শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

যত্ন নিলে হালদার মৎস্য হবে মালদার

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৯, শুক্রবার ০৩:৫২ পিএম

যত্ন নিলে হালদার মৎস্য হবে মালদার

ঢাকা : হালদাকে তুলনা করা যেতে পারে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নদী মেকংয়ের সঙ্গে। মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড যৌথভাবে একটি সমন্বিত নদী কমিশন গঠন করে মেকং নদীতে মৎস্য চাষের মাধ্যমে তাদের সারা বছরের মাছের চাহিদা পূরণ করছে।

জানা গেছে, মেকং নদীর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত সমন্বিত নদী কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নদী থেকে মাছ শিকার বন্ধ থাকে। ফলে দেখা গেছে, নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত মাছ ধরার জন্য মেকং নদী উন্মুুক্ত করে দিলে জেলেরা নদী থেকে প্রচুর মাছ আহরণ করতে পারছে। আর বাংলাদেশের বিরল বৈশিষ্ট্যের একটি মাত্র নদী যার নাম হালদা। রুইজাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয় এ নদী থেকে। হালদা নদী বাংলাদেশের সাদা সোনার খনি হিসেবেও পরিচিত। জনশ্রুতি আছে- সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে হালদা নদী থেকে প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হতো। এ নদী শুধু মৎস্য সম্পদের জন্য নয়, যোগাযোগ, কৃষি ও পানিসম্পদেরও একটি বড় উৎস। জেনে রাখার মতো বিষয় হলো- ডিম থেকে উৎপাদিত রেণুু পোনা থেকে মাছ হিসাবে খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত দেশের মৎস্য খাতে হালদা নদী চার ধাপে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখে।

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হিসেবেও নদীটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দুঃখজনক হলো দখল, দূষণ, লবণাক্ততা, রাবার ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদী এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নদী গবেষকরা বলেছেন, হালদায় বিভিন্ন নৌযান, ড্রেজার এবং দূষণের কারণে হালদায় গত এক থেকে দেড় বছরে ২০টি ডলফিন মারা গেছে। এসব ডলফিনের প্রজাতি ধরে রাখার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জানা গেছে, শিল্প-কারখানার বর্জ্য থেকে সৃষ্ট দূষণের কারণে সেখানে কার্পজাতীয় মাছ রুই, কাতল, মৃগেল ও কালিবাউশের ডিম ছাড়ার হার কমে যাচ্ছে। নদীতে লবণাক্ততাও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। সুপেয় পানি সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। হালদা নদীর উজান এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে দুটি রাবার ড্যাম নির্মাণের কারণে পানির প্রবাহ অনেক কমে গেছে উল্লেখ করে বুয়েট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন গবেষক বলছেন, বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় জলজ প্রাণের খাদ্য তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃগেল ও কাতলা মাছের খাদ্য হচ্ছে প্ল্যাঙ্কটন আর রুই ও কালিবাউশের খাদ্য বেনথোস। বাঁধের কারণে নিচের অংশে প্রায় ২০ কিলোমিটার এ দুই খাদ্যের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের মতে, বাঁধ যখন কার্যকর থাকে তখন নদীর নিচের অংশে অন্তত ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার এলাকা শুকিয়ে যায়। বাঁধের কারণে নদীর নিচের অংশে মাছের খাদ্য ক্ষুদ্র প্রাণি ও জলজ উদ্ভিদের ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে মৃগেল ও কালিবাউশ মাছ কমে যাচ্ছে। বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটাসমৃদ্ধ নদী হালদা স্বাদু পানির মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র। নদীটির উৎপত্তি আর সমাপ্তি দুটিই দেশের ভেতর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১০০ বছরে হালদা নদীর অন্তত ১১টি বড় আকারের বাঁক কেটে সোজা করে ফেলা হয়েছে। নদীর বাঁক কার্প-জাতীয় মাছের প্রধান বসতি। বাঁধ সোজা করার কারণে মাছের বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে। তবে আশার খবর হচ্ছে হালদা রক্ষায় রাবার ড্যামের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, কৃষকদের ক্ষতি না করে হালদায় রাবার ড্যামের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলার কৃষকদের হালদার পানি ব্যবহার থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে রাবার ড্যামগুলো সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে উৎস থেকে নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। আরো একটি সুসংবাদ হলো অবশেষে হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন অঞ্চলকে পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। ইসিএ ঘোষণার মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হলে হালদার মাধ্যমে মৎস্য খাতে দেশের অগ্রগতি বেগবান হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হালদার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। পানির উৎস মানিকছড়ি, ধুরং, বারমাসিয়া, মন্দাকিনী, লেলাং, বোয়ালিয়া, চানখালী, সর্ত্তা, কাগতিয়া, সোনাইখাল, পারাখালী, খাটাখালীসহ বেশ কিছু ছোট ছোট ছড়া। নদীটির গভীরতা স্থান বিশেষ ২৫ থেকে ৫০ ফুট।

একক নদী হিসাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে হালদা নদীর অবদান সবচেয়ে বেশি। গবেষণা তথ্যে জানা গেছে, মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে হালদায় বর্তমানে মাছ যে পরিমাণে ডিম ছাড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ে কাতলা মাছ। ১৮ থেকে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ ডিম দেয় প্রায় ৪০ লাখ। হালদার প্রতিটি মা-মাছকে একেকটি প্রাকৃতিক এগ্রো মেগা ইন্ডাস্ট্রি বলেও অভিহিত করছেন গবেষকরা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- একটি মা-মাছ থেকে এক বছরে চার ধাপে আয় করা যায়। প্রথম ধাপে ডিম থেকে রেণু বিক্রি করে, দ্বিতীয় ধাপে ধানী পোনা বিক্রি করে, তৃতীয় ধাপে আঙ্গুলী পোনা বিক্রি করে, চতুর্থ ধাপে এক বছর বয়সে মাছ হিসাবে বাজারজাত করে। বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি ধাপে ৪০ শতাংশ মৃত্যুহার বাদ দিয়ে হিসাব করলে একটি মা কাতলা মাছ প্রতিবছর হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে ১৯ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬ শতাংশ। হালদার একটি মা-মাছ প্রতি বছর প্রায় চার কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেয় দেশকে। হালদা বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, হালদার ৫ কেজি ওজনের ডিমওয়ালা একটি মাছ থেকে বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম ছাড়ার উপযোগী প্রতিটি মাছের ওজন সর্বনিম্ন পাঁচ কেজি থেকে এক মন পর্যন্ত হয়। হালদা নদীতে মিঠা পানির ডলফিনসহ ৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে।

জানা যায়, পঞ্চাশের দশকে দেশের মোট চাহিদার ৭০ ভাগেরও বেশি পোনার চাহিদা পূরণ করত হালদা। তাই অপার সম্ভাবনাময় এ নদীকে ঘিরে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে জাতীয় অর্থনীতিতে শত কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা আছে। হালদাকে আঁকড়ে থাকা প্রায় তিন হাজার জেলে পরিবারসহ জড়িয়ে আছে বিশ হাজার মানুষের জীবিকায়ন।

নদী গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের অসংখ্য নদী থেকে হালদা নদীর বিশেষ পার্থক্য মূলত পরিবেশগত। এ বৈশিষ্ট্যগুলো ভৌতিক, রাসায়নিক ও জৈবিক। তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে- হালদায় একসময় ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কালপরিক্রমায় পাঙাশ, ঘনি চাপিলা, কইপুঁটি, বাণী কোকসা, ঘর পুঁইয়া, গুইজ্জা আইর, বুদ বাইলাসহ অন্তত ১৫টি প্রজাতির মৎস্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

১৯৪৫ সালে শুধু হালদা থেকেই ৫০০০ কেজি রেণু সংগ্রহ করা হতো। একসময় হালদায় ২০-২৫ কেজি ওজনের কাতলা, ১২-১৫ কেজি ওজনের রুই এবং ৮-১০ কেজি ওজনের মৃগেল পাওয়া যেত, যা এখন কালেভদ্রে চোখে পড়ে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় হালদা নদীর জন্য মানবসৃষ্ট ক্ষতিকর অন্তত ১০টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ফটিকছড়ির চা-বাগানগুলোর জন্য নদীর পানি ব্যবহার, নদী থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উত্তোলন, মা-মাছ নিধন, নদী থেকে নির্বিচারে বালু তোলায় এর মাটির গঠন নষ্ট হয়েছে। তীরে একের পর এক গড়ে ওঠা ইটভাটায় ব্যবহূত হচ্ছে নদীর মাটি ও পানি, নদীর ১১টি স্থানের বাঁক সমান করে ফেলায় মাছের বিচরণ ও প্রজনন কমে গেছে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে নদীর তীরে তামাক চাষ ও যন্ত্রচালিত নৌযান থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ে দূষিত হচ্ছে হালদা নদী।

হালদা রক্ষায় গবেষণা প্রতিবেদনে ১০টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খালের মাধ্যমে হালদা নদীতে শিল্প ও আবাসিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, ভারী শিল্প-কারখানায় ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মা-মাছ ধরা বন্ধে নদীতে পাহারা জোরদার করা, রাবার ড্যাম প্রত্যাহার, তামাক চাষ বন্ধ করা প্রভৃতি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই