বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

রাজনীতির দৈন্যে ভাঙছে ছোট দল

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার ০৫:০৫ পিএম

রাজনীতির দৈন্যে ভাঙছে ছোট দল

ঢাকা : দেশের রাজপথ অনেকদিন থেকেই শীতল। মাঠে আন্দোলন নেই। রাজনীতি চলছে ঘরে ঘরে। নির্বাচনও নেই। নেই ভোট ভাগাভাগির হিসাব। তবু কেন ছোট দলগুলোর ভেতরে-বাইরে অস্থিরতা? বড় অসময়েই ভাঙছে ছোট দলগুলো।

কেন কবি লিখেছেন, ‘আর কত ভাঙ্গবি তুই/ ভাঙ্গা ঘরের দেয়াল!/একদিন না মাথায় ভাঙ্গে/খুঁটিবিহীন চাল!’

তবে এ পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের দাবি শত শত। রাজনীতিবিদরা তা নিয়ে মাঠে নামছেন না, রাজনীতি করছেন না। রাজনীতি রাজপথে না থাকায় ঢুকেছে রাজনৈতিক দলের ভেতরে। বাড়ছে দলীয় দ্বন্দ্ব-কোন্দ্বল। শেষ পরিণতি দেখা যাচ্ছে দল খণ্ড-বিখণ্ড। এটা আর্থিক ও রাজনীতির দৈন্যদশার কারণ, এ মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ।

জোট রাজনীতির বাজারে বিশেষ করে নির্বাচনের মৌসুমে ছোট ছোট দলের কদর বাড়ে। দু-একটি আসন কিংবা রাষ্ট্রশাসন ক্ষমতা হাতে পেলে গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা মোটা অঙ্কের সুবিধা দিয়ে নিজের ভেলায় তুলেছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো বড় দলগুলো।

এমনও হয়েছে ক্ষমতায় থাকাকালে কোন কোন দল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ দল বা জোট ভেঙেছে। দলত্যাগ করা নেতাদের দিয়ে গড়েছেন একই নামে খণ্ড দল।

সাধারণত এই ভাঙা-গড়ার চিত্র দেখা গেছে রাজপথে আন্দোলন দমাতে কিংবা নির্বাচনে ভোটের পাল্লা ভারী করতে। কিন্তু এখন এমন কোনো দৃশ্যই নেই।

নিকট অতীতে ভাঙনের কবলে পড়ে খান খান হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। কদিন আগে আরেক দফায় ভাঙল আ স ম রবের জাসদ।

রাশেদ খান মেনন ঐক্য অটুট রাখতে পারেননি বলে দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। প্রয়াত শফিউল আলম প্রধানের দল ইতোমধ্যে বিভক্ত। সাবেক সেনা কর্মকর্তা অলির দলও ভাঙল। না ভাঙলেও অঙ্গহানি ঘটেছে আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইবরাহিমের কল্যাণ পার্টি। শুরু থেকে কাছে থাকা পার্টির মহাসচিব ছেড়েছেন দলীয় পদ। অস্থিরতায় সময় পার করছে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম।

জাসদ : এ দলটি নিয়ে কৌতূহলের সীমা নেই। জাসদ সম্পর্কে অনেক কৌতূহলের উত্তর দিয়েছেন একদা দলটির নেতা মহিউদ্দিন আহমদ তার বিখ্যাত ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইয়ে।

তিনি লিখেছেন, দলটি ফসিলে পরিণত হওয়ার আগেই! আমাদের বন্ধু বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ ছিলেন একসময় জাসদ ছাত্রলীগের বুদ্ধিজীবী। আমাদের সময় এক বরেণ্য শিক্ষক, তৎকালীন গণকণ্ঠের সম্পাদক প্রফেসর আফতাব আহমেদও আর নেই। নেই জলিল, আরেফ, শাহজাহান সিরাজ। হয়তো আরো অনেকে।

জাসদ একটি ঝড়ের নাম, কিন্তু সে ঝড়টি কেন হাওয়ার বেগে এসে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, এই প্রশ্ন দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষের।

কারণ জাসদ ছিল প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও সেনাপ্রধানের দল বিএনপির বাইরে এ দেশীয় মাটি থেকে উদগত একটি রাজনৈতিক দল।

দলটির অসাম্প্রদায়িক পরিচয় ছিল, কিন্তু তথাকথিত রুশ-মার্কিন-ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে রাজনীতির স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাসদ যতবারই সম্মেলনের মুখোমুখি হয়েছে, ততবারই ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়েছে। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনে তাদের বরাবরের অনীহা! ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাসদের আত্মপ্রকাশ।

কিছুদিন পর ১৯৭৩ সালের ৪ জানুয়ারি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী জাসদের সমাবেশে হামলা চালিয়ে শরীফ নুরুল আম্বিয়ার হাত ভেঙে দেয়, মাথা ফাটিয়ে দেয় আ ফ ম মাহবুবুল হকের।

অতিসম্প্রতি ভাঙনে শরীফ নুরুল আম্বিয়া দিচ্ছেন একাংশের নেতৃত্ব। আবার অপর অংশের নেতৃত্বে ফের হাসানুল হক ইনু? জাসদ একটি ‘ভাঙনের দল’।

সভাপতি উত্তরে চললে সাধারণ সম্পাদক চলেন দক্ষিণে। ইনু উত্তরে তো আম্বিয়া দক্ষিণে। একদা জলিল দক্ষিণে, তো আ স ম রব উত্তরে, আবার রব উত্তরে তো শাহজাহান সিরাজ দক্ষিণে। এবং এই উত্তর-দক্ষিণ উভয় দিকেই অনুসারীর ঘাটতি নেই!

জাসদের সম্মেলনে বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, জানতাম না যে জাসদ এখনো এত শক্তিশালী। তার মানে তার ধারণা ছিল, সরকারে যোগ দেওয়ায় জাসদের লোটা কম্বল সবকিছুই বিক্রি হয়ে গেছে!

ভাঙাচোড়া আপাত শেষ নাটকটি ঘটল আ স ম আবদুর রবের জাসদ-জেএসডিতে। সভাপতি রবের ডাকা কাউন্সিল বর্জন করে আগামী ১১ জানুয়ারি আলাদা সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন।

রব আগামী ২৮ ডিসেম্বর জেএসডির জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করেছেন।

তা বর্জন করে ২৩ নভেম্বর শনিবার জাতীয়  প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আলাদা সম্মেলনের ঘোষণা দেন তিনি। আ স ম রব তার দল নিয়ে বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে রয়েছেন, তা নিয়ে আপত্তি তুলেছে অন্য পক্ষ।

আবদুল মালেক রতন বলেন, জেএসডির নেতৃত্বের একাংশ আজকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, চেতনা, দলের অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি এবং রাজনীতি আপদ-বিপদ হিসেবে পরিচিত শক্তির বিরুদ্ধে তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার অঙ্গীকার ভুলে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে চলছে।

ওই অংশটি ২৮ ডিসেম্বর যে কাউন্সিলে আহ্বান করেছে, তা দলীয় বিধিসম্মত নয় বলে আমরা মনে করি। এজন্যই আমরা অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ কাউন্সিল বর্জন করে ১১ জানুয়ারি কনভেনশনের মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র সুনিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

ওয়ার্কার্স পার্টি : দুদিনব্যাপী কেন্দ্রীয় সম্মেলন শেষে রাশেদ খান মেননের দল ভেঙে যশোর থেকে ঘোষিত হয়েছে নতুন আরেকটি দল। এই দলের নাম বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী)।

১১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের ভাই নুরুল হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ। গত ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাউন্সিল শেষে পার্টির নাম ও কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এর আগে, ‘মতাদর্শগত বিরোধের’ অভিযোগে গত ২৯ নভেম্বর  যশোরে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ক্ষমতাসীন দলের জোটসঙ্গী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

এলডিপি : গত মাসে আভাস এবং গতকাল চূড়ান্তভাবেই ভেঙে গেল বিএনপি থেকে বেরিয়ে নতুন দল গড়া কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।  

দলের সাবেক কয়েকজন নেতা মিলে গতকাল কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই ভাঙন প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত হয়েছে।

এর আগে ১৮ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এলডিপির ভাঙন ও সাত সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়।

গতকাল রাজধানীর ফকিরাপুলের একটি হোটেলে বর্ধিত সভার মাধ্যমে পুর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষিত হয়।

এ সময় আহ্বায়ক আবদুল করিম আব্বাসী অভিযোগ করেছেন, দল পরিচালনায় অলির একনায়কসুলভ মানসিকতায় আমরা হতাশ হয়েছি। তাই নতুন দল গঠন করতে বাধ্য হয়েছি।  

অন্যদিকে কর্নেল অলির দাবি তিনি এই দলের নিবন্ধিত মালিক।

জাগপা : শফিউল আলম প্রধানের জীবদ্দশায় অটুট ছিল তার গড়া দল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)। তার মৃত্যুর পরপরই পার্টির প্রধান ছিলেন তার সহধর্মিণী রেহানা প্রধান। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি হাল ধরেছিলেন। তার মৃত্যুর পর উত্তারাধিকার সূত্রে পার্টির সভাপতি হন প্রধান কন্যা ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান।

শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সভাপতি তাসমিয়াকে বহিষ্কার করেন দলের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান। সভাপতিও পাল্টা বহিষ্কার করে সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমানকে। লুৎফর পাল্টা কমিটি ঘোষণা করে খন্দকার আবিদুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ঘোষণা করেন।

ওদিকে তাসমিয়াও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছেন যুগ্ম সম্পাদক আসাদুর রহমান খানকে। খণ্ডিত এক অংশ ২০ দলীয় জোটের বাইরে অন্যটি জোটে।    

গণফোরাম : চরম অস্থিরতা চলছে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামে। দলটিতে হঠাৎ শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে অধ্যাপক আবু সাঈদ এবং শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়াকে।

ইতোমধ্যে দল ছেড়েছেন প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পথিক। মোস্তফা মহসিন মন্টু ইতোমধ্যে সুনসান অবস্থানে। দলটিতে ভেতরে ভেতরে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

কল্যাণ পার্টি : কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান দুই মাস আগে তার দল ও পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। যদিও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছেন আমিনুর।

কিন্তু দলীয় সূত্রমতে, জামায়াতকে নিয়ে কর্নেল অলির সঙ্গে মুক্তিমঞ্চ গড়ার জন্যই তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এ নিয়ে কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল ইবরাহিম বলেন, পার্টির মহাসচিব তার ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। এটা দলের ভাঙন বলা যাবে না। সময়মতো সব ঠিক হয়ে যাবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue