বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫

লজ্জার ডাকসু নির্বাচন

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার ০৩:০৯ পিএম

লজ্জার ডাকসু নির্বাচন

ঢাকা : দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। অনিয়ম আর ভোট কারচুপিসহ নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই নির্বাচন।

যদিও সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। কিন্তু ভোট জালিয়াতি, রাতেই ব্যালট বাক্সে সিল মারা ব্যালটসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগবাদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের প্রার্থীদের ভোট বর্জন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আর উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত লজ্জার মুখোশই উন্মোচিত হল ২৮ বছর পর।

প্রথমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি জানালেও পরবর্তীতে ফলাফল ঘোষণার পর বিক্ষোভে নামে ছাত্রলীগও। ডাকসুর ভিপি পদে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর বিজয়ী হওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে ছাত্রলীগ।         

সোমবার (১১ মার্চ) সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে ডাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। তবে কুয়েত মৈত্রী হলে অনিয়মের অভিযোগ উঠায় প্রথমে দুই দফা ভোট স্থগিত হয়। পরে এই হলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ভোট গ্রহণ।

এদিকে ভোট শুরুর আগেই রাতে ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়া ব্যালট পাওয়ার ঘটনা ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলে। পরে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার অভিযোগে হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট শবনম জাহানকে বরখাস্ত করা হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিনকে।  

নির্বাচনের দিন সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই নির্বাচনি কর্মকর্তাদের কাছে ব্যালট পেপার দেখতে চাওয়া হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে ব্যালট বাক্স খুলতে বাধ্য হন কর্মকর্তারা। সে সময় ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়া ব্যালট পান তারা। এছাড়া ক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা নিজেরাই অনুসন্ধান করে বস্তাভর্তি ব্যালট পেপার খুঁজে বের করেন। তারপর সেইসব ব্যালট পেপার নিয়ে তারা হলের সামনে এসে শিক্ষার্থীরা ক্রস চিহ্ন দেয়া ব্যালট পেপার নিয়ে হলের সামনে বিক্ষোভ করে। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তারা ব্যালট পেপারগুলো তুলে ধরেন, যেগুলোতে আগে থেকেই সিল দেয়া ছিল।

এছাড়া ডাকসু নির্বাচনের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর ও একই অভিযোগ তুলেন। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সিল মারা ব্যালট দেখিয়ে বলেন, কুয়েত মৈত্রী হলে জাতীয় নির্বাচনের মতো আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখা হয়েছে। ছেলেদের হলগুলোতে এমন বিশৃঙ্খলা অবস্থায় রাখা হয়েছে যে, কে ভোট দিয়েছে বা কে দেয়নি তা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।  

তিনি রোকেয়া হলে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, সকালে রোকেয়া হলে প্রার্থী ও সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শহিদুল্লাহ হল, এসএম হলে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা দেখেছি ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে যেসব গেস্টরুম, হলরুম রয়েছে, সেখানে তাদের অপরিচিত মুখকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এসব গণরুম, গেস্টরুমে যারা থাকেন, তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে।

তিনি অভিযোগে আরও বলেন, যারা ভোট দিয়ে এসেছেন, তাদেরই আবার ভোটারদের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব কর্মীকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, প্রতিটি ভোটের জন্য তারা যেন ১০-১৫ মিনিট সময় নষ্ট করে আসেন। এর প্রেক্ষিতে নুরু অভিযোগ করে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন ভোট দিতে না পারে বা বিরক্ত হয়ে চলে যায় এমন পরিকল্পনাতেই এসব করা হচ্ছে।

বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের দেখা গেছে বলেও অভিযোগ তুলেন নুর। প্রশাসনের কাছে এসব অভিযোগ করেও কোনোরকম ব্যবস্থা পাননি বলে জানান তিনি। এসব অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের কাছে গিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রশাসন একটি মেরুদণ্ডহীন দলকানা, যাদের কাছে ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের চেয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিটাই বড়।

নুর বলেন, প্রশাসন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ডাকসু নির্বাচন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীর কোনো দাবিই মানেনি। হলে ভোটকেন্দ্র করার কথা বলেছিলাম, সেটি মানেনি প্রশাসন। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স ব্যবস্থা করেনি তারা। আমাদের ও সাংবাদিকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে তারা বহিরাগতদের জন্য চলাচল উন্মুক্ত করে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন নুরু।

এদিকে বাম ঐক্যজোট থেকে ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দীও অনিয়মের অভিযোগ তুলেন। এছাড়া তার উপর ছাত্রলীগ হামলা করেছে বলেও অভিযোগ তুলেন তিনি। লিটন নন্দী বলেন, এই যে হামলা করবার চেষ্টা, এইটা তো ইতিবাচক কিছু না। আমি মহসীন হলে গিয়েছিলাম, ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওইখানে কোনো সিঙ্গেল লাইন নেই। সবাই গেইটে জটলা করে আছে এবং ছাত্রলীগের ছেলেরাও জটলা করে আছে। যখন আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনারা এখানে কী করছেন?” ঢোকা যাচ্ছে না। ওইখানে কোনো রকম গ্যাঞ্জাম হয়েছে। আমাকে ঢুকতে দেবে না।’

বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রভোস্টের সঙ্গে কথা বলার সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন লিটন। নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, এই নির্বাচনে আসলে কিছুই হচ্ছে না।’

এছাড়া ছাত্রলীগ ভোটকেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রার্থী এবং ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। সোমবার সকালে এফ রহমান হল ও হাজী মোহাম্মদ মহসিন হলের ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ দেখে তিনি এসব অভিযোগ করেন।

ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, ভোটকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে। হলের ফটকে ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকরা অবস্থান নিয়ে আছে। তারা ছাত্রদলের প্রার্থীদের কেন্দ্রে ঢুকতে দিচ্ছে না। ভোটারদের ঢুকতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি অভিযোগে আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ গেটের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি ঠিক তার উল্টো। আমরা দেখছি গোটা নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে। মোস্তাফিজ বলেন, ভোটকেন্দ্রে কৃত্রিম একটি লাইন তৈরি করে রাখা হয়েছে। লাইনে যারা দাঁড়িয়েছেন তারা সাধারণ ভোটারদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

তবে ব্যালটে সিল পাওয়াসহ নানা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি জানান বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসু নির্বাচনের ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। নির্বাচনে সিল মারা অবস্থায় যেসব ব্যালট পেপার গণ্যমাধ্যমে এসেছে, তা সঠিক নয় বলেও দাবি জানান তিনি। শোভন বলেন, ‘আপনারা যে ব্যালট পেপারগুলো দেখেছেন, সেটাতে আমাদের হল প্রভোস্টের যে সিল মারার কথা, সেই সিলের সঙ্গে কিন্তু মিল নেই। হল প্রভোস্টের সিল আর ওই ব্যালটের সিলের সঙ্গে কোনো মিল নেই।’

ছাত্রলীগ সভাপতি আরও বলেন, ‘ব্যালটটা পেয়েছে সারের বস্তার মধ্যে। কিন্তু বস্তার মধ্যে তো ব্যালট থাকার কথা না। আর সেটা ছিল শুধু হলের প্যানেলের। তাহলে আমাদের কেন্দ্রীয় প্যানেলের ব্যালটটা কোথায় গেল? সেখানে কিন্তু কেন্দ্রীয় প্যানেলের ব্যালট ছিল না, শুধু হলের ব্যালট ছিল। হলের ব্যালটে প্রভোস্টের যে সিল সেই ওরজিনাল ব্যালট পেপারের আর এই ব্যালট পেপারের সিল কিন্তু এক না।’

এদিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী ডাকসু নির্বাচনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী, নুরুল হক নুর ও ছাত্রদলের নেতা অনীকের বিরুদ্ধে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলেও জানান।

তিনি বলেন, সাধারণ ছাত্ররা পাশে থাকলে শাহবাগ থানায় মামলা করা হবে। ডাকসু নির্বাচনের দিন রোকেয়া হলে ব্যালট বাক্স উদ্ধার ও বিভিন্ন ইস্যুতে গুজব ছড়ানোর ঘটনায় করা হবে এই মামলা। লিটন, নূর ও অনীকরা সাধারণ ছাত্রদের কাছে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে ও ছাত্রদের উত্তেজিত করেছে বলে দাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের।

এদিকে রোকেয়া হলের তিনটি ট্রাংক থেকে উদ্ধার ব্যালটের বিষয়ে জানতে চাইলে রাব্বানী বলেন, দরজা ভেঙে বের করেছে, এসব হল সংসদে ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরির জন্য কোটা আন্দোলনের নূর, ছাত্রদলের অনীক ও বামজোটের লিটন নন্দী জড়িত। তিনি বলেন, ব্যালট নয় আমাদের স্বপ্ন ছিনতাই করা হয়েছে।

ডাকসু নির্বাচনে নানা অনিয়ম আর ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন শেষে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্রলীগ বাদে অন্যান্য প্যানেলগুলো। নির্বাচন বর্জন করে ভোট বাতিলের দাবি জানায় ছাত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ চারটি প্যানেলের প্রার্থীরা।

সোমবার (১১ মার্চ) বেলা ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে চার প্যানেলের পক্ষে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তের কথা জানায় প্রগতিশীল ছাত্র-ঐক্যের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী।

তিনি বলেন, বর্জন করা প্যানেলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, স্বাধীকার স্বতন্ত্র পরিষদ ও স্বতন্ত্র জোট। পরে আরেক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান একই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে লিটন নন্দী বলেন, আমরা সকাল থেকে নির্বাচন দেখেছি। আগেই ভোটের সময় বাড়াতে বলেছিলাম, আঙ্গুলে কালি দেওয়া ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সকালে কুয়েত মৈত্রী হলে ব্যালটে সিল মারা, রোকেয়া হলে এক ঘণ্টা পড়ে ভোট শুরু করা ও সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের নূর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দিপ্তির ওপর হামলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন প্রত্যাখান করছি। প্রশাসনকে ভোট বাতিল করে পুনঃতফসিল ঘোষণা করতে হবে। আর অ্যাকাডেমিক ভবন ছাড়া হলে ভোটের পরিবেশ নেই। নির্বাচন কমিটি বাতিল করে নতুন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করতে হবে। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স তৈরি করতে হবে।’

এছাড়া নির্বাচনে ভোট জালিয়াতিতে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলন শেষে উপাচার্যের কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের নেতাকর্মীরা।

অপরদিকে আরেক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ভোট ডাকাতির এ নির্বাচন আমরা বর্জন করলাম।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট প্রদানে বাধা ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের মারধরসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগেরও দাবি জানান।

ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। অবিলম্বে নতুন তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেন তারা।

পরে মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে চার জোটের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন (ডাকসু) প্রত্যাখ্যান করে নতুন করে ভোটগ্রহণের দাবি হাস্যকর। তিনি বলেন, 'তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিবেচনা করতে চাইলে সেটা তাদের ব্যাপার। আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে, তাই আমরা নিয়ম মেনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে মেনে নেব।'

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, 'ডাকসু নির্বাচন বানচাল করার জন্য আগের রাতেই ষড়যন্ত্র হয়েছে। আজকে (সোমবার) তার সফল মঞ্চায়ন হয়েছে।'

কারা এই ষড়যন্ত্র করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ছাত্র ইউনিয়নের লিটন নন্দী, কোটা আন্দোলনের নুরুল হক নুরু ও ছাত্রদলের অনীক।'

কুয়েত মৈত্রী হল থেকে উদ্ধার করা সিলমারা ব্যালট আসল নয় দাবি করে ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, কুয়েত মৈত্রী হলে যে ব্যালট পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে আসল ব্যালটের মিল নেই। ২৮ বছর পর যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই একটি মহল কাজ করছে।

রোকেয়া হল থেকে ব্যালট উদ্ধারের ঘটনা টেনে রাব্বানী বলেন, রোকেয়া হল থেকে কীভাবে ব্যালট ছিনতাই হয়েছে, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবাই দেখেছেন। নুরু দরজা ভেঙে ব্যালট ছিনতাই করেছে। এখন আবার আহত হওয়ার ভান ধরেছে। ব্যালট ছিনতাই করে নুরু শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন চুরি করেছে।

এদিকে ডাকসু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলে ভিপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুরকে। আর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এছাড়া সহ সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনকে। সোমবার (১১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টা ৪০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এ ফলাফল ঘোষণা করেন উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান।

পরবর্তীতে ডাকসু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সহসভাপতি (ভিপি) পদে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুর নির্বাচিত হওয়ায় ফল প্রকাশের পরই প্রতিবাদ জানিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ।

ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদে সিনেট ভবনে নুর বিরোধী শ্লোগান দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় উপাচার্যের কাছে দাবি জানিয়ে নবনির্বাচিত ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘স্যার আপনি ডাকসুর সভাপতি। আপনার কাছে আবেদন বিষয়টি বিবেচনা করবেন। কারণ নুরকে স্বাধীনতা বিরোধী একটি দল সমর্থন দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।’ এদিকে ফলাফল ঘোষণার পরে ছাত্রলীগের বিক্ষোভের মুখে রাত ৪টার দিকে সিনেট ভবন ত্যাগ করেন উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান।

নুরুল হক নূর ভিপি হওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকালে ভিসির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ। তারা কোনোভাবেই ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) হিসেবে নুরুল হককে মেনে নিবে না বলে দাবি জানায়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নুরুল হক জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই তাকে তারা ভিপি হিসেবে মানবে না। সকালে বিক্ষোভের সময় উপাচার্য তার বাসভবনেই ছিলেন।

এদিকে ডাকসু নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. আখতারুজ্জামান।

নির্বাচন প্রসঙ্গে এক ব্রিফিং এ তিনি বলেন, ‘যতটুকু ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করলাম, অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের শিক্ষার্থীদের যে গণতান্ত্রিক বোধ, যে মূল্যবোধ, এটা দেখে আমি বেশি বিস্মিত হয়েছি। আশা করি, শিক্ষার্থীরা আজ যে উদাহরণ রাখল এটি আমাদের নতুন মাত্রায় অনুপ্রেরণা দেয়। সামনের দিনগুলোতেও এই গণতান্ত্রিক যে আচরণ, যে রীতিনীতি, সেটিকে বেগবান করে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ঢাবি উপাচার্য।  

সোনালীনিউজ/এমটিআই