বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

মেঘের পালকে আজিকে আষাঢ় এসেছে দুয়ারে

এস এম মুকুল | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ জুন ২০১৯, শনিবার ০৩:৪১ পিএম

মেঘের পালকে আজিকে আষাঢ় এসেছে দুয়ারে

ঢাকা : নীল আকাশে কালো মেঘের পালক ভাসিয়ে এসেছে আষাঢ় মাস। জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। বাঙালির অতি প্রিয় এই ঋতুর আগমনে পুরো প্রকৃতি তার রূপ ও বর্ণ বদলে দেয়। গাছপালা, তরুলতা সবকিছুই যেন গ্রীষ্মের দহন থেকে পরিতৃপ্তি পায় বৃষ্টিস্নাত হয়ে। আষাঢ় এসেছে প্রকৃতিকে বর্ষার আহ্বান জানিয়ে।

আজ শনিবার পহেলা আষাঢ় ১৪২৬। আষাঢ় বাংলা বর্ষ গণনায় তৃতীয় মাস। আবার ষড়ঋতুর মধ্যে বর্ষা ঋতুরও প্রথম মাস। আষাঢ়ের সঙ্গে মেঘ-বৃষ্টির সম্পর্ক সুগভীর। কেননা বর্ষা-বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয় এ মাসেই। এ সময় জলীয় বাষ্পবাহী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয় এই বর্ষায়। নিয়মিত বর্ষণে বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ। বর্ষায় জানালা খুললেই বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় হূদয় জুড়াবে শীতল অনুভব। বৃষ্টির দিনে দূরের মাঠে-ঘাটে, হাওর-বিলে দেখা মিলবে শিশুদের বৃষ্টিস্নানের উল্লাস। মন ছুটে যেতে চাইবে সেই শৈশবে।

আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহ নিবারণে প্রকৃতির সর্বত্র স্নিগ্ধ সুন্দর বাদলের মুখরতায় আষাঢ়ের শুরু হবে এমনটাই প্রত্যাশিত। আষাঢ়ের নীল আকাশে উড়ে বেড়াবে কালো মেঘের দল। মেঘের দুরন্তপনা দেখে মানুষের মনেও জেগে উঠবে বিরহ-বেদনা। স্নিগ্ধ হাওয়া, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আবাহনে প্রকৃতিও সাজবে সবুজ সতেজতায়। ফলে বায়ুমণ্ডলে আসবে নির্মল বিশুদ্ধতা। বর্ষা এমন এক ঋতু, যার সঙ্গে রোমান্টিকতার আবেশই বেশি। বর্ষা যেন প্রকৃতির মাঝে প্রাণের সঞ্চার করে। বৃষ্টির পরশে আবেগ আপ্লুত হবে প্রেমিক মন। কবিগুরু বলেছেন : ‘হূদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে, আকুল পরান আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে।/ নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে/তিলঠাঁই আর নাহিরে/ওগো আজ তোরা/যাসনে ঘরের বাহিরে।’

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বর্ষা ঋতু নিয়ে রয়েছে উচ্ছ্বসিত ঋতু বন্দনা, আবেগ-অনুরাগের স্তুতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বর্ষাপ্রিয় কবি। তার বিভিন্ন গানে আছে মেঘ-মেদুর বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যের বর্ণনা। বর্ষা-বাদলের দিনে কবির বাউল হূদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠত। কবি নজরুলের কবিতা ও গানে আষাঢ়, শ্রাবণ, বর্ষার সুগভীর আবেগ লক্ষণীয়। বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদও ছিলেন অসম্ভব বর্ষাপাগল মানুষ। তার সাহিত্যে এবং গানেও রয়েছে বর্ষাপ্রেমের নান্দনিকতা। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতে, বর্ষাই একমাত্র নারী। একমাত্র রমণী। তিনি আমাদের প্রিয় দ্রৌপদী। হুমায়ূন আহমেদের বর্ষা নিয়ে প্রিয় গানটি- ‘যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো এক বরষায়’ খুবই আবেগে আকুল করা। ভাটিবাংলার লোক কবি উকিল মুন্সি বর্ষা নিয়ে গান লিখেছেন-  ‘যেদিন হইতে নয়া পানি আইলো বাড়ির ঘাটে সখী রে/ অভাগিনীর মনে কত শত কথা উঠে রে...। সত্যি, আষাঢ়ের বাদলঝরা দিনে অথৈ পানির অবগাহনে কত কথাই না মনে পড়ে যায়।

বাঙালি মননে বর্ষার সৌন্দর্য বিশেষভাবে তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। বর্ষা ঋতুর সঙ্গে বাঙালির পোশাকে, সাজে, খাবারে প্রতিফলিত হয় ঋতুর অনুরাগ। বর্ষায় নারী-পুরুষ উজ্জ্বল রঙের পোশাক পড়তে পছন্দ করে। মেয়েরা ঋতুর সঙ্গে মিল রেখে সাজগোজ করে। বৃষ্টির দিনে বাঙালি ভোজনে গুরুত্ব পায়- ইলিশ ভাজা, সরষে ইলিশ, খিচুড়ি, গোশত আর হরেক রকমের ভর্তা।

বর্ষা নাকি মানুষকে কবি করে তোলে। আবেগকে জাগ্রত করে। ব্যাকুল করে তোলে প্রেমিক-প্রেমিকার হূদয়কে। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণেই হয়তোবা ঋতু হিসেবে বর্ষা- কাব্যময় এবং প্রেমময়। বর্ষা যেমন আনন্দের, বর্ষার নির্মম নৃত্য তেমনি হঠাৎ বিষাদে ভরিয়ে তোলে জনপদ। তবু বর্ষা বাঙালি জীবনে নতুনের আবাহন। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পলির আস্তরণে আনে জীবনের সজীবতা।

বর্ষাপ্রেমিক কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান।’ কদম বর্ষার ফুল। বর্ষায় ফোটে ফুল কদম, বেলি, হাসনাহেনা ও কেয়া। বর্ষার আলিঙ্গনে এসব ফুলের সৌরভে মোহনীয় হয়ে ওঠে প্রাণ-প্রকৃতি। তবে বাঙালি সংস্কৃতিতে বর্ষার প্রতীকী ফুল হিসেবে অধিক জনপ্রিয় কদম ফুল। কদম ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ মন ছুঁয়ে যায়। বলা যায় কদম ফুল বর্ষার আগমনী বার্তা দেয়। মনে হয় যেন কদম গাছে ফুল ফুটতে দেখেই বুঝি পশ্চিমের আকাশে  মেঘেরা এসে ভিড় করে। যদিও কদম ও শাপলা দুটোই বর্ষার ফুল। আরো সহজ করে বলতে পারি, কদম আর শাপলা ফুল ফোটে বলেই আমরা বুঝতে পারি বর্ষা এসেছে দুয়ারে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই