বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

মোবাইল প্রেমের কয়েকটি সম্পর্কের কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২০, শুক্রবার ০৯:১১ এএম

মোবাইল প্রেমের কয়েকটি সম্পর্কের কথা

ঢাকা: টেলিফোনে প্রেম, ভালোবাসা। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা নেই। সাক্ষাৎ নেই। কিন্তু দিনের পর দিন টেলিফোনে ভাব করতে করতে কণ্ঠ তাদের চেনা। এভাবেই একদিন তারা বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়। কারো সংসার সুখের হয়। কারো চলে মান-অভিমান। এমনই একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী রিছিল।

তার বন্ধুসুলভ আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করে। ক্যাম্পাসের অনেক তরুণীই ছেলেটির হৃদয়ে বাঁধা পড়তে ব্যাকুল। ছোট গড়নের মেধাবী রিছিলের এক রাতে তার ফোনে অপরিচিত একটি নাম্বার থেকে মিসকল আসে। পরদিন রাতেও ওই নাম্বার থেকে মিসকল আসে।

অনেকটা বিরক্তি নিয়ে ফোন ব্যাক করেন রিছিল। হ্যালো বলতেই ওপ্রান্তে নারী কণ্ঠ। ও প্রান্ত থেকে বলতে থাকে- আমি আপনাকে জানি। চিনি। আপনি আমাকে চিনবেন না। এতটুকু বলেই ফোন কেটে দেন। পরদিন রাতে নিজেই ফোন দিয়ে আলাপ শুরু করেন। নিজের নাম বলেন, মাশিয়াত। এরপর থেকে চলতে থাকে তাদের মধ্যে আলোচনা। একসময় ভাব জমে যায়। প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে রিছিল ও মাশিয়াত। এভাবে ৫ মাস কেটে যায়। এরইমধ্যে মাশিয়াত কৃতিত্বের সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরিবারের পছন্দে নেত্রকোনার একজন ব্যবসায়ীয় সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়। বিয়েতে তার মত না থাকলেও পরিবারের মতামতকে উপেক্ষা করতে পারেননি। অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন মাশিয়াত। ধুমধাম করে বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পরে বরযাত্রীরা কনেকে নিয়ে যাত্রাবিরতি দেন একটি হোটেলে। এসময় মাশিয়াত টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ফোন নিয়ে ফোন করেন রিছিলকে। বলেন, আমি তোমার কাছে চলে আসতে চাই। আমাকে নিয়ে যাও। মাশিয়াতের কথা শুনে অনেকটা আকাশ থেকে পড়েন রিছিল। দশ মিনিট পর ফোন দিয়ে মাশিয়াতকে চলে আসতে বলেন। এসময় মাশিয়াত হোটেলের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে একটি গাড়ি নিয়ে রিছিলের দেয়া ঠিকানায় চলে যান। রাতের গাড়িতে তারা ঢাকায় চলে আসেন। রিছিল আর নতুন বউয়ের সাজে সজ্জিত মাশিয়াত গন্তব্যহীনভাবে ঢাকার অলিগলিতে ঘুরতে থাকেন। অবশেষে রিছিল মাশিয়াতকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাইয়ের বাসায় ওঠেন। কিন্তু সেই বড় ভাই তাদের রাখতে নারাজ। তারা সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য আরেক বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নেন। এভাবে কেটে যায় এক সপ্তাহ। পরবর্তীতে তার বন্ধু রিছিলের এক আত্মীয়কে ফোনে ডেকে এনে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। এদিকে মাশিয়াতের স্বামী স্ত্রীকে ফিরে পেতে মামলা করেন। কিন্তু সকল বাধা পেরিয়ে এখন তারা সুখী দম্পতি।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা মনসুর। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজের ওপর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কলেজে পড়াকালে মুঠোফোনে এক তরুণীর সঙ্গে আলাপ হয়। এরপর মন দেয়া নেয়া। এক পর্যায়ে দুই পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রেমের বিষয়টি জেনে যায়। বাধ সাধে মেয়েটির পরিবার। কারণ দু’জন দুই ধর্মের। কিন্তু ছেলের পরিবারের পক্ষ থেকে কোন প্রকার আপত্তি ছিল না। এসময় তারা দুজনে সিদ্ধান্ত নেয় পালিয়ে বিয়ে করার। অনার্স প্রথম বর্ষে সেমিস্টার ফাইনালের আগেই তারা দুজনে পালিয়ে বিয়ে করেন। ভালোবাসার টানে মেয়েটি ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ছেলেটির নামে মেয়েটির পরিবার মামলা করেন। সেই মামলায় তাকে এক মাসের মত জেলে থাকতে হয়েছে। শত চেষ্টার পরেও মেয়ের পরিবার তাদেরকে আলাদা করতে পারে নি। বর্তমানে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তারা সুন্দর জীবন যাপন করছেন।

আরেক ঘটনা-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া। নবম শ্রেণিতে পড়াকালে মুঠোফোনে প্রেম হয় ঋদ্ধর সঙ্গে। এক বছর কথা বলার পরে তারা জানতে পারেন দুজন একই এলাকার বাসিন্দা। ঋদ্ধ গাজীপুরে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ছেন। একসময় তাদের ভালোবাসার কথা মেয়েটির পরিবার জেনে যায়। এবং তারা একমাত্র সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রেমের বিষয়টি মেনে নেয়। এদিকে মাওয়া মনে প্রাণে ভালোবাসলেও ঋদ্ধর ভালোবাসা ছিল বৈষয়িক। ঋদ্ধর মেডিকেলের সেমিস্টার ফি বেশিরভাগই আসতো মাওয়ার কাছ থেকে।

এছাড়া বিভিন্ন পালা পার্বণে উপহার সামগ্রীতো আছেই। এভাবে তাদের সম্পর্ক চলতে থাকে প্রায় ৮ বছর। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে ঋদ্ধ তার মেডিকেলের আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ করে তার আচরণের পরিবর্তন দেখে মাওয়ার সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে মাওয়া ঋদ্ধর দ্বিতীয় প্রেমের বিষয়টি জেনে যায়।

এদিকে ঋদ্ধর সঙ্গে মেডিকেল কলেজের মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যায় ঋদ্ধ। মাওয়াকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাদের গায়ে হলুদের জিনিসপত্র ক্রয় করায় ঋদ্ধ। অবশেষে মাওয়াকে না জানিয়ে পরিবারের ঠিক করা পাত্রীকে বিয়ে করেন। বিয়ের দিন মাওয়ার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলেন ঋদ্ধ। বিয়ের পরে ফোন বন্ধ কর দেয়। দশ দিন পর মাওয়া ফোন করলে ঋদ্ধ জানায় বিয়ে করেছি সমস্যা নেই তোমার আমার সম্পর্ক আগের মতই থাকবে। ঋদ্ধর কথা শুনে মাওয়া অনেকটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়ে। আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরিবার ও বন্ধুদের সহায়তায় এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন মাওয়া। এবং পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার্থে সে বিদেশ চলে যায়।

ওদিকে দশ বছর প্রবাসীর সঙ্গে মেয়ে সেজে প্রেম করেছেন মোজাম্মেল। তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর। ছোটবেলা থেকে অভাব অনটনে বড় হয়েছেন। বাবা ছিলেন ভবঘুরে। পেটের দায়ে কাজ নেন ফরিদপুরের একটি হোটেলে। সেখান থেকে সংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের সঙ্গে তার পরিচয়। একসময় নিজেও মঞ্চ নাটকের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে নারী চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে নারী কণ্ঠসহ একাধীক কণ্ঠে কথা বলার দক্ষতা অর্জন করেন মোজাম্মেল। হঠাৎ কাতার প্রবাসী সুমনের সঙ্গে তার মুঠোফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এসময় মোজাম্মেল জ্যোতি পরিচয়ে নারী কণ্ঠে কথা বলতেন। এভাবে দুই বছর চলতে থাকে তাদের প্রেম।

এরই মাঝে তাদের মধ্যে টাকা পয়সার লেনদেন হতে থাকে। এসময় প্রবাসী সুমন তার ছবি দেখতে চায়। তখন জ্যোতি নামে একটি ফেক ফেসবুক একাউন্ট খুলেন মোজাম্মেল। সেখানে এক মডেলের ছবি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে প্রবাসী সুমন তাকে ফোনে সরাসরি দেখতে অনেক অনুরোধ করেন। দুই বছর পর প্রেমের সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয় মোজাম্মেল। কিছুদিন বিরতির পর পুনরায় যোগাযোগ হয় মোজাম্মেলের। আবার চলতে থাকে তাদের সম্পর্ক। এভাবে প্রায় ছয় বছর প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যান তারা।

এরই মাঝে মোজাম্মেল বিয়ে করেন। তাদের সংসারে একটি সন্তান রয়েছে। এদিকে সুমনও তার বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখে। এভাবে চলতে থাকে আরো চার বছর।

এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকা আদায় করে নেয় মোজাম্মেল। অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নেয় এবং পুরো ঘটনাটি খুলে বলবে প্রবাসী সুমনকে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে সুমনের কাছে ভুল স্বীকার করে মোজাম্মেল। কিন্তু সুমন তার বিশ্বাসে অটল। সে কোনো ভাবেই মানতে পারেনি যে তাদের সম্পর্কের মধ্যে জ্যোতি নামে কোনো নারীর অস্তিত্ব ছিল না।

বন্ধু মহলে ফাহাদ কবি হিসেবেই পরিচিত। সবাই তাকে নিয়মিত কবি ডাকায় ফাহাদ নামটি হারিয়ে যেতে বসেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী থাকেন। ফাহাদ সর্বদা বইয়ের জগতে ডুবে থাকেন। আপন ভুবনে বিচরণ করতে পছন্দ করেন। সুন্দর মেয়ে দেখলে তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করেন। যদিও এটা তার এক তরফা প্রেম। সে নিজেই প্রেমে পড়ে নিজেই ভেঙ্গে দেয়। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ালেখা করে শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন। ফাহাদের চেহারা খুব একটা সুন্দর নয়। গণমাধ্যমে চাকরি করে যে টাকা পান তার সিংহভাগই চলে যায় বই কেনা আর পরিবারের সদস্যদের মাসিক খরচ মেটাতে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার ফেসবুক মেসেঞ্জারে সিমিন নামের একটি আইডি থেকে হাই লেখা আসে। চলতে থাকে মেসেজ আদান প্রদান। অতপর শুরু হয় মুঠোফোনে আলাপচারিতা। দুজনেই ছদ্মনাম ও ছবি ব্যবহার করে কথা বলেন। হঠাৎ একদিন কবি ফাহাদ বলেন, সিমিন আমি তোমার সঙ্গে রিকশায় বৃষ্টিতে ভিজতে চাই। সিমিনও ফাহাদের কথায় রাজি হয়ে যায়। সিমিন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে কর্মরত। তার প্রথম পক্ষের স্বামীর সঙ্গে কয়েক বছর আগে ডিভোর্স হয়েছে। ১২ বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে তার। মেয়ে শুভ্রা তার সঙ্গেই থাকেন। এদিকে কর্মহীন ফাহাদকে হঠাৎ বিয়ের প্রস্তাব দেন সিমিন। তবে শর্ত হচ্ছে পরিবারে নয় বরং সিমিনের সঙ্গে তার বাসায় থাকতে হবে ফাহাদকে। যদিও সিমিন বয়সে ফাহাদের চেয়ে ১০ বছরের বড়।

অবশেষে পরিবারের সদস্যদের ছাড়াই সম্প্রতি তারা দুজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এখন স্থায়ীভাবে সিমিনের বাসায় থাকেন ফাহাদ।

সোনালীনিউজ/এইচএন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue