শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

মুক্তিযোদ্ধাকন্যা চা বিক্রেতা শাহনাজের গল্প

জামালপুর প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার ১১:৫৫ এএম

মুক্তিযোদ্ধাকন্যা চা বিক্রেতা শাহনাজের গল্প

জামালপুর : চা বিক্রি করে জীবন চলছে মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলীর মেয়ে শাহনাজ বেগমের। কাজের ফাঁকে কামালপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের শহীদ স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর, শহীদ মিনার, মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন স্বেচ্ছাশ্রমে। স্মৃতিসৌধের বেদিতে শহীদের নাম রোদবৃষ্টিতে উঠে গেলে নাম স্পষ্ট করতে রং-তুলি হাতে কখনো হয়ে ওঠেন শিল্পী।

কাজের ফাঁকে শাহনাজ বলেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে স্মৃতিসৌধে আসে বাবার নামটি একনজর দেখার জন্য। রোদবৃষ্টিতে বেদিতে শহীদদের নাম-তালিকার রং উঠে অস্পষ্ট হওয়ায় বাবা নামটি দেখতে না পেয়ে চোখ বেয়ে পড়ে অঝোরে পানি। তাদের কান্না দেখে আমিও পানি ধরে রাখতে পারি না। আমিও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাদের বাবা হারানোর ব্যথা আমাকে কাঁদায়।

একথা বলতে বলতে শুরু করলেন কষ্টমাখা জীবনের গল্প। শাহনাজদের আদি বাড়ি ভোলার চর চন্দ্র প্রসাদ গ্রামে। তার বাবা শাহজাহান আলী ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) যোগ দেন। চাকুরিরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় ৯নং সেক্টরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ রাইফেলসে যোগ দেন তিনি। কিছুদিন কামালপুর বিডিআর ক্যাম্পে চাকরি করার পর ঢাকায় পিলখানাতে বদলি হন। এরশাদের আমলে মার্শাল আইনের সময় চাকরি চলে যায়। মামলা করে দীর্ঘদিন পর অর্ধেক পেনশন-প্রতি মাসে ৪শ টাকা করে পান।
এ টাকাই চার ছেলেমেয়েসহ ছয়জনের ভরণপোষণ করাই দায়, সেখানে বাসা ভাড়া দেবে কীভাবে। তাই আগের কর্মস্থল ধানুয়া কামালপুরে পরিচিতজনদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের কোণায় খাস জমিতে চালাঘর তুলে বসবাস শুরু করেন তারা। শাহনাজ ও তার বড় বোন দুজনে পাহাড় থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে এনে বাজারে বিক্রি করে ও ধানের মিলে কাজ নেন তার মা। যা আয় করে তা দিয়েই ছয়জনের মুখে আহার জুটে।

এসব করে টেনেটুনে সংসার চলার পাশাপাশি ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ চলার পাশাপাশি নিজেও লেখাপড়া করতেন। ধানুয়া কামালপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন তিনি। টাকার অভাবে ফরমফিলাম করতে না পারায় এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি। তারপর বিয়ের পিঁড়িতে বসে। বিয়ে হয় তিতপল্লা গ্রামের এনামুল হকের সঙ্গে। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখে এনামুল হকের প্রথম স্ত্রী রয়েছে। সতিনের সংসারে বছর দুয়েকের বেশি টিকতে পারেনি। ভেঙে যায় স্বপ্নের সংসার। স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে দুই বছর বয়সী কন্যাসন্তান আয়শাকে নিয়ে ফিরে আসেন বাবার বাড়িতে।

পরে শাহনাজ ও তার বড় বোনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় পোশাক কারখানায় পোশাক শ্রমিকের কাজ নেন। সেখানে কাজ করে স্বল্প বেতনে নিজে চলে পরিবারে টাকা পাঠাতে না পেরে ফের কামালপুরে চলে আসেন। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের কোণায় খুলে বসেন চায়ের দোকান। এরপর থেকে চা বিক্রি করে চলছে তাদের জীবন।

মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান বলেন, চা দোকানি শাহনাজ বেগম স্মৃতিসৌধসহ কমপ্লেক্সের ধোয়া-মোছাসহ সব কাজ করেন। আমরা তাকে কোনো বেতনও দিতে পারি না। তারপরও কাজ নিয়ে অনীহা নেই। কমপ্লেক্সে তার চাকরির ব্যবস্থার করা দরকার। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে এ নিয়ে কথাও বলেছি, তবে কোনো কাজ হচ্ছে না।

সোনালীনিউজ/এমটিআই