সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮, ৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

চট্টগ্রাম-১৩ আসন

শক্ত অবস্থানে আ.লীগ, বিভক্ত বিএনপি, তৎপর ইসলামী দল

জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম ব্যুরো | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার ১২:৩০ পিএম

শক্ত অবস্থানে আ.লীগ, বিভক্ত বিএনপি, তৎপর ইসলামী দল

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম-১৩ সংসদীয় আসন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার ২৯০তম আসন। সীমানা যার আনোয়ারা-কর্ণফুলী দুটি উপজেলায় এক আসন। মোট ভোটার রয়েছে ৩ লক্ষ ৯ হাজার ৩৯৯ জন। আসনটি’র আনোয়ারা উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন এবং কর্ণফুলী উপজেলায় রয়েছে ৫টি ইউনিয়ন।

এর মধ্যে কর্ণফুলীতে ১ লাখ ১০ হাজার ৭৫৭ জন ও আনোয়ারায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪২ ভোটার। কর্ণফুলী উপজেলায় ভোটকেন্দ্র ৩৯ টি আর ভোটকক্ষ ২৫৫টি। এছাড়াও আনোয়ারায় ভোটকেন্দ্র ৬৭টি আর ভোটকক্ষ বেড়ে ৪০১টি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীগণ গণসংযোগ, মতবিনিময় সভা ও নানামুখী নির্বাচনী পথসভা এবং দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আসনটিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল থাকলেও বিগত নির্বাচনের ফলাফল তথা নির্বাচনী মাঠের বাস্তবতা মতে আসনটিতে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র প্রার্থীর মধ্যে। তাও যদি বিএনপি ভোটে যায়। আর সে কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে কে হচ্ছেন নৌকার মাঝি এবং কে পাচ্ছেন ধানের শীঁষ এ নিয়ে নির্বাচনী এলাকা সরগরম হয়ে উঠছে।

এ আসনটিতে টানা দুইবার ক্ষমতাসীন আ.লীগ, এর আগেও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এ আসনে এমপি ছিলেন। নৌকার ঘাটি হিসেবে খাতায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। তবে এক সময় ২০০১ সালে সরওয়ার জামাল নিজাম এর হাতে এ আসনটি বিএনপি’র রাজ্যও ছিলো।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চমক দেখাতে একই প্রার্থী  কিংবা নতুন কোন হেভিয়েট প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করছে বলেও জানা যায়। তবে বর্তমান এমপি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ নিজের অবস্থান তৈরী করায় পুনরায় আসনটি বিএনপির ঘরে তুলতে কঠিন হতে পারে। কেননা বিগত ৯বছরে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড করে গেছেন তিনি।

যদিও সম্ভাব্য বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ঘরে বসে নেই, চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ থেকে মাঠ, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। নিজেকে প্রকাশ করার জন্য নানা ভাবে শুরু করেছেন প্রচার প্রচারনা। আর নির্বাচনী এলাকায় পরিবেশ দেখে তা বুঝা যাচ্ছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-
আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের যে মনোনয়ন যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে, সেটি আসলে মনোনয়ন দ্বন্দ্ব। বর্তমান ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই উপজেলার সক্রিয় নেতারা রয়েছেন। অপরদিকে আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ওয়াশিকা আয়েশা খাঁন এমপির সাথে উপজেলার উল্লেখ্যযোগ্য কোনো নেতাকর্মী নেই। তবে প্রয়াত পিতার পরিচিতি ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি হিসেবে একটি পক্ষের জনসর্মথন রয়েছে তা অস্বীকার করা যাবেনা।

নিজ আসন ধরে রাখতে দৌঁড় শুরু করেছে আওয়ামী লীগের বর্তমান ভূমি প্রতিমন্ত্রী জাবেদ এমপিও। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে যেকোন ভাবে এলাকায় জনসাধারণ ও নেতাকর্মীদের সময় দিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রতি শুক্রবারে সংসদীয় আসনের বিভিন্ন মসজিদে মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। এছাড়াও নির্বাচনী এলাকায় মাঠে নানা কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করে নৌকায় ভোট চাইছেন।

জানা যায়, ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী দলের তৎকালীন সভাপতিম-লীর সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে তাঁর বড় ছেলে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা তরুণ নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাবেদ। তাঁকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। জাবেদের মন্ত্রিত্বকে অনেকে দেখেন দলের জন্য তাঁর বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বিশাল ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে।

প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ কর্ণফুলী উপজেলা বাস্তবায়ন ছাড়াও আনোয়ারায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেন। সেই সঙ্গে কর্ণফুলীর তলদেশে ট্যানেল, আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক জোন, পারকি সমুদ্রসৈকতে পর্যটন কমপ্লেক্সের মতো বড় প্রকল্প গুলোরও কৃতিত্ব তাঁকে দেওয়া হচ্ছে।

এ কারণে কর্ণফুলী উপজেলা এলাকায় সাইফুজ্জামান চৌধুরীর অবস্থান অনেক সুদৃঢ় হয়েছে বলে জানান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কেননা দল ক্ষমতায় তাই জনগণকে সহযোগিতা করা সহজ ছিল তার পক্ষে।

বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোতে এ আসনের আনোয়ারা উপজেলায় আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত পশ্চিম পটিয়া। যা বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলা। কর্ণফুলী থানাকে উপজেলা করার ক্ষেত্রে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভূমিকার কারণে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে বলে অভিমত স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। কেননা প্রতিমন্ত্রী একটি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন।

কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রনি বলেন, ‘কর্ণফুলীবাসীর একটাই স্বপ্ন ছিলো কর্ণফুলীকে উপজেলা হিসেবে রূপান্তর করা। আর সে স্বপ্ন ভূমিপ্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি পূরণ করেছেন। তাই কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। আমাদের লক্ষ্য একটাই, আগামী নির্বাচনে কর্ণফুলীর উন্নয়নের কান্ডারি ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপিকে পুনরায় এই সংসদীয় আসনটি উপহার দেয়া।’

এদিকে আনোয়ারায় বাবু পরিবারের বাইরে আওয়ামী লীগের আরেকটি ধারা রয়েছে তা হচ্ছে আরেক বর্ষীয়ান নেতা দলের সাবেক সভাপতিম-লীর সদস্য প্রয়াত আতাউর রহমান খাঁন কায়সারের। বর্তমানে তাঁর অনুসারীদের নেতৃত্বে রয়েছেন মেয়ে বেগম ওয়াশিকা আয়শা খাঁন, যিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য। তা ছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। নির্বাচনকে ঘিরে মনোনয়নের আশায় তিনিও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। তাঁর অনুসারী দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সহযোগিতার মাধ্যমে উজ্জীবিত করে রেখেছেন।

ওয়াশিকা আয়েশা খানের সমর্থিত আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল বশর বলেন, ‘আমাদের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সারে সুযোগ্য কন্যা এ আসন থেকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন। আশা করি আমাদের নেত্রী সফল হবেন।’

আগামী জাতীয় নির্বাচন ও মনোনয়ন বিষয়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, ‘আনোয়ারার জনগণের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের রক্তের সম্পর্ক। তাঁর বাবা যত দিন বেঁচে ছিলেন, এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে ছিলেন। বাবার অবর্তমানে এখন তিনি সে কাজটি করার চেষ্টা করছেন।’

তিনি আরো বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ভূমি প্রতিমন্ত্রী করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সহযোগিতায় আনোয়ার ও কর্ণফুলী এলাকায় প্রায় দুহাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছেন বলে তিনি জানান। এছাড়াও পশ্চিম পটিয়াকে কর্ণফুলী নামে স্বতন্ত্র উপজেলায় উন্নীত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।’

এছাড়াও এ আসনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নুরুল কাইয়ুম খান সিআইপি এবং দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা মহিউদ্দিনও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি): বিএনপি যদি ২০০১ সালের মতো হারানো দুর্গ ফিরে পেতে চায় তাহলে এ আসনে যোগ্য প্রার্থী দিতে হবে। কারণ আ.লীগের প্রার্থী একজন হেভিওয়েট প্রার্থী। তার সঙ্গে দুর্বল প্রার্থী দিয়ে ভোটযুদ্ধ জমে উঠবে না। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে না গেলেও নীরবে দলকে সংঘঠিত করছেন। পাশাপাশি দলের মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে।

আনোয়ারা-কর্ণফুলী সংসদীয় আসনের বিএনপির দলীয় মনোনয়ন চাইবেন সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আলী আব্বাস, বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান। দ্বি-ধারায় বিভক্ত আনোয়ারা-কর্ণফুলী বিএনপিতে চলছে হিসাব নিকাশ। বিগত কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দলের তৃণমূল নেতাদের দূরে রেখে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে সরওয়ার জামাল নিজামের বিরুদ্ধে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলীয় নেতাদের কোন খবর রাখেনি বলেও অভিযোগ দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের।

এছাড়াও এ আসনে নির্বাচনী ফলাফলে পার্থক্য গড়ে দেয় কর্ণফুলী এলাকা। এ এলাকার কারা নির্যাতিত নেতা দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আলী আব্বাস তৃণমূলে অনেকদিন কাজ করে গেছেন অতীতে। দলের দুঃসময়েও পাশে ছিলেন। জেল হতে বের হয়ে নেতাকর্মীদের প্রায় খোঁজ খবর নিচ্ছেন। দল নির্বাচনে গেলে আগামী মনোনয়নের বিষয়ে তিনি আশাবাদী বলে তার অনুসারীরা জানান।

তবে নতুন মুখ হিসেবে আনোয়ারা-কর্ণফুলী বিএনপির সাথে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অনুসারিরা রাজনীতির মাঠে একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এ অংশকে সাথে নিয়ে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন বিএনপি নেতা ব্যবসায়ি মোস্তাফিজুর রহমান।

এ লক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি ও দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাদের একতাবদ্ধ করতে চেষ্টা করছেন। নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন আনোয়ারা-কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক ও দলীয় কর্মকাণ্ডে। বিএনপির একটি অংশ তাকে সমর্থন দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ম্যাডাম (বেগম খালেদা জিয়া) এখন কারাগারে বন্দি। নির্বাচন নিয়ে ভাবনার চাইতে আমরা বেগম জিয়ার মুক্তি কিভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবছি। বিএনপি একটি নিবাচনমুখী দল। আগামী নির্বাচনে বিএনপি দলের ত্যাগী ও তরুণদের মনোনয়ন দিবেন। তাই আশা করি, আমি মনোনয়ন পাবো এবং বিএনপির হারানো আসন পুনরুদ্ধার করে ম্যাডামকে পুনরায় উপহার দিতে পারবো।’

আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। তবে দেশে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় বিএনপি থেকে নির্বাচনের নিদের্শনা আসলে আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসন থেকে সাবেক সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজামকে নির্বাচিত করতে বিএনপির সকল অঙ্গ সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।’

জানা যায়, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা স্থানীয় বিএনপি এখন দুই ধারায় বিভক্ত। একাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম। অন্য অংশের আনোয়ারায় নেতৃত্বে আছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কবির চৌধুরী ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মোশাররফ হোসেন এবং কর্ণফুলী উপজেলা এলাকায় নেতৃত্বে রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক আলী আব্বাস। উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে দুই পক্ষেরই আলাদা আলাদা কমিটি রয়েছে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সরওয়ার জামাল নিজাম আবারও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। অন্যদিকে কবীর চৌধুরীর অনুসারীদের মধ্যে মনোনয়ন চাইবেন ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান।

দলটির স্থানীয় প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর সরওয়ার জামাল নিজাম সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন এবং কোনো ধরনের খবর রাখেননি। তবে এলাকায় তাঁর পছন্দের কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন বলে জানায় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ‘জাতীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি কিছু বলতে পারব না।’

জাতীয় পার্টি: ২০১৪ সালেও এ আসনে জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন । তবে সুবিধা করতে পারেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুনরায় সংগঠনকে গুছিয়ে নিতে র্দীঘদিন এলাকায় কাজ করেছেন। সুতরাং এবারো এ আসনে আলোচনায় আছেন বহিস্কৃত চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির সিনিয়র সহ সভাপতি তপন চক্রবর্তী। এছাড়াও আনোয়ারা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আবদুর রব চৌধুরী টিপুর নাম ও শোনা যায়।

এক্ষেত্রে তপন চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান আমাকে আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্র ঘোষিত ১৫০ প্রার্থীর তালিকায়ও আমার নাম রয়েছে। তাই আমি নিশ্চিত দলের মনোনয়ন আমি পাবো।’

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট: বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিনের নেতৃত্বে আনোয়ারা-কর্ণফুলী দুই উপজেলায় নেতাকর্মীদের নিয়ে সমাবেশ করতে দেখা যায়। এ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী এম এ মতিন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিন বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আমাদের জোট থেকে নির্বাচনে গেলে জোট আমাকে প্রার্থী করলে আমি প্রার্থী হব।’

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ: ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে বেশ সক্রিয় রয়েছেন । এ আসন থেকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রিজভী মনোনয়ন চাইতে পারেন। যিনি এর পুর্বে কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও নির্বাচন করেছিলেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রিজভী বলেন, ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে আমাদের দু’জনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আমাকে যদি দল মনোনয়ন দেয় আমি আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসন থেকে নির্বাচন করব।’

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, বিগত নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী আসনটিতে সরওয়ার জামাল নিজাম ১৯৯৬ সালে প্রায় ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতাউর রহমান খান কায়সারকে হারান। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকেও। তবে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তাঁকে প্রায় ২৩ হাজার ভোটে হারিয়ে জয়ী হন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় দলের শক্ত অবস্থান রয়েছে। সে কারণে আসন্ন একাদশ সংসদ সদস্য নির্বাচনে উভয় দল চায় আসনটি দখলে নিতে। ইতিমধ্যে আসনটি দখলে নিতে উভয় দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

তথ্যমতে, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে এক সময় আনোয়ারা উপজেলাকে আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক ও কর্ণফুলী উপজেলাকে বিএনপির ভোট ব্যাংক মনে করা হতো। কর্ণফুলী উপজেলা বাস্তবায়নের পর সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলার ৫ ইউপি চেয়ারম্যানের সবাই আওয়ামী লীগের অনুসারী।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সাল থেকে দেশে নয়টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দশম শেষে একাদশে পা দিয়েছে আজ। ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ ইদ্রিছ বিকম। ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।

১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে সাংসদ হন জাসদ প্রার্থী মোখতার আহমেদ। ১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম। একই বছর ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও জয়লাভ করেন তিনি। ২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম।

পরবর্তী ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু সর্বশেষ সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে তাঁর মৃত্যুতে ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি উপ নির্বাচনে মনোনয়ন পান তারই জ্যেষ্ঠ পুত্র ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।

নির্বাচনে জাবেদ বিজয়ী হওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন নতুন প্রজন্মের এই নেতা। এরপর ৫ জানুয়ারির বিএনপি বিহীন নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাবেদ। পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেলে আনোয়ারা-কর্ণফুলীবাসী প্রথমবারের মতো মন্ত্রীর স্বাদ পায়।

মন্ত্রী হিসেবে জাবেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি আর্থিক সুবিধা, বেতন ভাতা গ্রহণ না করে আলোচনায় আসার পাশাপাশি এ তরুণ নেতা তার দাপ্তরিক কাজে গতি ও স্বচ্ছতার কারণে সারাদেশে ক্লিন ইমেজ তৈরিতেও সক্ষম হয়েছেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে বদলে যেতে থাকে পুরো আনোয়ারা-কর্ণফুলীর চিত্র। এমন কি কর্ণফুলীবাসীর জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে ৪৯০তম উপজেলায় পরিণত করেন। সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে এবং বিএনপি’র বিভক্ত নেতারা এখনো কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে বলে জানা যায়।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue