থেকে বড় আকারে গরুর মাংস আমদানির প্রস্তাব নিয়ে গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু খামারি ও উৎপাদনকারী পর্যায়ে সবসময়ই এর বিরোধিতা করা হয়। এর আগে গত বছর জানুয়ারিতে এফবিসিসিআইয়ের সে সময়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছিলেন, বাজারে গরুর মাংসের দাম অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে গরুর মাংস আমদানির সিদ্ধান্ত হলে তা বাস্তবসম্মতই হবে।

সে সময় খামারিদের উদ্বেগ আর নানামুখী আলোচনার মধ্যে তখনকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেছিলেন, দেশীয় খামারিদের কথা মাথায় রেখে সরকার মাংস আমদানি করবে না। আমদানি ঠেকাতে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করা হবে।

দেশে এখন গরুর মাংস আমদানি বন্ধ রয়েছে সেটা কিন্তু নয়। সর্বশেষ তথ্যনুয়ায়ী পাঁচ বছরে বিদেশ থেকে বাংলাদেশের মাংস আমদানির ব্যয় বেড়ে প্রায় চার গুণ হয়েছে। যেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭ লাখ ২৮ হাজার ডলারের মাংস আমদানি হয়েছিল, তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ৭৯ হাজার ডলার। এ সময় বিশ্বের ১৪টি দেশ থেকে মাংস আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ভারত হচ্ছে সর্বোচ্চ আমদানির উৎস। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে গরুর মাংস আমদানি হয়।

এদিকে তথ্য বলছে, চলতি ২০১৯ সালের এপ্রিল-জুলাই মেয়াদে ভারত হতে মোট মাংস আমদানি হয়েছে ৫৪৭ টন। এ হারে আমদানি করা হলে ভারত থেকে বছরে মাংস আমদানির পরিমাণ হবে প্রায় ১ হাজার ৮৬১ টন। আর ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশ থেকে যে পরিমাণ মাংস আমদানি করা হয়েছিল সে হারে আমদানি হলে চলতি বছরে মোট আমদানি করা মাংসের পরিমাণ হবে প্রায় আড়াই থেকে ৩ হাজার টন।

যদিও দেশে প্রতি বছর বাড়ছে মাংসের উৎপাদন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের চাহিদা হিসেবে বার্ষিক মোট চাহিদা ৭২ দশমিক ৯৭ লাখ টন। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি থেকে মাংস উৎপাদিত হয়েছে ৭৫ দশমিক ১৪ লাখ টন। অর্থাৎ ২ দশমিক ১৭ লাখ টন মাংস উদ্বৃত্ত রয়েছে। এর মধ্যে গরু-ছাগলের মাংস উৎপাদন প্রায় ৫৫ শতাংশ।

ফলে সম্প্রতি মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এ কারণে বিশ্বের চার দেশে মাংস ও মাংসজাত পণ্য রপ্তানিও শুরু হয়েছে। মালদ্বীপ, দুবাই, কুয়েত ও কোরিয়ায় বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২ কোটি ডলারের মাংস ও মাংসজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

তবে এরপরও দেশের বাজারে কমছে না মাংসের দাম। যেখানে ২০১৩ সালে রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ছিল ২৫০ টাকা, তা এখন বেড়ে সাড়ে ৫০০ টাকায় উঠেছে। তথ্যানুসারে দেশে ২০১৪ সালের ২৮০ টাকা, ২০১৫ সালে ৩০০ টাকা, ২০১৬ সালে ৩৭০ টাকা, ২০১৭ সালে ৪৫০ টাকা  এবং ২০১৮ সালে ৫০০ টাকা ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে কিছু ভোক্তা ও ব্যবসায়ী মাংস আমদানির পক্ষে অবস্থান নেন বারবার। কারণ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এখন ৩০০ টাকার নিচে মিলছে এক কেজি মাংস। ফলে দেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ভারত থেকে হিমায়িত মাংস আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছিল কয়েকবার। ভারতেরও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছিল।

কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণে বলছে, এখন দেশে শিক্ষিত বেকার যুবকরা গরু পালন ও গরু মোটাতাজাকরণ কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গরু কেনা, গরু লালন-পালন, গরুর সংকরায়ণ, দুগ্ধজাতীয় খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিপণন খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে গরুর মাংসের দাম কমে যাবে বলে অনুমিত হয়। এ কারণে মাংস আমদানি বাড়লে এসব খামারির ক্ষতি হবে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণ আদায় কঠিন হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই