রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

রিফাত হত্যার দ্রুত বিচার করবে সরকার: আইনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৭ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার ১২:৫৮ পিএম

রিফাত হত্যার দ্রুত বিচার করবে সরকার: আইনমন্ত্রী

ঢাকা: বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত নামের যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সরকার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার করবে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এ ঘটনায় প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকেই সব ধরনের আইনি সহায়তাও প্রদান করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি। সুষ্ঠু বিচার হলে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর ঘটবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

বুধবার (২৬ জুন) বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত নামের ওই যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, স্ত্রীকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ ও মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ার জেরেই এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে।

রিফাতকে নৃশংসভাবে কোপানোর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহুর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।

এ ঘটনায় বুধবার রাত দেড়টার সময় নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলার চার নম্বর আসামি চন্দনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।

এদিকে বরগুনায় দিনে দুপুরে স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে আদালত বিস্ময় প্রকাশ করেন।

আদালত বলেন, একটা মানুষকে প্রকাশ্যে কোপানো হলো, কিন্তু একটা মানুষও এগিয়ে আসলো না? সবাই দাঁড়িয়ে ভিডিও করলেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসলেন না? প্রত্যেকটা জনগণের ব্যর্থতা।

আদালত বলেন, সবাই এগিয়ে আসলে তো খুনিরা সাহস পেত না। তবে খুনিরা পাওয়ারফুল বলে কেউ এগিয়ে আসেনি বলেও মন্তব্য করেন আদালত।

এ ঘটনায় বরগুনার ডিসি ও এসপি কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এদিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শাহ নেয়াজ রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চন্দন নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বুধবার (২৬ জুন) রাতে চন্দনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন।

তিনি বলেন, বুধবার রাতে নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন। এ মামলার ৪ নম্বর আসামি চন্দন। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বুধবার বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সকাল ১০টার দিকে নয়নের নেতৃত্বে ৪-৫ জন সন্ত্রাসী রিফাতকে দা দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যায়। এ সময় বারবার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে স্বামীকে বাঁচাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। নিহত রিফাত শরীফের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ৬নং বুড়িরচর ইউনিয়নের বড় লবণগোলা গ্রামে। তার বাবার নাম আ. হালিম দুলাল শরীফ। মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন রিফাত।

এদিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে যে নৃশংস দৃশ্য দেখা যায়, যা কারও কাম্য নয়। কিন্তু যে দুই যুবক এই হত্যালীলা চালালেন, তারা কারা? এ প্রশ্ন এখন দেশবাসীর। সবাই জানতে চাচ্ছেন, এদের শক্তির উৎস কী?

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকারী দুই জনের একজন রিফাত ফরাজী। আরেকজনের নাম নয়ন (২৫) বন্ড।

দুইজনই অনেক আগে থেকেই অপরাধ জগতের পরিচিত মুখ। তাদের কারণে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসীরা জানান, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিলেন রিফাত ফরাজী। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে একটি আতঙ্কের নাম রিফাত ফরাজী।

রিফাতের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে কয়েকবার গ্রেফতার হলেও অজ্ঞাত এক কারণে খুব স্বল্প সময়েই মুক্তি পান তিনি। ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করেন রিফাত ফরাজী।

তরিকুল জানান, একদিন সামান্য কথা কাটাকাটি হয় রিফাত ফরাজীর সঙ্গে তার। তখন রিফাত ফরাজী তাকে কুপিয়ে যখম করার হুমকি দেন। রিফাত ফরাজীর ভয়ে তিনি দেড় মাস রিফাত ফরাজীর বাসার সামনে দিয়ে না গিয়ে আধা কিলোমিটার পথ ঘুরে তার বাসায় যাওয়া আসা করতেন। হুমকি দেয়ার দেড় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন সন্ধ্যায় রিফাত ফরাজীর বাসার সামনে দিয়ে তরিকুল তার বাসায় যাওয়ার পথে রিফাত ফরাজী দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার মাথায় গুরুতর যখম করেন। এ ঘটনায় তরিকুলের বাবা বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।

একই বছর রিফাত বরগুনার হোমিও চিকিৎসক ডা. আলাউদ্দিন আহমেদের ডিকেপি রোডের বাসার ছাত্র মেসে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে বাসায় থাকা সব ছাত্রদের জিম্মি করে, তাদের ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলে পুলিশ রিফাতের বাবা দুলাল ফরাজীকে আটক করে মোবাইলগুলো উদ্ধার করেন।

এ বিষয়ে ডা. আলাউদ্দিন আহমেদের ছেলে ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ‘ডিকেপি রোডের আমাদের ভাড়া দেয়া বরগুনা পলিট্যাকনিক ইনিস্টিটিউটের মেসে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করেন রিফাত ফরাজী। এ ঘটনা জানার পর আমি বরগুনা সদর থানায় গিয়ে অভিযোগ করায় রিফাত ফরাজীর বাবা দুলাল ফরাজীকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। পরে তিনি রিফাতের কাছ থেকে ছিনতাই করা ১৪টি মোবাইলের মধ্যে ১১টি উদ্ধার করেন। আর বাকি তিনটি মোবাইল উদ্ধার করতে না পেরে নতুন মোবাইল কিনে দিয়ে থানা থেকে মুক্তি পান।’

২০১৭ সালে বরগুনায় ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন ও দেশীয় অস্ত্রসহ নয়নসহ দুইজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ

বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মারজানা মনি বলেন, ‘২০১৭ সালের রমজানে আমার একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মো. মেহেদী হাসান বরগুনার হোমিও চিকিৎসক আলাউদ্দিন ডাক্তারের বাসা সংলগ্ন মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ায়। তখন রিফাত ফরাজী একদিন মেহেদীর কাছ থেকে স্যামস্যাং গ্যালাক্সি কোর প্রাইম মডেলের বিদেশ থেকে আনা একটি ফোন ছিনিয়ে নেন। বিষয়টি রিফাত ফরাজীর মা-বাবাসহ স্থানীয় অনেককে জানানোর পরও আমার ভাইয়ের মোবাইলটি কেউ উদ্ধার করে দিতে পারেনি। পরে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করার পর সাড়ে সাত হাজার টাকার বিনিময়ে মোবাইলটি ফিরিয়ে দিয়ে হুমকি দেন রিফাত ফরাজী। পরে রিফাত ফরাজীর হুমকিতে ওই এলাকা ছেড়ে একপ্রকার পালিয়ে আসে আমার ভাই।’

বরগুনা সরকারি কলেজের দক্ষিণ-পশ্চিমে বরগুনা পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডে নয়ন বন্ডের (২৫) বাসা। নয়নের বাবা মৃত ছিদ্দিকুর রহমান। দুই ভাইয়ের মধ্যে নয়ন ছোট। নয়নের বড় ভাই মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুর প্রবাসী হওয়ার কারণে মাকে নিয়েই ওই বাসায় বসবাস করছেন নয়ন।

২০১৭ সালের ৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে নয়ন বন্ডের বাসায় অভিযান চালায় বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদক, দুটি দেশীয় অস্ত্র ও এক সহযোগীসহ নয়ন বন্ডকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসব মাদকের মধ্যে ছিল ৩০০ পিস ইয়াবা, ১২ বোতল ফেনসিডিল ও ১০০ গ্রাম হেরোইন।

এ ঘটনায় দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী ইমামের গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী ইমামের বিরুদ্ধে। পরে তাদের জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে আসেন নয়ন বন্ড। জেল থেকেই বেরিয়ে মূলত এ হত্যাকাণ্ড ঘটান তিনি।

এ বিষয়ে বরগুনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবীর হোসেন মাহমুদ বলেন, নয়ন বন্ডের মাদক বাণিজ্যের কথা আমরা জানি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র মামলাসহ একাধিক মামলার কথাও আমরা জেনেছি। এর আগে নয়ন ও তার সহযোগী জেল খেটেছে। জামিনে তারা বেরিয়ে যায়। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়নসহ সবাইকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue