শুক্রবার, ২৪ মে, ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

মায়ের সম্মান

আজহার মাহমুদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মে ২০১৯, রবিবার ০২:০৬ পিএম

মায়ের সম্মান

ঢাকা : ‘মা’ অতি ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এর গুরুত্ব এবং মর্যাদা কতটুকু তা বলে শেষ করা যাবে না। মা হচ্ছেন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী, যিনি গর্ভধারণ, সন্তানের জন্ম তথা সন্তানকে বড় করে তোলেন। প্রকৃতিগতভাবে একজন নারী বা মহিলাই সন্তান জন্ম দেওয়ার অধিকারিণী। গর্ভধারণের মতো জটিল এবং মায়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অবস্থানে থেকে এ সংজ্ঞাটি বিশ্বজনীন গৃহীত হয়েছে। মা, কখনো গর্ভধারিণী, জন্মদাত্রী আবার কখনো জননী, মাতা। মাকে নিয়ে যতই সমার্থক শব্দ থাকুক না কেন, মা ডাকের একটিই অর্থ আর তা হচ্ছে পৃথিবীর সব শান্তি একটি জায়গায়। আর সবশেষ, ভালোবাসার অপর নামও ‘মা’।

কিন্তু এমন দয়ালু এবং মর্যাদাবান মানুষটিকে আমরা কতটা সম্মান এবং ভালোবাসা দিচ্ছি? যে মানুষটি দীর্ঘ ১০ মাস ১০ দিন তার গর্ভে ধারণ করে প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করে সুন্দর এই পৃথিবীতে মুক্তভাবে শ্বাস নিতে দিচ্ছে, আমরা সেই মানুষটিকে বিনিময়ে কী দিচ্ছি? আমরা বিনিময়ে আসলে কিছুই দিতে পারব না। কারণ মায়ের ঋণ কেউ শোধ করতে পারে না। কিন্তু আমাদের যতটুকু মাকে দেওয়ার কথা ততটুকুই কেউ সঠিকভাবে দিই না।

তার মানে এই নয় যে, টাকা কিংবা ভালো খাবার দিলেই মায়ের প্রতি দায়িত্ব শেষ। টাকা কিংবা ভালো খাবার কোনো মা কখনো চায় না। আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি, মা আমাদের জন্য কী করে বা মূলত আমাদের কী দেয়? কয়জন মা তার সন্তানকে ভালো খাবার কিংবা প্রচুর টাকা দিচ্ছে। কয়জন মা তার সন্তানকে দামি গাড়িতে করে দামি শপিংমলে নিয়ে যাচ্ছে। না। এসব কিছুই সব মা দিতে পারেন না। কিন্তু এসব কিছু মায়ের ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ ব্যাপার। কারণ মা যা দিচ্ছে, তা পৃথিবীর কেউ কখনোই দিতে পারবে না। আমরা শপিংমলের দামি কাপড়টি কিংবা রেস্টুরেন্টের দামি খাবারটি পরে আবার পাব। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা একবার হারিয়ে ফেললে তা কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব না। কারণ পৃথিবীতে একমাত্র সন্তান আর মায়ের সম্পর্ক হয় ভালোবাসার।

যাহোক, মূল কথায় আসি, প্রতিটি সন্তান জানে আমাদের মা আমাদের জন্য কতটা কষ্ট করে এবং কতটা ভালোবাসে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, আমরা আমাদের মাকে কতটা ভালোবাসি। আমরা যখন বাইরে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিই তখন মা ডাকলে অনেকেই বিরক্ত বোধ করি।

কিন্তু একবারো চিন্তা করি না মা কেমন আছে, সে কার সঙ্গে কথা বলছে, তার কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। আমরা এসব একটুও ভাবি না। আমরা এমনিতেই সমাজের সামনে লোক দেখানো মায়ের প্রতি ভালোবাসা অধিক পরিমাণে দেখাই। ‘মা দিবস’ এলে লাফিয়ে লাফিয়ে বলি মা আমি তোমাকে ভালোবাসি।

ফেসবুকে মায়ের জন্য ভালোবাসার বাণী লিখি। কিন্তু ভেতরে আমরা কী করি সেটা আমাদের চাইতে ভালো কেউ বলতে পারবে না। আমরা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বড় বড় রেস্টুরেন্টে গিয়ে নামিদামি খাবার খেয়ে থাকি। কিন্তু একবারো কি ভেবে দেখেছি মা তখন কী খাচ্ছে? না, সত্যি বলতে কখনোই এমনটা ভাবিনি আমরা। অসুস্থ হলে মা আমাদের জন্য জীবনটা দিয়ে দিতেও প্রস্তুত থাকে। কখনো খেলায় কিংবা অন্য কোথাও আহত হলে মায়ের অবস্থা কেমন হয় সেটাও আমরা নিজেরাই দেখেছি। কিন্তু আমরা মায়ের অসুস্থতার সময় কী করেছি?

 কখনো জানতে চেষ্টা করেছি, ‘মা তুমি কেমন আছ।’ কখনো কি জানতে চেষ্টা করেছি ‘মা তোমার শরীর ভালো আছে?’ আমরা কিন্তু সামান্য মাথাব্যথা হলেও মাকে এসে বলি, ‘মা আমার ভালো লাগছে না।’ কিন্তু মায়ের গুরুতর অসুখের কথাও আমাদের কখনো বলে না কিংবা আমরা জানতে চেষ্টা করি না।

শরীরে অসুস্থতা নিয়েও রান্না করে যায় আমাদের পছন্দের এবং প্রিয় খাবারটি। ঘরের সব কাজ নিশ্চুপভাবে করে যায়। বুঝতে দেয় না কষ্ট হচ্ছে। মা কখনোই বলে না আর পারছে না। আর আমরা কয়জনেই বা বুঝতে চেষ্টা করি। আমরা যখন বুঝতে শিখি কিংবা একটু বড় হয়ে যায় তখন আর মাকে মূল্যই দিই না। মায়ের ভুল ধরতে শুরু করি। মা আমাদের কিছু বারণ করলেও আমরা সেটা তেমন তোয়াক্কা করি না। আমরা নিজেদের মতো নিজেরাই চলি।

এদিক থেকে চিন্তা করলে আমরা নিজেরাই বিবেকহীন এবং অসৎ। আমাদের সমাজে এমনও অনেক মানুষ রয়েছে যারা আজ মাকে ভালোবাসতে চাইলেও পারছে না। কারণ তাদের মা নেই। সমাজে এমনও কিছু সন্তান রয়েছে যারা তার জন্মদাত্রী মায়ের শরীরে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না। আমার কথা হচ্ছে সম্মান দিতে না পারলেও মাকে কেন অসম্মান করব। কোন অপরাধে মায়ের ওপর আঘাত করব।
শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে মাকে আমরা অনেকেই এখন আঘাত করে থাকি। কিন্তু বুঝে আসে না সেই মাগুলোর অপরাধ কী ছিল। আমরা অপরাধ করলে মা সবসময় ক্ষমা করে দেয়। মা শুধু চায় আমরা যেন ভালো থাকি এবং সুন্দর থাকি। মা যদি না-ফেরার দেশেও চলে যায় সন্তানের মঙ্গল কামনা সেখান থেকেও করবে। কারণ সে তো ‘মা’। মা চায় আমরা শুধু তাকে মা বলে ডাকি আর একটু ভালোবাসি। কিন্তু আমরা মাকে ‘মা’ ডাকার মতো সময়ও আজকাল পাই না।

একবার চিন্তা করে দেখি তো আমরা দিনে কয়বার মাকে ‘মা’ বলে ডেকেছি। আমরা যতটাই বড় হচ্ছি ততটাই মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনও সন্তান রয়েছে যাদের মা আজ বৃদ্ধাশ্রমে। হায়রে মা! ক্ষমা করে দিও তাদের। যেদিন তুমি থাকবে না সেদিন হয়তো তোমাকে অনেক অনেক খুঁজব আমরা, কিন্তু পাব না।

লেখক : প্রাবন্ধিক


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।