সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬

রাজনীতিও চলে গেছে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০, রবিবার ০৪:৪৬ পিএম

রাজনীতিও চলে গেছে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’

ঢাকা : স্বাধীনতার মাস মার্চজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যান্য বছর যে আয়োজন থাকে, এবার তা নেই। অন্য বছরের মতো দিবসভিত্তিক কর্মসূচির পাশাপাশি দলীয় ও সাংগঠনিক নানা কর্মসূচি দলগুলো তো রাখছেই না, দিবসভিত্তিক কর্মসূচিও কাটছাঁট করে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসেও দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করে এবার নির্ধারিত কয়েকজনকে নিয়ে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারি দল আওয়ামী লীগ চলতি মাসের পূর্বনির্ধারিত সাংগঠনিক কর্মসূচিও স্থগিত করেছে।

পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয়, সরকারি বেসরকারি, রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক অনেক অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেছে। দেশে করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করেই বদলে গেছে রাজনৈতিক অঙ্গনের চেনা চালচিত্র।

রাজনৈতিক অঙ্গনও রেহাই পায়নি করোনার প্রভাব থেকে। দেশের পাঁচটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চলমান থাকলেও রাজনীতির মাঠের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের নির্বাচনি বক্তব্যে সেই ‘উত্তাপ’ নেই। বছরের অন্য সময় তেমন কর্মসূচি না থাকলেও মার্চ ও ডিসেম্বর মাসে ছোট ছোট যেসব রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি থাকে, করোনার প্রভাবে এবার সেসব দলও কর্মসূচির কথা ঘোষণা করছে না।
গত কয়েক বছর ধরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ঢাকার বাইরে কর্মসূচি দিবসভিত্তিক হলেও করোনার প্রভাবে এবার তা-ও হচ্ছে না। মাঠ থেকে রাজনীতিকে ঘরে তুলে দিয়ে দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি আয়োজনে বাধ্য করছে করোনা। রাজনীতিও এখন চলে গেছে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’।

খোঁজ নিলে জানা যায়, পুরো মার্চেই দিবসভিত্তিক কর্মসূচিতেই আটকা পড়েছে রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলোও একের পর এক স্থগিত করছে বিভিন্ন কর্মসূচি। কোনো দলই জনসমাগমের মতো কর্মসূচির কথা আপাতত ভাবছে না। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের কাছে বিশেষ গুরুত্বের মাস মার্চ। এ মাসজুড়ে থাকে দলটির নানা আয়োজন।

এবারের মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী হওয়ায় ও সরকারের মুজিববর্ষ উদযাপনে বছরব্যাপী রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির আয়োজন থাকায় মাসটিকে ঘিরে ক্ষমতাসীন দলটির আয়োজনও ছিল প্রতিবারের চেয়ে ভিন্ন। করোনার কারণে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি সীমিত আকারে ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে পালনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

করোনার প্রভাব পড়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও। সেখানে ভিড় এড়িয়ে চলছেন নেতা-কর্মীরা। শূন্য হওয়া ঢাকা-১০, বগুড়া-১, যশোর-৬, গাইবান্ধা-৩ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ভোটের দিন ঘনিয়ে এলেও সেসব এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে জনসমাবেশের আয়োজন করছে না কোনো দলই। সব দলের নেতাকর্মী ভিড় এড়িয়ে চলছেন। চসিকের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরেও নেই আগের মতো নেতা-কর্মীদের ভিড়ের প্রচারণা।

করোনার বিস্তার ঠেকানো ও প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলো নেতা-কর্মীদের নিয়ে জনসমাবেশের আয়োজন করার বদলে গুরুত্ব দিচ্ছে চিকিৎসকদের পরামর্শসম্মত পদ্ধতিকে। জনসমাবেশ এড়িয়ে কয়েকজন মিলে লিফলেট বিতরণ করছেন।

করোনা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলা, লিফলেট বিতরণ ও এর সম্পর্কে মানুষের করণীয় কী সে বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো মাঠে থেকে জনগণকে সচেতন করবে। বিশ্বব্যাপী এই দুর্যোগের সময় মানুষকে সচেতন করা ও মানুষের জন্য কাজ করাটাও মুজিববর্ষ উদযাপনের একটি অংশ বলে মনে করে দলটি।

জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গতকাল শনিবার সারা দেশে লিফলেট বিতরণ করেন। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গতকাল লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মানুষের হাতে লিফলেট তুলে দেন দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

গত শুক্রবার ঢাকার ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতে বিতরণের জন্য লিফলেট তুলে দিয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি। বিএনপিও গত বৃহস্পতিবার থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে লিফলেট বিতরণের কার্যক্রম শুরু করেছে।

খুব দরকার না হলে দলীয় কার্যালয় বা নেতাদের বাসায়ও সংবাদ সম্মেলন আয়োজন না করার বিষয়ে ভাবছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম রাজনৈতিক দলের নেতারা। এমন পরিস্থিতিতেও করোনা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি শুরু হয়েছে।

মাত্র তিনজন আক্রান্ত হলেও ‘করোনা প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থ’ বলে দাবি করছে বিএনপি। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে, করোনা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর সঙ্গে এ নিয়ে ‘ইস্যু’ খুঁজছে বিএনপি।

‘করোনা নিয়ে সতর্কতা ও প্রস্তুতিতে সামান্যতম ঘাটতি নেই’ উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের গতকাল অভিযোগ করেন, ‘বিএনপি এখন সবকিছুতেই নন্দঘোষ সরকারকে দেখছে। তারা রাজনৈতিক ইস্যু খোঁজার পাঁয়তারা করছে। এটাই এখন তাদের রাজনীতি।

বিএনপিকে অনুরোধ করব, সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপানোর আগে নিজেরা নিজেদের ঘর সামলান। আপন ঘরেই আপনাদের অসুবিধা ও সমস্যা। করোনার মতো ভাইরাস আপনাদের ঘরে রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। নিজেদের ঘরের করোনা আগে প্রতিরোধ করুন। এরপরে সরকারের ওপর দোষ চাপাতে পারবেন।’

করোনা নিয়ে সরকারের প্রস্তুতিতে সংশয় প্রকাশ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ অভিযোগ করেন, ‘প্রতিটি বিষয় নিয়ে সরকার দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই সরকারকে বিশ্বাস করার কারণ নেই। করোনা প্রতিরোধ সরকার উদাসীন ছিল। এখনো কতটা প্রস্তুতি আছে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’

করোনা নিয়ে রাজনীতি না করে ও ঝুঁকি কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়ারও দাবি জানান বিএনপির এ শীর্ষ নেতা।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়ানো করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে মুজিববর্ষের আয়োজনে। করোনার আঘাত সংক্রমণ ঠেকানোর আগাম সতর্কতা হিসেবে জাতির পিতার জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ১৭ মার্চ ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের আড়ম্বরপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিও হচ্ছে না।

৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ জাপান সফরসহ মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্যের বিদেশি সম্মেলনে অংশ নিতে চলতি মাসে বিদেশ যাওয়ার কর্মসূচিও স্থগিত করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে গণহত্যা ও স্বাধীনতা দিবসের আলোচনাসভা বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ। শুধু শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে দলটির এবারের কর্মসূচি। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা ও বিশেষ মোনাজাত করা হবে। সেখানে কোনো আলোচনাসভা হবে না। জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সীমিত পরিসরে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী আয়োজন ও দিবসভিত্তিক কর্মসূচি থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে দলটির সারা দেশের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন করার নির্দেশ ছিল। ৪৪টি জেলায় সময় স্বল্পতাসহ কিছু কারণে তখন সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। এসব জেলায় চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সম্মেলন করার টার্গেট ছিল দলটির। এ লক্ষ্যে কার্যক্রমও চলছিল। মার্চ মাসের শুরুতেই একাধিক জেলায় সম্মেলনের আয়োজনও হয়। করোনার প্রভাবে এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সাংগঠনিক জেলায় সম্ভব হবে কি না-এমন প্রশ্ন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের।

করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পূর্বঘোষিত ১১ মার্চের বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

করোনার কারণে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ১৪ দলের জোট। জনসমাগম বাদ দিয়ে মুজিববর্ষের কর্মসূচিতে শুধু জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাবেন।

আগামী ২০ মার্চ দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের জন্মদিন উদযাপনে জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতা-কর্মীদের বড়ো সমাগমে না গিয়ে দোয়া ও মাহফিলের মতো সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

দলটির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জানান, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সুবিধামতো সময়ে আলোচনা ও দোয়ার আয়োজন করবে জাপা। তবে করোনার সংক্রমণের কারণে এখনই এ ব্যাপারে সময়সূচি নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই