বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬

রবিঠাকুর ও তাঁর বিজয়া

হিমেল আহমেদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৮ মে ২০১৯, বুধবার ০৪:৩৩ পিএম

রবিঠাকুর ও তাঁর বিজয়া

ঢাকা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বসাহিত্যের এক প্রাণপুরুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি যে শুধু বাংলার পাঠকনন্দিত সাহিত্যিক ছিলেন তা কিন্তু নয়, রবিঠাকুরের লেখনীতে মুগ্ধ হয়েছেন এমন অগণিত পাঠক রয়েছেন বিশ্বে। বিশ্বকবির সাহিত্যের উপস্থাপনা এবং লিখনশৈলী তাকে সারা বিশ্বের মহান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তাই নোবেলের মতো অসামান্য সম্মান তার ঝুলিতে পড়েছিল। এখনো দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রবি ঠাকুরের অসংখ্য অনুরাগী। নিঃসন্দেহে গীতাঞ্জলি কবির শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতা। যার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন নারী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, জন্ম ১৮৯০ সালের ৭ এপ্রিল। যিনি নিজেই ছিলেন একজন বুদ্ধিজীবী, লেখিকা ও সাহিত্য সমালোচক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলার কবি আর ভিক্টোরিয়া ছিলেন আর্জেন্টাইন এক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদিকা। বয়সেও ছিল তাঁদের বিরাট পার্থক্য! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স তখন ৬৩। আর ওকাম্পোর ৩৪। যেন আকাশ পাতালের ব্যবধান! পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্রেমের উপাখ্যান তাহলে শুরু হল কীভাবে? ১৯২৪ সালের কথা। সারা বিশ্বে ইতোমধ্যে গীতাঞ্জলি নিয়ে আলোড়ন। অনুবাদ হয় বিভিন্ন ভাষায়। ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষায়। রবিঠাকুরকে অনবদ্য গীতিকাব্য গীতাঞ্জলি লেখার জন্য সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হয় ১৯১৩ সালে, যা বিশ্বে তুমুল হৈচৈ তোলে। বিশ্বজুড়ে পাঠক পিপাসা মেটাতে সক্ষম হয় গীতাঞ্জলি। কবিগুরু শুধু বাংলার কবি নন নিমেষেই হয়ে উঠেন বিশ্বের কবি। গীতাঞ্জলির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। দেশে-বিদেশে তৈরি হতে থাকে নতুন নতুন রবীন্দ্রভক্ত! তাদেরই একজন ছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তখন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাংসারিক জীবনে চলছিল টানাপড়েন। ওকাম্পোর স্বামী লিপ্ত ছিলেন পরকীয়ায়। হতাশা আর দুঃখময় জীবনে গীতাঞ্জলি ওকাম্পোকে স্বস্তি এনে দেয়। ওকাম্পো হয়ে ওঠেন রবীন্দ্র অনুরাগী।

১৯২৪ সালে পেরুর স্বাধীনতা দিবসে কবিতা আবৃত্তির প্রস্তাব দেওয়া হয় কবিকে। পেরু যাওয়ার পথে হুট করে অসুস্থ হয়ে পরেন কবি। ফলে মাঝ রাস্তায় চিকিৎসা আর বিশ্রামের জন্য বাধ্য হয়ে আর্জেন্টিনায় অবস্থান নেন তিনি। মহাকবি, প্রাণপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওকাম্পোর নিজ দেশে এসেছেন এটি ছিল তার কাছে মহা আনন্দের বিষয়। ওকাম্পো ছুটে চলে আসেন রবি ঠাকুরের সাথে সাক্ষাত করতে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ জেনে অনেকটা জোর করেই তাঁকে হোটেল থেকে তুলে নেন ওকাম্পো, থাকার বন্দোবস্ত করলেন তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায়। যে বাড়িটির নাম ছিল ‘মিরালরিও’। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অতিথিপূজায় মুগ্ধ হন কবি। তাই তো সাত দিন থাকার কথা ছিল অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওকাম্পোর অতিথি হয়ে ছিলেন প্রায় দুই মাসের অধিক সময়। কবিগুরুর সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহকারী লের্নাড এলমর্হাস্ট। রবীন্দ্রনাথ নিজেও হয়তো ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্রেমে পরেছিলেন বলে অনেকেই ধারণা করেন। তাই তিনি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে ‘বিজয়া’ বলে ডাকতেন।

ওকাম্পোর বাড়িতে বসেই কবিগুরু ৩০টির মতো কবিতা রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের পূরবী কাব্যের অধিকাংশ কবিতা আর্জেন্টিনা নিয়ে লেখা। গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ওকাম্পোকে চিঠিতে লিখেছিলেন “তুমি জানো যে ভাস্বর সেই দিনগুলি আর তার কোমল শুশ্রূষার স্মৃতিপুঞ্জ ধরা আছে আমার কবিতাগুচ্ছে, হয়তো আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা (পূরবী)। পলাতক স্মৃতিগুলি আজ কথায় বন্দী। তোমাকে নিশ্চিত বলতে পারি যে, এ কবিতা বেঁচে থাকবে অনেক দিন।” অনেকের ধারণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর প্রেমের উপন্যাস শেষের কবিতা তিনি নিজ জীবন থেকেই লিখেছেন। আর উপন্যাসের ‘লাবণ্য’ চরিত্র ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। কবিগুরু কখনো এই কথাটি খোলাসা করেননি। তবে শেষের কবিতা উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন ‘লাবণ্য’ তাঁর খুব কাছের একজন।

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ছিলেন আত্মনির্ভর, সাহসী আর স্বাধীনতাকামী নারী। যিনি পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার নারী অধিকার রক্ষা আর বাস্তবায়নের অন্যতম নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে পরিচয় কবিগুরুকে নতুন এক রূপ দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে লুকিয়ে ছিল মহান এক চিত্রকর যা ওকাম্পোর উৎসাহের কারণে প্রকাশ পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন ভিক্টোরিয়া। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওকাম্পোর দেখা হয়েছিল মাত্র দুবার; দ্বিতীয়বার ১৯৩০ সালে প্যারিসে। দ্বিতীয়বারও ওকাম্পো কবিগুরুর জন্য যথেষ্ট করেছিলেন। অনেক খেটেখুটে প্যারিসে প্রখ্যাত ‘পিগাল গ্যালারি’তে কবিগুরুর আঁকা ছবিগুলোর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর আর ওকাম্পোর সঙ্গে কবিগুরুর দেখা হয়নি। কবিগুরু অনেকবার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিজ গৃহ শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানান। জানিনা কোন ক্ষোভে তিনি কবিগুরুর এই নিমন্ত্রণ কখনো গ্রহণ করতে চাননি। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নিজেও একজন লেখিকা ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে একাধিক লেখা লিখেছেন তিনিও। ওকাম্পো যতটা রবিপ্রেমী ছিলেন, ততটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ওকাম্পোর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই