বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

‘চীন মুখে বললেও মিয়ানমারের বিপক্ষে যাবে না’

রোহিঙ্গা নিয়ে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার ০৫:০৫ পিএম

রোহিঙ্গা নিয়ে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ

ঢাকা : দিন যত যাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট ততই তীব্রতর হচ্ছে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে রীতিমতো বেকায়দায় পড়েছে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারে কোনো আগ্রহ নেই। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে মিয়ানমারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করলে তারা খানিকটা নড়েচড়ে বসে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চুক্তি সই করে। কিন্তু সেই চুক্তি বাস্তবায়নে বারবার গড়িমসি করে চলছে।

এদিকে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত শিবিরগুলোর কারণে আশপাশের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের চেয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা ওই এলাকার পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা পাসপোর্ট কেলেঙ্কারিসহ নানা অপরাধে।

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশে সমালোচনা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সংকট নিরসনে সহায়তার আশ্বাস দেন।

চীনের মন্ত্রী মিয়ানমারে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার পর রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে অ্যারেঞ্জমেন্ট সই হয়। এই চুক্তির আলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তদারকি করতে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে প্রত্যেক পক্ষে ১৫ জন করে ৩০ সদস্যের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়।

দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির আলোকে, চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারির মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কাজ শুরুর কথা ছিল।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এবং চীন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সহায়তায় আশ্বাস দিয়েছে বলে সরকারের তরফে বলা হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি।

এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, এটা চীনের ভাঁওতাবাজি। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চীন বরাবরই মিয়ানমারের পক্ষে। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের কারণে প্রতিবেশী একটি দেশকে নিজেদের কব্জায় রাখতেও চীন মিয়ানমারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে সাপোর্ট করে।

সুতরাং চীন মুখে বললেও তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিপক্ষে যাবে না। সুতরাং এ বিষয়ে চীনের সাপোর্ট পাওয়া যাবে না-এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই এগোতে হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। ঘনবসতির বাংলাদেশে এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করায় পরিবেশ, জনশক্তি রপ্তানি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটনসহ সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ইতোমধ্যে হুমকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানো।

দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে ফেরত না যাওয়া পর্যন্ত তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ বহাল রাখার প্রতি জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক চাপে ইতোমধ্যে অনেকটাই ভাটা পড়েছে। আর এতে সুর পাল্টে টালবাহানা করছে মিয়ানমার।

প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের পর থেকে মিয়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। তারা দুই হাজার  রোহিঙ্গার যাচাই সম্পাদন করেও তখন ফেরত নেয়নি। বরং নানাভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বসবাস করা নিয়ে বৈধতা আদায় করতে চাইছে। সে কারণে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বহাল রাখার পক্ষে বিশ্লেষকদের অভিমত।

পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আন্তর্জাতিকভাবে ত্রাণের ব্যবস্থা করাও বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব মোদাব্বির হোসেন চৌধুরী বলেন, মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু বন্ধুপ্রতিম দেশ নয়। তারা শুধু রোহিঙ্গা পুশ ইন করছে না। তারা বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষে ৩৫টি ইয়াবা কারখানায় প্রতিদিন কোটি কোটি ইয়াবা উৎপাদন করছে। এদের মূল টার্গেট বাংলাদেশের ক্ষতি করা। ওইসব কারখানায় উৎপাদিত মরণনেশা ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে বাংলাদেশের উদীয়মান তরুণ ও যুবসমাজকে। এসব হালকা করে দেখার সময় শেষ। এ নিয়ে সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। মিয়ানমারে চক্রান্ত রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে বাংলাদেশকে চড়া মাশুল দিতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই