রবিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৮, ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

রাজনীতিতে দৃষ্টি ব্যবসায়ীদের

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার ১১:১৬ এএম

রাজনীতিতে দৃষ্টি ব্যবসায়ীদের

ঢাকা : একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে একধরনের সংশয় কাজ করছে। নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করছেন না। পুরনো ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও পর্যবেক্ষণে থাকছেন ব্যবসায়ীরা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেকে উদ্বিগ্নতার কথাও বলছেন।

অর্থনীতিবিদরাও আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি না হলে দেশজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। তবে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন হওয়ায় আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনও ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্ভব হবে না- এমন জোরালো আশাবাদও রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এককথায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী মহল উদ্বিগ্ন। কারণ, জাতীয় নির্বাচন এলেই সহিংসতা হয়, লুটপাট হয়। তবে এবার হতাশার চেয়ে আশার বিষয়টিও আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের সহিংসতা থেকে সরে আসতে হবে। আমরাও উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে সরে আসবো।’

মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রাজনীতির ভালো খবর হলো, রাজনৈতিকদলগুলো এখন পর্যন্ত কোনও সহিংসতায় জড়ায়নি। কোনও ধ্বংসাত্মকমূলক কোনও কর্মসূচি দিচ্ছে না তারা। এটা অবশ্যই ভালো দিক। আমরা আশাবাদী, এবার নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। আর নির্বাচন সুষ্ঠু হলে সহিংসতা হওয়ারও আশঙ্কা থাকবে না।’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় রাজনীতিবিদদের সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বলে মত দেন তিনি।

মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মতো অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করছেন না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিস্থিতিকে সামনে এনে তারা এ ধরনের দুশ্চিন্তা করছেন। ফলে আগামী তিন মাস ব্যবসা-বাণিজ্যে একধরনের স্থবিরতা আশঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সম্ভাব্য অস্থিরতা মাথায় নিয়ে তৈরি পোশাক খাত এগিয়ে চলেছে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবারও অস্থিরতা হবে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করছেন অনেকে। ক্রেতারাও বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। ইতোমধ্যে কিছু ক্রেতা নভেম্বর-ডিসেম্বরে সম্ভাব্য রফতানি কীভাবে হবে তা জানতে চেয়েছেন। এ সময়ে কোনও সমস্যা হবে কিনা তা তারা জানতে চেয়েছেন। এমনকি রাজনীতিকেন্দ্রিক অস্থিরতা জানুয়ারিতেও চলতে থাকবে কিনা তাও জানতে চেয়েছেন।’

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা। এদিকে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগও তত বাড়ছে। এর প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে আমদানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টের তুলনায় এ বছরের আগস্টে আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের শ্লথগতির কারণে দেশের পণ্য আমদানির ব্যয় কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। গত আগস্ট শেষে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমেছে ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশে। এত কম প্রবৃদ্ধি গত আড়াই বছরে দেখা যায়নি। অথচ এ বছরের শুরুতেও বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের অনেকেই উৎপাদনে যাচ্ছেন না। ‘বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে। এ কারণে ব্যাংকের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমেছে।’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথার্থ কারণ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের মৌলিক ইস্যু হলো জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার জন্য এবার ইভিএম কার্যকর না করার দাবিসহ নানা দাবি আছে। এসব দাবি না মানলে অনিশ্চয়তাও তৈরি হতে পারে।’ যদি কোনও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে অর্থনীতির জন্য অনেক ক্ষতি হবে বলে মত দেন তিনি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরের তিন মাসের সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি গুনতে হয়েছে। হরতাল-অবরোধের ক্ষতি নিয়ে ওই সময় জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, হরতাল-অবরোধে ক্ষতির পরিমাণ একলাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ এই মুহূর্তে দেখি না। আমরা দেখছি, একটা সমঝোতা হতে যাচ্ছে, একটা আলোচনা হতে যাচ্ছে।

এছাড়া এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো কোনও সহিংসতায় জড়ায়নি। জ্বালাও-পোড়াও এখন আর নেই। কেউ ধ্বংসাত্মক কোনও কর্মসূচিও দিচ্ছে না। ফলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। ফলে অন্যান্য বছরে নির্বাচন এলে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়, এবার সেটাও হবে না।’ তবে বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে খারাপ এটা স্বীকার করতে হবে মন্তব্য করে তিনি এ জন্য নির্বাচনের চেয়ে ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদকে দায়ী করেন।

সফিউল ইসলাম বলেন, ‘উচ্চ সুদ ছাড়াও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হওয়া নিরবিচ্ছন্নভাবে বিদ্যুৎ না পাওয়াও বিনিয়োগ স্থবিরতার জন্য দায়ী।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, কোনও অবস্থাতেই এমন কোনও কর্মসূচি নেওয়া উচিত হবে না, যেটা অর্থনীতি বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।’

এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে আমরা কোনও উদ্বিগ্নতা দেখছি না। বাংলাদেশের মানুষ এখন আর হরতাল-অবরোধ দেখতে চায় না।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই