মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯, ৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলন হচ্ছে

যে কোনো মুহূর্তে ছাত্রলীগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৮:১৯ পিএম

যে কোনো মুহূর্তে ছাত্রলীগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত

ঢাকা : ছাত্রলীগের বিষয়ে যে কোনো মুহূর্তে সংগঠনটির অভিভাবক, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত আসতে পারে যে কোন সময়।

শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার বেশি সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের কয়েকটি দলীয় সূত্র।   

এ দিকে ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান কমিটির মেয়াদ আরও ১০ মাস থাকায় সংগঠনটির আগাম সম্মেলন হবে, নাকি ভারপ্রাপ্ত নতুন নেতৃত্ব আসবে সে বিষয়টি নিয়ে সংগঠনটিতে চলছে আলোচনা ও গুঞ্জন।  

উল্লেখ্য, গত শনিবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের এক যৌথ সভায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের বিষয়গুলো উঠে আসে। সেই বিষয়গুলো নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবক, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কথা ওঠে আসে। এর মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা, অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতা, নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না করা অন্যতম।

ভেঙ্গে দেয়া ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি! বিরোধী মতাদর্শীদের অর্থের বিনিময়ে সংগঠনে অনুপ্রবেশ ঘটানো, স্বেচ্ছাচারিতা, ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন, দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অগ্রাহ্য করা, মাদক সেবন, টেন্ডার ও তদবির বাণিজ্যসহ অসংখ্য অভিযোগ এসেছে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে। দু’জনের বিরুদ্ধে সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা ও অদক্ষতার অভিযোগ ও তার প্রমাণ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্ট আকারে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমাও দিয়েছেন।

এছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপেক্ষা, ফোন রিসিভ না করার মত বেশ কিছু সাংগঠনিক শিষ্টার ভঙ্গ করার অভিযোগও উঠে আসে। এর বাইরে জেলা সম্মেলন করতে না পারা, বিতর্কিতদের দিয়ে কমিটি গঠনের বিষয়ও এ তালিকায় রয়েছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবক, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলেই জানিয়ে আসছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ছাত্রলীগের বিষয়টি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দেখছেন বলে এ বিষয়ে কেউ কোন কথা বলতে পারছেন না।

ছাত্রলীগের সংকট নিরসন কীভাবে হচ্ছে- জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি এ নিয়ে আর কোনো কথা বলব না। কারণ প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সভাপতি দেশরত্ন শেখ হাসিনা বিষয়টি দেখছেন। এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য নেই। এর আগেই ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শোভন-রাব্বানীর গণভবনে প্রবেশের স্থায়ী পাস স্থগিত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, বর্তমান ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একান্তই ভাবছেন। তবে এ নিয়ে তিনি দলীয় কোন নেতা-কর্মীর কাছে কোন কথা বলতে এই মুহূর্তে চাচ্ছেন না। তবে বর্তমান ছাত্রলীগের এই কমিটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কোন মুহূর্তে যে কোন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, কোন প্রকৃয়ায় ছাত্রলীগের বিষয়টির সমাধান করা হবে তা এখনই প্রকাশ্যে আনতে চায় না আওয়ামী লীগ। সে ক্ষেত্রে আগাম সম্মেলন, না কী আহ্বায়ক কমিটি? না ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র মোতাবেক কাউকে কার্যকরী সভাপতি করে দায়িত্বভার অর্পণ- তিন প্রক্রিয়ার যে কোন একটি আসতে পারে। ছাত্রলীগে নতুন নেতৃত্বের সন্ধান চলছে। এ পরিস্থিতিতে যে কোনো মুহূর্তে নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা আসতে পারে। এ নিয়ে কাজ করছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।  
 
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আপাতত সম্মেলনে না গিয়ে নতুন নেতৃত্বেই চলতে পারে ছাত্রলীগ। সে ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত করা হতে পারে। দলের হাইকমান্ড তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হবে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সংগঠন পরিচালনার দক্ষতাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। বঞ্চিত নেতাদের জীবন বৃত্তান্তও নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। সে ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহ-সভাপতি ও একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নতুন নেতৃত্বে আসতে যাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ছাত্রলীগের কমিটির বিষয়টি দেখাশোনা করেন। তিনিই ছাত্রলীগের কমিটি থাকবে কি থাকবে না -এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে ছাত্রলীগের ব্যাপারে ঢালাওভাবে যে সব অভিযোগ করা হয় সেসব অভিযোগ সত্য নয়। ছাত্রলীগে কিছু অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে। তারা নানা সময় নানা ঘটনা ঘটায়। সেগুলোর দায় ছাত্রলীগের ওপর এসে পড়ে। সব সময় যে সব খবর প্রচারিত হয় সবগুলো সঠিক নয়।’

এ দিকে গত কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংগঠনটির সভাপতির গাড়িতে চড়া নিয়ে এক সহ সভাপতির অপর সহ-সভাপতির মাথা ফাটিয়ে দেওয়ায় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সংগঠনটির নিয়ন্ত্রন নিয়ে খোদ সংগঠনটির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, যে সময় সংগঠনের অভিভাবক আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের প্রধান দুই নেতার ওপর ক্ষুদ্ধ হয়েছেন, সেই সময় এমন ঘটনা কাক্ষিত ছিল না। ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, এ ছাড়া বেশ কিছু দিন ধরে সংগঠনটির শীর্ষ দুই নেতার আয়েশী জীবন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল সংগঠনটির মধ্যেই।

এ ছাড়াও টাকার বিনিময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার অভিযোগের খবর ও অডিও ফাঁস হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটি সারা দেশে সংগঠনের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।   
 
তবে বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ডাকসু ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এ সময় তিনি স্বেচ্ছায় কোনো নৈতিক স্খলনজনিত কাজ করেন নি দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে এমন কোনো কিছু করি নাই যেটা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধ অথবা ছাত্রলীগের আদর্শিক জায়গা থেকে ভিন্ন।’ তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো উদ্দ্যেশ্য প্রণোদিত, অতিরঞ্জিত বলেও দাবি করেন তিনি।  

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন হয়। ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে অনেক বিলম্ব করা হয়। দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর গত ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর শুরু হয় নতুন সংকট।

কমিটিতে বিবাহিত, অছাত্র, রাজাকারের সন্তান, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের স্থান দেওয়াকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষ হয়। ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৯৯ জনই বিতর্কিত-অযোগ্য দেখিয়ে তালিকা প্রকাশ করে সংগঠনেরই কিছু নেতাকর্মী।

এমন প্রেক্ষিতে গত ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্রলীগের কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের প্রায় চার মাস পার হলেও ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ ও বিতর্কের সমাধান হয়নি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই