মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোরাল হচ্ছে কূটনীতি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৯, রবিবার ০১:৫৫ পিএম

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোরাল হচ্ছে কূটনীতি

ঢাকা : প্রত্যাবাসনের দুই দফায় তারিখ নির্ধারিত হলেও একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফিরে না যাওয়ায় সরকারের কারো কারো মধ্যে কিছু উদ্বেগের জন্ম হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলে গেলেও সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায় তেমন চিন্তিত নয়। সরকার কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি আরো জোরদার তৎপরতার মধ্য দিয়ে তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর করবেন। গুরুত্বপূর্ণ ওই সফরগুলোর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কূটনীতি আরো জোরাল হবে বলে আশাবাদী সরকার।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসন শুরুর চেষ্টা ভেস্তে গেলেও এর জন্য বাংলাদেশের সরকার দায়ী নয়। মিয়ানমার সরকারের ওপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আস্থার সংকটই দায়ী। সেজন্যই তারা দেশে ফিরে যায়নি। রোহিঙ্গারা যে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এসেছে, সেই প্রেক্ষাপট তাদের মনের মধ্যে এখনো সক্রিয় আছে।

এ উপলব্ধি সহজ নয়, সবাইকে তা বুঝতে হবে। এ বিষয়ে সফলতা-বিফলতা ও চড়াই-উতরাই হতেই পারে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্বিতীয়বারের মতো আটকে থাকলেও সরকার আরো জোরাল কূটনীতিতে সফল হলে চাপে পড়বে মিয়ানমার। তখন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।

সরকারের নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্প্রতি চীন সফরের পর দেশটির মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নতুন করে সময় নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে রাজি হয় দুই দেশ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের সহযোগিতার বিষয়েও আশাবাদী সরকার। ভারতের পক্ষ থেকে সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ও আভাস পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী অক্টোবরের শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যাবেন।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের কথা থাকলেও ভারত এটিকে দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে বিবেচনা করছে। সে ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের এপ্রিলের পর আগামী অক্টোবরে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীরা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।

শেখ হাসিনা দিল্লিতে ৩ ও ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে অংশ নেবেন। ৫ অক্টোবর তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখনো রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বাংলাদেশের পক্ষে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তখনো দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে নিউইয়র্কে আরেক দফা বৈঠকের আয়োজন করা যায় কি না, এ নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

সূত্র বলছে, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নসহ দাবিগুলোর মীমাংসা ছাড়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি নয়, এ দাবির পেছনে দেশি ও বিদেশি কিছু এনজিওর হাত রয়েছে আর এসব এনজিও সেখানে ‘রাজনীতি’ করছে বলে সরকার মনে করছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন এনজিওদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের কিছু নেতার ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এ ইস্যুতে জাতিসংঘ দায় এড়াতে পারে না বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সরকার কিছু এনজিওকে নজরদারির আওতায় আনার পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গা নেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে। দেশি ও বিদেশি কিছু এনজিও তাদের (রোহিঙ্গা) ইন্ধন জোগাচ্ছে।’

নিজ দেশে ফিরতে রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, সংকটের সমাধান আছে কূটনীতিতেই।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘সমাধানে জন্য যতটা শক্ত বা নরম হওয়া দরকার তা হতে পারে। কিন্তু এমন কথা বলা ঠিক না যাতে করে এই সমস্যা নিরসনে কোনো জটিলতা তৈরি হয়।’

তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে রোহিঙ্গা-ঢলের শুরু থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখে সরকার। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসস্থানের জন্য বনভূমিসহ প্রায় ছয় হাজার একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়।

শুরুতে কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে সরকার এসব রোহিঙ্গার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবার, ওষুধ ও পানিসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করে আসছে। পরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নেয় সরকার। পাহাড়ের ওপরে ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিতে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ভাসানচরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান এসব প্রসঙ্গে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে প্রথমে তাদের মাঝিদের (দলনেতা) রাখাইনের পরিস্থিতি দেখিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে উৎসাহী হবে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ কোনো বার্গেনিং এজেন্ট না। তাদের নিজ দেশে গিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান জানান, ‘রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফিরতে ভরসা পান, সে জন্য তাদের মাঝিদের আগে মিয়ানমার ঘুরিয়ে আনতে বলেছে সবশেষ বৈঠকে প্রস্তাব করেছে সংসদীয় কমিটি। পাশাপাশি তাদের নিজ দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা ও মিয়ানমারের ওপর চাপ আরো বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই