মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫

যে বেতন পাই তা দিয়ে চলে নাকি? তাই দুর্নীতি করি!

ফাহাদ মোহাম্মদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সোমবার ০৫:৫১ পিএম

যে বেতন পাই তা দিয়ে চলে নাকি? তাই দুর্নীতি করি!

পুলিশ সার্জেন্ট ফাহাদ মোহাম্মদ

আমার একটি লেখা ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল “সৎ থাকার কোনো লজিক দেখি না”। লেখাটা ভাইরাল হওয়ার জন্য হয়তো এই শিরোনাম কাজ করেছিল। সাংবাদিক বন্ধু সুজন ভাই এই হেডিং দিয়েছিলেন। এই লেখাটা বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে প্রায় কোটির ওপর মানুষ পড়েছিল।

আসলে আমার সেই লেখার উদ্দেশ্য ছিল সমাজে সৎ মানুষ সৃষ্টি করা। আমি হয়তো কিছুটা সফল হয়েছি। কারণ প্রায়ই দেখি অনেকেই বলেন, স্যার আমি সৎ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টায় আছি দোয়া করবেন। আসলে সৎ থাকতে হলে আপনার আমার সদিচ্ছাই যথেষ্ট। ইচ্ছা করলে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে আর সামান্য কয়টা টাকার লোভ কি সামলাতে পারে না?

লেখাটি পড়ার পরে অনেকেই (কেউ কেউ ঠাট্টা করে) প্রশ্ন করেছিলেন সৎ থাকার কি কোনো লজিক আছে? আমি বলি হ্যাঁ লজিক আছে। নিচের লেখাটা তাদের জন্য যারা সৎ থাকার লজিক খোঁজেন।

১। আপনি যে অবৈধভাবে বেশি টাকা উপার্জন করছেন সেই অপরাধের শাস্তি কেবল আপনাকেই ভোগ করতে হবে। দুনিয়ায় ভোগ করবেন আবার আখেরাতেও ভোগ করবেন। দুর্নীতির দায়ে আইন আপনার বিচার করবে। কিন্তু আপনি যে টাকা দুর্নীতি করে আয় করছেন সেটার সুফল আপনার থেকে আপনার পরিবারের সদস্যরা বেশি ভোগ করছে। এখন তাদের যদি প্রশ্ন করেন তারা আপনার জন্য এক মাস জেলে যেতে পারবে কি না কিংবা পরকালে কেউ এই পাপের ভাগিদার হবে কি না তারা এক কথায় বলে দেবে, আমরা কেন তোমার পাপের ভাগিদার হবো? তাহলে নিজেকেই প্রশ্ন করেন, আপনি কার জন্য নিজের সর্বনাশ করছেন?

২। অনেকেই প্রশ্ন করেন যে বেতন পাই তা দিয়ে চলে নাকি? তাই দুর্নীতি করি। এই যুক্তিটি দুর্নীতি করার একটি অজুহাত মাত্র। এদের বেশিরভাগ কখনো বেতনের টাকায় হাত দেয়নি। আপনাকে সরকার যে টাকা বেতন দেয় সেই টাকা দিয়ে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবেন। তার জন্য দরকার আপনার সৎ ইচ্ছা। বরং অন্য দশজন দুর্নীতিবাজ থেকে আপনি ভালোভাবে চলবেন। হ্যাঁ, আপনার হয়তো দামী বাড়ি-গাড়ি থাকবে না। সুখে থাকার জন্য বিলাসিতা এক প্রকার বাধা ছাড়া আর কিছু না। আপনার আশেপাশে অনেকেই দেখবেন সৎভাবে আপনার থেকে শান্তিতে আছে। আর দুদক যেভাবে ধরাধরি শুরু করছে তাতে মনে হয় না আপনি বেঁচে যাবেন।

৩। যারা দেশকে ভালোবাসে তারা কখনোই দুর্নীতি করতে পারে না। আমার মনে হয় না এর থেকে বড় আর কোনো লজিক বা যুক্তি আছে। শ্রদ্ধেয় হুমায়ূন আজাদ স্যারের একটি উক্তি আছে, ‘একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা না।’

আসলে যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত সেই আদর্শ ধরে রাখতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার সবথেকে বড় উদাহরণ। দেশকে যারা ভালোবাসেন তারা দেশকে লুটপাট করতে পারেন না। যেমনটা পারি না আমরা মাকে লুটপাট করতে। এ ছাড়াও আরও অনেক যুক্তি আছে যে কারণে আপনি সৎ থাকবেন।

৪। বেশিরভাগ দুর্নীতিবাজ বলেন, আরে ভাই আমি কয় টাকা দুর্নীতি করি। অমুক অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। তমুক ডিপার্টমেন্টে টাকা ছাড়া ফাইল হাতে নেয় না। এই যে আমার পাড়ার গেদু সাহেব কিছুদিন আগেও দশ শতক জায়গা কিনে পাঁচতলা আলিশান বাড়ি করেছেন। এই সব হাজারটা যুক্তি। হ্যাঁ, এটা ঠিক, আমাদের সমাজে সৎ জীবনযাপনের উদাহরণ বেশি না হলেও অসৎ পথে আয় করা উদাহরণটাই বেশি। এর জন্যই সবাই দুর্নীতি করাকে একটি স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই ধরে নিয়েছে। কিন্তু আপনি সৎ থাকবেন কেবল আপনার জন্য। এই দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য।

সৎ থাকার কিছু সহজ পথ :
১। প্রথমেই আপনার যা প্রয়োজন তা হলো, আপনার আর্থিক সামর্থ্যের ভেতরে চাহিদা থাকা। যার যত বেশি চাহিদা তার অভাব তত বেশি। দেখবেন অনেক কোটিপতি আছে যাদের কখনোই অভাব শেষ হয় না। আপনার স্ত্রী ছেলে মেয়েকে শুরু থেকে মিতব্যয়ী হতে শিক্ষা দেন। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে অর্থের অপচয় না করে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতে শিক্ষা দেন। আপনার বেতন যত টাকা তত টাকাতেই মাসের খরচ পাতি করার চেষ্টা করেন। পাশের বাসার দুর্নীতিবাজের সঙ্গে তুলনায় যাবেন না।

২। জীবনের চলার পথে আপনি অনেক মানুষের নাগাল পাবেন যারা ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে থেকেও দুর্নীতি করেন না। আপনি তাদেরকে নিজের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করুন। কখনোই দুর্নীতিবাজকে আদর্শ মানবেন না। সে যতই ভালো মানুষ আর ধার্মিকই হোক না কেন। অন্যদিকে সৎ ব্যক্তি যদি ধর্মকর্ম না করে তবুও তার সৎ থাকার যুক্তি অনুসরণ করুন। অসৎ ধার্মিক ব্যক্তি আপনাকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবে সে ধর্মকর্ম করে। সে একদিন জান্নাতে যাবে। আল্লাহ যেদিন তৌফিক দিবেন সেদিন থেকে সে সৎ জীবনযাপন করবে। বস্তুত সে নিজে কখনোই চায় না সৎ হতে। আর সে ধর্মীয় লেবাস পরে সমাজের চোখে নিজেকে সৎ দেখাতে চায়।

পরিশেষে, একটি মাঠে বিভিন্ন রঙবেরঙের ঘোড়ার মাঝে যেমন একটি দবদবে সাদা ঘোড়াকে আলাদা করা খুব কষ্টকর না তেমনি একটি দুর্নীতিপরায়ন সমাজে একজন সৎ লোককে খুঁজে পাওয়াও খুব কঠিন কাজ না। আপনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবেন সেই প্রতিষ্ঠানের সকল অসৎ লোকদের থেকে আপনি সবসময় ভালো থাকবেন। দুর্নীতিবাজ সমাজে একজন সৎ লোককে সবাই দেবতার মতো সম্মান করে।

লেখক-ফাহাদ মোহাম্মদ, ট্রাফিক সার্জেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।