মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

যাত্রীবেশে অপহরণ চক্রের সিন্ডিকেট সক্রিয়

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৯, রবিবার ০৭:২৭ পিএম

যাত্রীবেশে অপহরণ চক্রের সিন্ডিকেট সক্রিয়

ঢাকা : অপহরণের ধরন পাল্টাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা। যাত্রীবেশে সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রাইভেটকারসহ চালকদের টার্গেট করছে তারা। কৌশলে টার্গেট করা ব্যক্তিকে নির্জন স্থানে নিয়ে হাত-পা বেঁধে আটকে করছে অমানুষিক নির্যাতন।

এরপর তার পরিবারকে মুঠোফোনে নির্যাতনের শব্দ শুনিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে দেওয়া হয় হত্যার হুমকি। কোনো কোনো সময় মুক্তিপণ না পেয়ে অপহূতের জীবন নিতেও দ্বিধা করছে না তারা। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনরা মুক্তিপণ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানিয়ে গোপনেই মুক্ত করছে অপহূতকে।

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অপহরণ চক্রের কয়েক সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর বেড়িয়ে এসেছে লোমহর্ষক সব তথ্য।

র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সাড়ে তিন মাসে রাজধানীতে অপহরণের অভিযোগ পেয়ে ২৪টি অভিযান পরিচালনা করে র্যাব। অভিযানে অপহরণকারী চক্রের ৪২ সদস্য আটক হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ২১ জন ব্যক্তি। এসব ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া গত বছর অপহরণের ঘটনায় ১১টি অভিযানে ১৮৪ জন গ্রেপ্তার হয়। ৮৪টি মামলা ছাড়াও উদ্ধার করা হয় অপহূত ১১৬ জনকে। এর মধ্যে রয়েছে ৩১ শিশু ও ২২ নারী।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল এমরানুল হাসান বলেন, বিভিন্ন চক্র অভিনব পদ্ধতিতে অপহরণ করছে। অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ

পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযানে নামে র্যাব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপহরণকারী চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনগণকেও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ঢাকাসহ আশপাশের বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রীদের চাহিদামতো গন্তব্যে যাওয়ার কথা বলে মাইক্রোবাস বা প্রাইভেটকারে তুলে অপহরণ করে একটি চক্র। যাত্রীবেশে আগে থেকে গাড়িতে থাকা তিন-চারজন ব্যক্তি চলন্ত অবস্থায় ভিকটিমকে অজ্ঞান করে বা হাত-পা ও মুখ বেঁধে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়। পরে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে।

এছাড়া নতুন কোনো গাড়িতে টার্গেট করে সেটি ভাড়া নেয় দুষ্কৃতকারীরা। এরপর গাড়িটি নিয়ে নির্জন স্থানে যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সেটি থামিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর ওই গাড়ির চালককে তাদের সুবিধামতো স্থানে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করে।

গত শুক্রবার ভোরে মাদারীপুরের শিবচর এলাকার একটি কাশবন থেকে এ ধরনের অপহরণকারী চক্রের হাত থেকে মো. এনায়েত উল্লাহকে (৩২) উদ্ধার করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় চারজনকে। এরা হলো শাহ জালাল (৩২), ফয়সাল (২২), জয়নাল হাজারী (৩০) ও রাকিব (২২)। এ সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি দেশি অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক বলেন, এনায়েত উল্লাহ সম্প্রতি নতুন একটি প্রাইভেটকার কিনেছেন। চক্রটি সব সময় রেন্ট-এ কারের নতুন গাড়ি ও চালকের আর্থিক অবস্থা দেখে টার্গেট করত। গত ১৯ আগস্ট সন্ধ্যায় মাদারীপুরে যাওয়ার জন্য এনায়েতের গাড়িতে যাত্রীবেশে চড়ে বসেন দুই ব্যক্তি।

পরে পদ্মা নদী পার হয়ে রাত ২টার দিকে কাঁঠালবাড়ি এলাকায় পৌঁছলে অপহরণকারী চক্রের আরো তিন সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেজে তল্লাশির নামে প্রাইভেটকারটি থামাতে সংকেত দেন।

সংকেত পেয়ে প্রাইভেটকারটির থামান চালক এনায়েত। পরে অপহরণকারীরা গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং চালককে অপহরণ করে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া চর এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি কাশবনের পাশে ছোট ঘরে তাকে আটকে রেখে টানা চার দিন হাত-মুখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় কাছে থাকা ৭০ হাজার টাকা।

মোজাম্মেল হক বলেন, এ ছাড়া তাকে নির্যাতনের শব্দও এনায়েতের পরিবারকে শোনানো হয়। মুক্তিপণ বাবদ চাওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে এনায়েতের ভাই মো. কেফায়েত উল্লাহ রূপনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য র‍্যাব-৪ বরাবর একটি চিঠি দেন।

২০ আগস্ট মুক্তিপণ চেয়ে ফোন করা ওই মোবাইল ফোন নম্বরের জের ধরে টানা ৫২ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে মাদারীপুরের শিবচর থেকে এনায়েতকে উদ্ধার এবং চারজনকে আটক করা হয়। আটকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আটরশি জাকের মঞ্জিলের পার্ক থেকে উদ্ধার করা হয় প্রাইভেটকারটি।

র‌্যাব কর্মকর্তা মোজাম্মেল বলেন, চক্রের সদস্যরা যাত্রীবেশে গাড়িতে উঠে বিভিন্ন পন্থায় অপহরণ ও ছিনতাই করে আসছিল। কখনো গাড়িতে উঠেই চালকের হাত-পা বেঁধে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যায়, কখনো তারা অস্ত্রের মুখে চালককে নির্ধারিত স্থানে যেতে বাধ্য করে। কখনো মাঝপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তল্লাশির নামে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তারা।

তিনি বলেন, এনায়েতকে অপহরণের সঙ্গে ১০ জনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চারজনকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। আশা করছি শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা গত তিন বছর ধরে এমন কাজ করে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

ভিকটিম এনায়েত বলেন, চক্রের কেউ আমার পূর্বপরিচিত নয়। তারা আমাকে ফোন করে গাড়ি ভাড়ার জন্য ঠিক করে। কাঁঠালবাড়ি এলাকায় গেলে টর্চ লাইট দিয়ে আমাকে থামার নির্দেশ দেয়। এরপর গাড়িসহ আমাকে নিয়ে গিয়ে বেঁধে নির্যাতন করতে থাকে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই