রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬

মুক্তিযুদ্ধে কামালপুর রণাঙ্গন

জামালপুর প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার ০৯:৪৫ পিএম

মুক্তিযুদ্ধে কামালপুর রণাঙ্গন

জামালপুর : পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুর্ভেদ্য ঘাঁটি জামালপুরের কামালপুরে ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পারদর্শী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চৌকস রেজিমেন্ট ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়োগ করা হয়েছিল ক্যাম্পে।

এ ক্যাম্পের চারদিকে পরপর কয়েকটি স্তরে মোটা গাছের গুঁড়ি, কংক্রিট ব্লক, তারপর ছয় ইঞ্চি থেকে এক ফুট ব্যবধানে ভারী লোহার বিম ও  প্রতিটি স্তরে রি-ইনফোর্সড কংক্রিট ব্যারিয়ার যা ছিল গোলার আঘাত প্রতিহত উপযোগী। বাংকারের ওপরের আবরণ ছিল কয়েক স্তরে বালুর বস্তা-কংক্রিটে সাজানো। বাংকারগুলোতে সুড়ঙ্গ পথে যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল।
চারদিকে পাতানো ছিল অ্যান্টি ট্যাংক মাইন, বুবি ট্র্যাপ ও অ্যান্টি পারসোনাল মাইন। ক্যাম্পটি ঘেরা ছিল কাঁটাতারের বেড়া ও স্পাইকসে। ঘাঁটির চারপাশে দেড় থেকে দুইশ গজ এলাকায় গাছগাছালি কেটে রাখা হয়েছিল জানালেন মুক্তিযোদ্ধা বশির আহমেদ বীরপ্রতীক।

তিনি আরো জানান, তাদের এই রণকৌশলের যথেষ্ট কারণও ছিল। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর রাজধানী ঢাকা দখলের সহজ ও একমাত্র পথ ছিল এটি। কামালপুর দখল হলেই ঢাকা দখল সহজ হয়ে যাবে।

সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ ও মেজর তাহের মর্টার শেলের আঘাতে পা হারান। কামালপুর ঘাঁটি দখলে নিতে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী আটবার হামলা করে। একপর্যায়ে হানাদার সেনাদের গতি শ্লথ হয়ে পড়লে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যায় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা মাইন ফিল্ড অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ফের হানাদার সেনারা শেলপ্রুফ বাংকার থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে।  

সেই যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন শহীদ হন। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান লে. হাফিজ। দলনেতা মৃত্যুর পর মুক্তিসেনাদের মনোবল ভেঙে পড়লে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজের মৃতদেহ উদ্ধার করা যায়নি। তার স্টেনগান, হাতঘড়ি ও কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করে নিয়ে ফিরে আসে সহযোদ্ধারা।

তিনি আরো বলেন, ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজের নেতৃত্বে সম্মুখযুদ্ধ পাকিস্তানি সেনাদের মনে ভীতি জাগিয়ে তোলে। এই যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনসহ ২৮ জন নিয়মিত সৈনিক, ৩৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও ৬৫ জন আহত হয়। ঘাঁটির পশ্চিম অংশের বাংকার থেকে হানাদার সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে মর্টারের গোলা ও মেশিন গানের গুলি ছুড়তে থাকে। টিকতে না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে।

এই যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও ১৭ জন আহত হয়। সকাল ৭টায় অ্যাম্বুশস্থলে হানাদার বাহিনীর সাহায্যকারী দলের প্রথম ট্রাকটি স্থাপিত মাইনের ওপর দিয়ে অতিক্রমের সময় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ট্রাকে থাকা অধিকাংশ সেনা নিহত ও আহত হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত ট্রাকটির পেছনেই ছিল একটি জিপ ও আরেকটি ট্রাক।

এ গাড়ি দুটো থেকে শত্রু সেনারা ত্বরিত নেমে রাস্তার পাশে অবস্থান নিয়ে অ্যাম্বুশকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গুলিবিনিময় শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে বেলুচ রেজিমেন্টের মেজর আইয়ুবসহ বেশ ক’জন পাক সেনা নিহত হয়।

এ সময় একদল সেনা কামালপুর ঘাঁটি থেকে বকসীগঞ্জ যাওয়ার পথে পেছন দিক থেকে অ্যাম্বুশকারী মুক্তিযোদ্ধার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং চারজন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। অ্যাম্বুশকারী দলটি অ্যাম্বুশস্থল ত্যাগ করে ফিরে আসে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। সেই যুদ্ধে ৩৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিল।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue