রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

রোজার কেনাকাটায় উপচেপড়া ভিড়, তছনছ সামাজিক দূরত্ব

বিশেষ প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২০, শনিবার ০৯:৩০ এএম

রোজার কেনাকাটায় উপচেপড়া ভিড়, তছনছ সামাজিক দূরত্ব

ঢাকা : শনিবার (২৫ এপ্রিল) প্রথম রোজা। শুক্রবার ছিল রোজা শুরুর আগের দিন। রোজার কেনাকাটা করতে গিয়ে তাই গতকাল দেশের বাজার-হাটে বেশ ভিড় করে মানুষ। রোজার নিত্যপণ্যের পাশাপাশি মাছ-মাংস ও সবজি কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবাই।

এ সময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা হয়নি। একে অন্যের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কেনাকাটা করেছে। ক্রেতাদের মাস্ক পরতে দেখা গেলেও বিক্রেতাদের বেশিরভাগই ছিলেন মাস্ক ছাড়া। যেসব বাজার একমুখী করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে বের হতে ও প্রবেশ করতে ক্রেতাদের কোনো দূরত্বই রক্ষা করতে দেখা যায়নি।

সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল সুপার শপগুলোতে। শপের ভেতর ও বাইরে উপচেপড়া ভিড় নিয়ে কেনাকাটা করেছে মানুষ। শপগুলোতে ক্রেতাদের লম্বা লাইন মূল সড়কেও চলে আসতে দেখা গেছে। শপের সামনে বৃত্তাকার দাগ মানা হলেও নিচে সড়কে চলে আসা লাইনে শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করা হয়নি। কেনাকাটার জন্য এ সময় মানুষকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ক্রেতাদের কেন্দ্র করে এসব শপের সামনে ভিড় ছিল ভিক্ষুকদের। সাহায্য পাওয়ার আশায় এসব দরিদ্র মানুষ জটলা করেছিল।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও সুপার শপ ঘুরে এবং ঢাকার বাইরে খোঁজ নিয়ে রোজার কেনাকাটায় এ চিত্র পাওয়া গেছে।

এমন পরিস্থিতিকে করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, কিছু কিছু এলাকায় বাজার খোলা মাঠে বা রাস্তায় নিয়ে এলেও মনিটরিং না থাকায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা যাচ্ছে না। তাছাড়া যেসব বাজার একমুখী করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ঢুকতে ও বের হতে নতুন করে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

তারা বলেন, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে হলে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে হবে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বাজারগুলো করোনার সংক্রমণে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনিরা পারভীন বলেন, কোনোভাবেই সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করা যাবে না। করোনা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সামনে এখন একটাই পথ দূরত্ব রক্ষা করা ও সুরক্ষা সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা। কীভাবে এ মাসে মানুষ বাজার করবে, হাটবাজারে যাবে, সেখানে কীভাবে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পাবে, সে ব্যাপারে বিবেচনা করা উচিত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, রমজানে মানুষ একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে। এজন্য তাদের বাজার করতে যেতে একটু দেরি হয়। তাই বিষয়টি বিবেচনা করে দোকান খোলা ও বন্ধ করার সময় বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া ইফতারি বিক্রির বিষয়েও একটি নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। যদি প্রতিদিন সকাল ৬টার পরিবর্তে ৯টায় দোকান খুলে ২টার পরিবর্তে ৬টায় বন্ধ করা হয় তাহলে সবার জন্যই ভালো হবে।

এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, আরেকটা বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। রাজধানীবাসীর বড় একটি অংশের ইফতারি কিনতে হয়। তাই কীভাবে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সবার জন্য ইফতারির ব্যবস্থা করা যায় সে বিষয়েও সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

গতকালও দেশে এক দিনে করোনা সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচশ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫০৪ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর আগে এক দিনে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল গত ২০ এপ্রিল ৪৯২ জন।

সামাজিক দূরত্ব রক্ষার মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে গত ১২ এপ্রিল দেশের সব হাটবাজার খোলা জায়গায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। একইভাবে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাটবাজার খোলা রাখার সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

এদিকে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে রমজানে রাস্তায় কোনো ধরনের ইফতারসামগ্রী তৈরি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ত্রাণ বিতরণ অথবা ইফতারসামগ্রী বিতরণের নামে জনসমাগম যেন না করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবে ত্রাণ বিতরণে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

ইতিমধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার সরিয়ে মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গায় বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে জেলা শহর ও সদর এলাকার কিছু বাজার খোলা জায়গায় বসানো হলেও উপজেলা ও গ্রামের বাজার এবং হাটগুলো আগের স্থানেই রয়েছে।

অন্যদিকে রাজধানীর দুই সিটির তালিকাভুক্ত প্রায় ২৮টি বড় কাঁচাবাজারের মধ্যে ১৪-১৫টি বাজার সরিয়ে উন্মুক্ত স্থানে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্যসব বাজারের ব্যবসায়ীরা খোলা জায়গায় যেতে রাজি হচ্ছেন না।

খোলা জায়গায় বাজার এনেও সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে না মানুষকে। বিশেষ করে গত দু-তিন দিন ধরে রোজার কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে এসব বাজারে ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লঙ্ঘিত হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব।

বিশেষ করে রাজধানীর যেসব বাজারকে একমুখী করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে বের হতে ও প্রবেশ করতে ক্রেতাদের ঠেলাঠেলি করতে দেখা গেছে। এছাড়া মাছ-মাংস ও সবজির দোকানে গায়ের সঙ্গে গা ঘেঁষেই কেনাকাটা করছে মানুষ।

একইভাবে রাজধানীর বাইরে শুধু জেলা শহরের বাজারগুলোকেই খোলা জায়গায় আনা হয়েছে। এসব বাজারের সংখ্যা খুবই কম। উপজেলা ও গ্রামের বাজার এবং ছোট-বড় হাটগুলো আগের মতোই রয়েছে। ফলে সেখানে আগের মতোই সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পাচ্ছে না। গতকালও কয়েকটি জেলায় হাটবার থাকায় সেখানে মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল। রোজা উপলক্ষে সাধারণ বাজারেও ভিড় ছিল মানুষের। কোথাও ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পায়নি বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

রোজার সময়ও বাজারগুলোতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়ায় ভিড় বেশি হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, রমজান মাসে মানুষ কেনাকাটা করে দুপুরের পর। ওই সময় দোকানপাট বন্ধ থাকলে একদিকে ক্রেতারা নিত্যপণ্য কেনাকাটা করতে পারবেন না, অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। নির্দিষ্ট সময়ে দোকান খোলা থাকলে ওই সময় মানুষ কেনাকাটা করতে ভিড় করেন। এতে করে করোনারোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

যদি দীর্ঘ সময় দোকান খোলা থাকে তাহলে ক্রেতারা সুবিধামতো সময়ে কেনাকাটা করতে পারবেন। এতে বাজার কিংবা দোকানে ভিড় কম হবে। এছাড়া রমজান মাসে ইফতারি বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে সারাদিন খোলা রাখা প্রয়োজন। তা না হলেও মুদি ও খাদ্যপণ্যের দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানো উচিত।

গতকাল রাজধানীর দয়াগঞ্জ, কারওয়ানবাজার, মগবাজার ও যাত্রাবাড়ী বাজার এবং এসব এলাকার সুপার শপগুলো ঘুরে রোজার কেনাকাটা করতে আসা মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। দয়াগঞ্জ বাজারে সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ক্রেতার ভিড় ছিল। কাউকেই দূরত্ব মানতে দেখা যায়নি। মূল বাজার দয়াগঞ্জ রেললাইনের দুই পাশে বসানো হলেও ভিড় বেশি থাকায় গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়েই কেনাকাটা করতে দেখা গেছে। এছাড়া মূল বাজারের টিনশেডের নিচে এখনো কিছু দোকানপাট থাকায় সেখানেও একই অবস্থা ছিল।

রোজার কেনাকাটা করতে কারওয়ানবাজারে গত দু-তিন দিন ধরেই ভিড় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। খুচরা কাঁচাবাজার তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের সামনের রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে সেই সড়কটি সংকীর্ণ হওয়ায় সেখানেও সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পাচ্ছে না। পাইকারি বাজারে গতকাল সন্ধ্যার পর বেশ ভিড় দেখা গেছে। এ সময় অনেকেই এক দিনে দুই-তিন সপ্তাহের বাজার করছেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া একুশে টেলিভিশনের গলিসংলগ্ন ছোট সড়কে চিড়া-মুড়িপট্টিতে বেশ ভিড় ছিল গতকাল। একই অবস্থা ছিল মগবাজার ও যাত্রাবাড়ী বাজারে।

অন্যদিকে মগবাজারসহ শহরের বিভিন্ন স্থানের সুপার শপগুলোতে উপচেপড়া ভিড় ছিল গতকাল। এর আগে এসব সুপার শপের ভেতর ও বাইরে বৃত্ত এঁকে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে দেখা গেলেও গতকাল তা হয়নি। সুপার শপের কর্মীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রোজার জন্য গত কয়েক দিন ধরেই ভিড়। তারা একজন একজন করে ভেতরে ঢোকালে সময় কুলোয় না। তাছাড়া যে লম্বা লাইন, তাতে সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে। কিন্তু শপ বন্ধ করতে হয় দুপুর ২টার মধ্যে। তাই ক্রেতারা জোর করে ঢুকে পড়ছেন।

রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় রোজার কেনাকাটায় গতকাল বিভিন্ন বাজার-হাটে মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল। এ ব্যাপারে আমাদের রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সব বাজারেই ক্রেতাদের ভিড় ছিল। বাড়তি চাপ ছিল। বাজারের ভেতর সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পায়নি। বিশেষ করে শহরের সবচেয়ে বড় বাজার সাহেবাজারে ব্যাপক ক্রেতা সমাগম ছিল।

এ প্রতিবেদক আরও জানান, রাজশাহীতে সব জায়গায় বাজার খোলা স্থানে নেওয়া হয়নি। শহরের বাজারগুলো একমুখী করা হয়েছে। এতে বাজারে ঢুকতে ও বের হতে নতুন করে জটলা দেখা দিচ্ছে। গায়ের সঙ্গে গা লেগে যাচ্ছে। দূরত্ব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে শালবাগানেও অনেক ভিড় ছিল। রোজা শুরু হচ্ছে। তাই মানুষ কেনাকাটায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সবজি, মাছ-মাংসের দোকানেই ভিড়টা বেশি দেখা গেছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে শহরের কাঁচাবাজারগুলোতে খুব ভিড় ছিল। রোজার কেনাকাটার জন্যই ভিড় ছিল অন্যদিনের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে গতকাল হাটবার থাকায় উল্লাপাড়ার পাচলিয়া এলাকায় বড় হাটে প্রচুর ভিড় ছিল। সেখানে ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব রক্ষা হয়নি। এখানে উপজেলা ও সদরের বাজারগুলোকে স্থানান্তর করা হলেও গ্রামের বাজার আগের স্থানেই রয়েছে। একইভাবে সামাজিক দূরত্ব না মেনেই কেনাকাটা করছে মানুষ।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় রোজার কেনাকাটা করতে গিয়ে লোকজনের অতিরিক্ত চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন আমাদের জেলা প্রতিনিধি।

তিনি বলেন, পণ্যসামগ্রী কিনতে দোকানপাটে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হলেও জনসমাগম ঠেকানো যাচ্ছে না। স্থানীয় বাজারগুলোতে গাদাগাদি করে লোকজন চলাফেরা করছে। অনেকেই সুরক্ষাসামগ্রীও পরিধান করছে না। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ভিড় করছে দোকানপাটে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই