বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

যুবলীগ নেতা লিটুর নেতৃত্বে ত্রাসের রাজত্ব

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার ০১:৩২ পিএম

যুবলীগ নেতা লিটুর নেতৃত্বে ত্রাসের রাজত্ব

ঢাকা : রাজধানীর ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারে যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি সাব্বির আলম লিটুর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী বাহিনী।

একসময়ের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম ও পিচ্চি হান্নানের সহযোগীরা লিটুর আশ্রয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন ত্রাসের রাজত্ব।
দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপকর্ম করে যাচ্ছেন তারা প্রকাশ্য দিবালোকে। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ প্রতিবাদ করলেই তার ওপর চালানো হয় নির্যাতনের স্টিম রোলার। ফুটপাত, লেগুনা, সিএনজিসহ বিভিন্ন পরিবহন থেকে তারা প্রতিদিন তুলছে লাখ লাখ টাকা।

প্রশাসনের নাকের ডগায় এ ধরনের অপকর্ম চললেও রহস্যজনক কারণে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

জানা গেছে, একসময় ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম ও পিচ্চি হান্নান। র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হন পিচ্চি হান্নান।

অন্যদিকে গ্রেপ্তার করা হয় সুইডেন আসলামকে। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। পিচ্চি হান্নান নিহত ও সুইডেন আসলাম গ্রেপ্তারের পর তাদের সহযোগীদের নিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন যুবলীগ নেতা সাব্বির আলম লিটু ও পিচ্চি হান্নানের বন্ধু আনোয়ার পাশা লিটন।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে ফার্মগেট ফুলঝুরি রেস্তোরাঁয় চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে আনোয়ার পাশা লিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এ সময় তারা লিটুকেও খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে মিরপুরের কাজীপাড়া কাজী কমিউনিটি সেন্টারে একটি বউভাত অনুষ্ঠানে লিটুকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তখন লিটু নিজেকে আড়াল করতে চিকিৎসার নামে বিদেশ চলে যান। তিন বছর বিদেশে আত্মগোপনে থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০১২ সালে যুবলীগ উত্তরের সম্মেলনে লিটু সহ-সভাপতির পদ পেয়ে আবার সক্রিয় ওঠেন।

সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হান্নান ও সুব্রত বাইনের সহযোগীদের নিয়ে গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট। এরপর দীর্ঘদিন ধরে তার নেতৃত্বে চলছে ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি-ছিনতাইসহ সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

সূত্র জানায়, লিটুর ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জয়নাল আবেদীন জনা।

এছাড়া চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটে রয়েছেন ৯৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কাইয়ুম, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার মোল্লা, হারুন, তাজুল ইসলাম, স্বপন, ইমরুল, আক্তার হুসেন ওরফে পাতা আক্তার, মজিবুর ওরফে পেটকা মজিবুর, খালেক, তাজুল ইসলাম সোহেল, ওসমান গণি শেখ, জসিম ওরফে জামাই জসিম, নূর আলম ওরফে ড্রাইভার নূর আলম, ইমন ওরফে ইয়াবা ইমন, শাকিল রান, নাজির আহমেদ, জীবন ওরফে ছিনতাইকারী জীবন, জসিম পাটোয়ারী ওরফে নাডা জসিম, বাবু ওরফে মুরগি বাবু, মতি মৃধা ওরফে ল্যাংড়া মতি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিটুর চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে থেকে নিউমার্কেট-আজিমপুরগামী টেম্পো থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলেন রানা ও কাইয়ুম। তারা প্রতি টেম্পো থেকে ৪০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন। ফার্মগেটের সেজান পয়েন্ট থেকে কুতুববাগ পর্যন্ত ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলেন আনোয়ার মোল্লা।

আনন্দ সিনেমা হলে থেকে আরএস টাওয়ার পর্যন্ত ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলেন স্বপন ও তার এক বন্ধু। আরএস টাওয়ার থেকে পান্থপথ পর্যন্ত চাঁদা তোলার দায়িত্বে ইমরুল।

এছাড়া জসিম পাটোয়ারী ওরফে কানা জসিম ওরফে নাডা জসিম ও বাবা সোহেলসহ তাদের সহযোগীরা কারওয়ান বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন খানের কাছে মাসিক ৩০ হাজার টাকা এবং এককালীন দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মো. জসিম উদ্দিন খানকে তুলে নিয়ে তার দুই পা ভেঙে ফেলে এবং প্রাণনাশের চেষ্টা করে।

এছাড়া কারওয়ান বাজারের আলু মার্কেটের দোতলায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীরের কাছে মাসিক ২০ হাজার এবং এককালীন দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জাহাঙ্গীরকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়ে হাইওয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রাখে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কারওয়ান বাজারের (কিচেন মার্কেট, বাপেক্স, পরিবার পরিকল্পনা ভবন, কাব্যকস মার্কেট, পেট্রোবাংলা) পিকআপ স্ট্যান্ড থেকে পিকআপপ্রতি এক হাজার টাকা করে ৩৫০টি পিকআপ থেকে প্রতি মাসে সাড়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে মাসুদ। চাঁদা না দিলে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং পিকআপ চালকদের এলোপাতাড়ি মারধর করে।

শুধু তাই নয়, চাঁদাবাজ বাহিনী সোনারগাঁও সিগন্যালের টিআই এবং সার্জেন্টকে দিয়ে গাড়ির কাগজ নিয়ে চালকদের অবৈধভাবে জরিমানা করা হয় বলে ভুক্তভোগী চালক মো. রবিউল ও মো. রাসেল জানান।

বাপেক্স ভবনের সরকারি মাইক্রোবাস থেকে প্রতি মাসে পার্কিংয়ের নামে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা তোলে মতিন মৃধার সহযোগী এমদাদ ও জীবন। প্রগতি টাওয়ারের কার পার্কিং থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। এই টাকা মতিন মৃধার নির্দেশে কানা জসিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে পেট্রোবাংলা ভবন, বিটিএমসি ভবন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ভবন, বিআরডিবি ভবন, বাপেক্স ভবন, ঢাকা ওয়াসা ভবন, মৎস্য ভবন, জালালাবাদ ভবন, এইচআরসি ভবন থেকে ৬০টি স্টাফ বাস থেকে গাড়িপ্রতি ২০০ টাকা করে প্রতিদিন ১২ হাজার টাকা করে মাসে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা মতিন মৃধার নির্দেশে কানা জসিম, কিলার সোহেল, বাচ্চু ব্যাপারী, আউয়াল, পাডা মামুন, নাজির, রহমান, মাল্টিপারপাস মামুন, ভুট্টো, সোলেমান মুন্সি, পিচ্চি কবির, পারভেজ, শাকিল, বাবু আদায় করে।

প্রতিদিন সকালে মতিন মৃধার নির্দেশে কারওয়ান বাজারের ফুটপাতের বিভিন্ন কাঁচামাল আড়ত থেকে কানা জসিম, কিলার সোহেল, খোরশেদ, বাচ্চু ব্যাপারী, আউয়াল, সোলেমান মুন্সি, নাজির, এমদাদ, লিটন, মাসুদ, মহসিন হোসেন ভুট্টো, কালা খালেক, রহমান এক লাখ টাকা করে মাসে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

যমুনা ভবনের দক্ষিণ পাশ থেকে হাতিরঝিলের মাইক্রোস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ১৫ হাজার টাকা করে মাসে সাড়ে চার লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। চাঁদা আদায় করেন হায়দার, কিলার সোহেল, কানা জসিম ও নাজির।

পেট্রোবাংলার সামনে সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে মো. লাদেন, ফয়সাল হাজী, ফজলুল ও সানাউল্লাহর নেতৃত্বে মাসে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

কারওয়ান বাজারের চায়ের দোকান, ফল দোকান, গেঞ্জি দোকান, ডাব দোকান, সবজির দোকানসহ ফুটপাতের ভাসমান সব দোকান থেকে মাসে ২৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মতিন মৃধা নিজেকে তেজগাঁও থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি দাবি করে এলেও তিনি শ্রমিক লীগের কেউ নন। লিটুর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে মতিন মৃধার নেতৃত্বে ৭০-৮০ জন সন্ত্রাসী কারওয়ান বাজার থেকে কার পার্কিংয়ের নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করে থাকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি সাব্বির আলম লিটু মুঠোফোনে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার সঙ্গে কোনো চাঁদাবাজের সম্পর্ক নেই। বিভিন্ন মালিক সমিতির নামে টেম্পো ও লেগুনা থেকে চাঁদা তোলা হয়। তবে কাইয়ুম, আনোয়ার মোল্লা, হারুন, তাজুল ইসলাম, স্বপন, ইমরুল, আক্তার হুসেন ওরফে পাতা আক্তারসহ সবাই তার পরিচিত বলে জানান সাব্বির আলম লিটু।

স্বপনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, আমি ব্যবসা করে খাই। কোনো চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। আমার বাসা ফার্মগেট এলাকায় হওয়ায় লিটু ভাইকে চিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আনিসুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। কারো অভিযোগ থাকলে পাঠিয়ে দেন। মামলা নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

সোনালীনিউজ/এমটিআই