শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯, ৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ

লোপাট ৮৫ কোটি টাকা!

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার ০২:২৯ পিএম

লোপাট ৮৫ কোটি টাকা!

ঢাকা : স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ঠিকাদারকে তার পাওনার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

লুটপাটের এই অর্থ দ্রুত আদায় করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে। অন্যথায় আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার সচিব মো. হেলাল উদ্দিন মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) টেলিফোনে বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রায় শতকোটি টাকার অডিট আপত্তি তুলেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। তবে আমি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেক সভায় ছিলাম। ফলে সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকে আমাদের একজন অতিরিক্ত সচিব যোগ দিয়েছিলেন। তিনি আরো বিস্তারিত বলতে পারবেন।

তিনি বলেন, আমরা সংসদের নির্দেশনা মোতাবেক কার্যকর পদক্ষেপ নেব অবশ্যই। জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মঙ্গলবার এই লুটপাটের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

কমিটির বৈঠক কমিটির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ফরাজীর সভাপতিত্বে গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
কমিটির সদস্য মো. আবদুস শহীদ, মো. আফছারুল আমীন, মো. শহীদুজ্জামান সরকার, সালমান ফজলুর রহমান, জহিরুল হক ভূঞা মোহন, আহসানুল ইসলাম (টিটু), ওয়াসিকা আয়েশা খান ও মো. জাহিদুর রহমান ওই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

জানা গেছে, স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা ও উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও নারায়ণগঞ্জ)-এর ২০১১-১২ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত বাংলাদেশের কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের বার্ষিক অডিট রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত ১৮টি অডিট আপত্তির ওপর বৈঠকে আলোচনা হয়।

জানা গেছে, হাট-বাজার ইজারা মূল্যের ২০ শতাংশ ও ৫ শতাংশ সেলামি হিসেবে আদায় না করায় ৬৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব লোপাট হয়েছে। ইজারা মূল্য এবং ট্রেড লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ফি ও যন্ত্রপাতি ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করার কথা সংস্থাগুলোর। কিন্তু এখানে ৩ কেটি ৯১ লাখ ১৩ হাজার কোটি রাজস্ব লোকসান হয়েছে। ভ্যাট আদায় না করে এবং কম আদায় করায় এ লোকসান হয়েছে।

ইজারা মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ আয়কর আদায় না করায় ও আদায়কৃত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না করায় ৭০ লাখ ৭১ হাজার টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে সংসদে উঠে এসেছে। ঠিকাদারের বিল হতে আদায়কৃত আয়কর বাবদ ৬২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ঠিকাদারের বিল হতে ৫ দশমিক ৫ হারে ভ্যাট বাবদ আদায় করার কথা।

কিন্তু এই খাতে কম আদায় ও আদায় না হওয়াতে ১ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

ইজারাদারের নিকট থেকে অনাদায়ী অর্থ আদায় না করায় সংস্থাগুলোর ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি, বিভিন্ন রসিদের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ এবং পৌরকর পৌর তহবিলে জমা না করায় ৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা সংস্থার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

পৌর ফিলিং স্টেশন ও বাস টার্মিনাল ইজারা, বিজ্ঞাপনী সংস্থা দোকান, জমি ও যন্ত্রপাতি ভাড়ার ওপর এবং ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নকালে লাইসেন্স গ্রহণকারী ব্যক্তির নিকট হতে উৎসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ২ কোটি ২৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা লুটপাট হয়েছে।
ঠিকাদারের মোট পরিশোধিত বিলের ওপর ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৬১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আদায় না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঠিকাদারের বিল এবং বাস টার্মিনাল হতে ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর আদায় না করায় ও কম আদায় করায় রাজস্ব লোকসান হয়েছে ৬৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

বিভিন্ন গাড়িতে সরবরাহকৃত জ্বালানি জাত দ্রব্যাদি (লুব্রিকেন্ট) বিলে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ যোগ করে পৌর ফিলিং স্টেশনকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করায় সংস্থার ২৬ লাখ ১২ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি, ডেন্স বিটুমিনাস সারফেসিং (প্লান্ট) প্রিমিক্স বিটুমিনাস প্রতি বর্গমিটার প্রাক্কলিত মূল্য অপেক্ষা অস্বাভাবিক ও অধিকহারে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করায় সংস্থার ৯ লাখ ২ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংসদ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।

গোমতী ফিলিং স্টেশনের নামে কোনো সিএনজি গ্যাস স্টেশন না থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ফিলিং স্টেশনের নামে বিভিন্ন গাড়ির সিএনজি গ্যাস ক্রয় দেখিয়ে বিল পরিশোধ করায় সংস্থার ৩ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হিসাবে এসেছে।

মিরপুর গাবতলী গবাদি পশুর হাট ইজারালব্ধ অর্থের ওপর ৫ শতাংশ অর্থ সেলামি বাবদ এবং ‘৭-ভূমি রাজস্ব’ খাতে জমা প্রদান না করায় ৩৫ লাখ ৫ হাজার টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। শিডিউল অব রেইটস অপেক্ষা অস্বাভাবিক বেশি দরের আইটেমের কাজ করার ফলে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়।

এর মাধ্যমে ১৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, এসিআই ফরমুলেশন লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও এসিআই হতে মশা নিবারক কীটনাশক এডালটিসাইড ক্রয় না করায় ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার  টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়নকালে অগ্রিম আয়কর করার কথা থাকলেও করা হয়নি।

ফলে ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকা আদায় না করায় রাজস্ব ক্ষতি এবং ইজারাদারদের নিকট থেকে ইজারা বাবদ ৯ লাখ ৮২ হাজার  টাকা অনাদায় থাকায় সংস্থার আর্থিক ক্ষতি শীর্ষক অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সাক্ষ্য গ্রহণ, প্রশ্ন-উত্তর ও জেরা পর্ব শেষে অর্থ দুই মাসের মধ্যে আদায় করতে বলেছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই