শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬

মেলায় নতুন আবির্ভাব ‘ডিজিটাল লেখক’

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার ০২:১৭ পিএম

মেলায় নতুন আবির্ভাব ‘ডিজিটাল লেখক’

ঢাকা : ডিজিটাল প্রচারণার যুগে কে লেখক আর কে লেখক নন-নিরূপণ করা দায়। নানা কিসিমের লেখক পাওয়া যাচ্ছে কয়েক বছর ধরেই। মূলত তারা ফেসবুক সেলিব্রেটি। লাখ লাখ ফলোয়ার রয়েছে তাদের। কী লিখছেন না লিখছেন তার কোনো হদিস নেই। কিন্তু বই বিক্রি হচ্ছে দেদার। সংশ্লিষ্ট প্রকাশকেরাও খুশি। কারণ বাণিজ্য তাদের অন্যতম টার্গেট।

কিন্তু এত ‘ডিজিটাল সেলিব্রেটি’ লেখক বেরিয়েছে, তাতে কি সাহিত্যাঙ্গনের কোনো উপকার হচ্ছে?

মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকাল থেকেই এই স্টল থেকে সেই স্টল ঘুরছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছিল একঝাঁক কিশোর তরুণ। বয়স্করাও পিছিয়ে পিছিয়ে ছিলেন না। ফেসবুক পেজ আর অনলাইনে বইয়ের জনপ্রিয়তাকে তিনি কোন চোখে দেখেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জাফর ইকবাল বললেন, জনপ্রিয় বই আর সাহিত্য তো এক নয়। এই জনপ্রিয়তা একসময় থেমে যাবে। কিন্তু সাহিত্যের আবেদন চিরায়ত। তাই এ নিয়ে ভাবনার কিছু নেই।

একই প্রসঙ্গে ছড়াকার জগলুল হায়দার বলেন, লেখক-অলেখক বিতর্ক সব সময়ই ছিল। তবে আগে অলেখকের বই বিক্রি হতো না। এখন হচ্ছে। হচ্ছে কারণ ওই ফ্যান-ফলোয়ার। এটাতে একদিকে যেমন লাভ আছে, তেমনি ক্ষতিও হচ্ছে। লাভ হলো— পুস্তক প্রকাশনা শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশকেরা যে হাজার হাজার বই প্রকাশ করছেন ফি মেলায়, এর পেছনে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকে। সুতরাং এসব ডিজিটাল লেখক দিয়ে এক ধরনের উপকার হচ্ছে। অন্যদিকে, ভয়ের কথা হলো যেসব তরুণ এসব ডিজিটাল লেখককে আদর্শ মনে করছে, তারা মূলধারার সাহিত্যের রস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে দুজনই মনে করেন, অসাহিত্য-কু-সাহিত্য বেশিদিন টেকে না। অটোমেটিক ঝরে পড়ে। ডিজিটাল লেখকদের যদি লেখার ধার, সাহিত্য মেধা না থাকে, তারাও ঝরে পড়বে।

এমনিতে কর্মদিবসে মেলায় পাঠক ভিড় নেই। তবে বিক্রি কম হচ্ছে না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেলায় বিক্রির আঁচ টের পাওয়া কঠিন। প্রকাশকরা কিন্তু ভালোই বলছেন। তাম্রলিপি প্রকাশনীর তারিকুল ইসলাম রনি বলছেন, তার প্রকাশনী এবারের মেলায় ৯০টিরও বেশি বই প্রকাশ করেছে। পাঠকের আগ্রহ বিচিত্র বিষয়ের বইয়ের প্রতি।

গত ১৬ দিনে মেলায় বই এসেছে ২ হাজার ৪৭৫টি। গতকাল নতুন বই এসেছে ১৪৭টি।

এদিন বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী সম্পাদিত ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমিনুর রহমান সুলতান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাহিদুল হক, জাফর ওয়াজেদ এবং আসলাম সানী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সম্পদ বড়ুয়া।

প্রাবন্ধিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর পঁচাত্তর-উত্তর সময়ে প্রগতি ও সুস্থ সংস্কৃতির পক্ষে নিজেদের গড়ে তোলা একদল তরুণ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে সাহসী হয়ে ওঠেন কবিতা লেখার ভেতর দিয়ে। ঢাকা ও রাজশাহী ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনেও আলোড়ন তুলেছিল। কয়েকজন তরুণ কবি ও রাজনৈতিক কর্মী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এক্ষেত্রে। শোক থেকে শক্তির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশে প্রতিবাদী যে সাহিত্যধারাটি সৃষ্টি হয়, এই ধারার সাথে কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরীর নাম অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওই সময়ে যখন বঙ্গবন্ধুর নামটি উচ্চারণ করা যেত না তখন তারাই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন যৌথ সম্পাদনায়।

আলোচকরা বলেন, বিশুদ্ধ নৈতিকতার অধিকারী বঙ্গবন্ধু নৈতিকতার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। স্বাধীনতার এ মহানায়ক ৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হবার পর দেশ এক সংকটময় মুহূর্তে উপনীত হয়। এই নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে জাতির মহাশোককে শক্তিতে রূপান্তরের জন্য সেদিন যাদের কলম সোচ্চার হয়ে ওঠে; তাদের লেখনী সংকলিত হয় গ্রন্থে। একটি জাতির আত্মত্যাগ ও মূল্যবোধের ইতিহাস জানার জন্য এ গ্রন্থ একটি আকরগ্রন্থ হয়ে থাকবে।

গ্রন্থের সম্পাদকদ্বয় বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জাতির জীবনে যে অন্ধকার যুগের সূচনা হয়, সে বিভীষিকাময় সময়ে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করাও একটি সুকঠিন ব্যাপার। কিন্তু সেই সংকটময় সময়েও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে নিঃস্বার্থভাবে আমরা কাজ করে গেছি। বাংলা একাডেমি থেকে পুনর্মুদ্রণের মাধ্যমে এ গ্রন্থটি সত্যিকার অর্থেই মর্যাদার আসন পেল।

সভাপতির বক্তব্যে সম্পদ বড়ুয়া বলেন, জাতির যেকোনো ক্রান্তিকালে কবিরাই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সাহসী প্রতিবাদ তাই ধ্বনিত হয়েছে কবিদের কলমেই আর সেই প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে রয়েছে এ গ্রন্থটি।

মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন শামীম আজাদ, মলয় বালা, আফসানা বেগম এবং অরবিন্দ চক্রবর্তী।      
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি জাহিদুল হক, বিমল গুহ এবং দুলাল সরকার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী আঞ্জুমান আরা, ফয়সল আহমেদ এবং মৃন্ময় মিজান।আর গতকাল ছিল এ কে আজাদের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আনন্দন’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন বুলবুল ইসলাম, শাহনাজ নাসরিন ইলা, অসীম দত্ত, মীর মন্ডল, স্বপ্নীল সজীব, পূরবী বিশ্বাস। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন মো. সিরাজুল হক (তবলা), রবিনস্ চৌধুরী (কি-বোর্ড), অসিত বিশ্বাস (এসরাজ) এবং বিশ্বজিৎ সেন (মন্দিরা)।

স্থাপনা ধারণা প্রদর্শনী : অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে স্থাপনা ধারণা প্রতিযোগিতার আয়োজন ছিল এবারের গ্রন্থমেলার উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

প্রতিযোগীদের উপস্থাপনকৃত স্থাপনাকর্ম নিয়ে গ্রন্থমেলায় গতকাল বিকাল ৪টায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট স্থপতি অধ্যাপক সামসুল ওয়ারেস। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী এবং স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর।

আজকের অনুষ্ঠান : বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৮তম দিন মেলা চলবে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জালাল ফিরোজ রচিত ‘বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সংবিধান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।

প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মুজতবা আহমেদ মুরশেদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ডালেম চন্দ্র বর্মণ, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন এবং সাব্বীর আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সোনালীনিউজ/এমটিআই