সোমবার, ২০ মে, ২০১৯, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

আ.লীগের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে

শরিকদের ‘মন ভালো’ নেই

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার ০৩:৪৫ পিএম

শরিকদের ‘মন ভালো’ নেই

ঢাকা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ১৪ দলের শরিকদের ‘মন ভালো’ নেই! শরিকদের কেউ মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পেয়ে প্রথমে ‘অবাক ও বিস্মিত’ হলেও এখন দলগুলো স্পষ্টতই মনোকষ্টে ভুগছে। দলগুলোর শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট এখন আসলে কতটা কার্যকর, এমন প্রশ্ন দলগুলোর।

জোর করে দলের ঐক্য টিকে আছে কি না, এমন প্রশ্নও তারা করছেন। আওয়ামী লীগের প্রতি কোনো কোনো দলের নেতার ‘ক্ষোভ’ বাড়ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলগুলোর দূরত্ব বাড়ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

১৪ দলের অভিযোগ, একাদশ সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় বিজয়ের পর থেকে আওয়ামী লীগ ‘একলা চলো নীতি’ অনুসরণ করছে। ১৪ দলের প্রতি আগের মতো আওয়ামী লীগের আর ‘আগ্রহ’ নেই। নির্বাচনের আগে থেকেই ১৪ দলের বৈঠকে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের উপস্থিতি থাকছে না। এ ধরনের অভিযোগ জোটের বৈঠকেও তুলে ধরেছেন তারা।

জোটের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, ১৪ দলের শরিক জাসদের (আম্বিয়া) কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দিন খান বাদল গত ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত জোটের বৈঠকে ১৪ দলের অস্তিত্ব প্রসঙ্গে কথা বলেন। এক পর্যায়ে তিনি রসিকতা করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমকে বলেন, ‘১৪ দল এখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চলে গেছে। আপনি (মোহাম্মদ নাসিম) জোটকে ডা. দেবী শেঠির (ভারতের প্রখ্যাত হূদরোগ বিশেষজ্ঞ) ভূমিকায় বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।’ রসিকতা করে এমন মন্তব্য করা হলেও কোনো কোনো নেতার অভিযোগ, এরও এক ধরনের বাস্তবতা আছে।

তবে বৈঠকে, এমনকি বৈঠক শেষেও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন- ‘১৪-দলীয় জোট ছিল, আছে ও ভবিষ্যতে অটুট থাকবে। এ বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকার অবশেষ নেই।’

তিনি ছাড়া আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েক নেতা একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর একাধিকবার জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার ধারা অব্যাহত রাখতে ১৪-দলীয় জোট এখনো প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। জোটের ঐক্য আগের মতোই আছে। জোটের মধ্যে কোনো ধরনের বিবাদ, ভাঙন বা টানাপড়েন নেই। যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।’

শরিকদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন টানা তৃতীয়বারের সরকারের মধ্যে এবারই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি শরিক দলের কোনো নেতার। সরকারের তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যোগ হওয়ার আলোচনা চলছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি না হলে শেষ সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় যোগ হতে পারে আরো নতুন মুখ। দ্বিতীয় দফায়ও ১৪ দলের কারো মন্ত্রিসভায় যোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জোর প্রচারণা আছে। তবে ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের সময় ১৪ দলের কেউ কেউ ঠাঁই পেতে পারেন বলে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একটি সূত্র বাংলাদেশের খবরকে জানায়।

জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ নাসিম গত ৮ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে জানান, ‘শরিকদের পরবর্তীতে মূল্যায়ন করবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমবার মন্ত্রিসভায় রাখা হয়তো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মন্ত্রিসভায় রদবদল হলে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই জোটের শরিকদের কথা চিন্তা করবেন। কারণ, বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে ১৪ দলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তাই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় আছে।’

অন্যদিকে চলমান উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আলাদা অংশ নেওয়ার ঘোষণাকে ‘একলা চলার নীতি’ হিসেবে বিবেচনা করছে জোটের মিত্ররা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগও ১৪ দলের শরিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অংশ নেয়নি। এসব ঘটনায় জোট থাকলেও ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জোটগত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ‘আভাস’ পাচ্ছে কোনো কোনো শরিক দল। তাই নিজেদের মতো করে আলাদা চলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে দলগুলো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১৪ দলের শরিক একটি দলের শীর্ষ নেতা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ১৪ দল জোটগতভাবে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের উদযাপিত বিজয় সমাবেশে ১৪ দলের নেতাদের উল্লেখযোগ্য আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছিল না। গত সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসন বণ্টন নিয়েও আওয়ামী লীগের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করার অভিযোগ আছে। এতেও ক্ষুব্ধ জোট শরিকরা।’

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রস্তাব অনুযায়ী জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসা নিয়েও শরিক দলগুলোতে ‘অস্বস্তি’ আছে। একই প্রতীকে ভোট করার পর এখন তাদের বিরোধী দলে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। সরকারের চাওয়া মতো বিরোধী দলে গেলে ‘আদর্শিক এ জোটের ঐক্য অটুট থাকবে না’ বলেও তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন। তবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন নিয়ে দলগুলোতে মতানৈক্যও আছে। কয়েকটি দল বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকতে চায়।

সরকারি দলের সূত্র জানায়, একাদশ সংসদ নির্বাচন শেষে মহাজোট ও ১৪ দলের শরিক দলগুলোকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকতে আওয়ামী লীগ অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেওয়ার পর কয়েকটি দল ‘নাখোশ’ হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংসদে বিরোধী দলগুলো সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে যে ভূমিকা পালন করে থাকে, তেমন বিরোধী দলের ভূমিকায় শরিক দলগুলোকে দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। এ কৌশলের কারণে শরিকদের অনেকটা দূরে রাখছে আওয়ামী লীগ।

মন্ত্রিসভায় শরিক দল থেকে অন্যবারের মতো কাউকে না রাখা ও মন্ত্রিসভা শতভাগ আওয়ামী লীগের হওয়ার পর থেকে ১৪ দলের সঙ্গে ‘মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব’ বাড়ছে। সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিজয় সমাবেশে শরিক দলগুলোকে সেভাবে আমন্ত্রণ না জানানোয় আওয়ামী লীগ ‘একলা চলো নীতিতে’ চলছে বলে ভাবছে শরিকরা।

১৪-দলীয় সূত্র জানায়, জোট গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের বড় কোনো কর্মসূচি থাকলে এর আগে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। এবারের নির্বাচনের ১৯ দিন পর ১৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের উদযাপিত সমাবেশে ১৪ দলকে অংশ নিতে সেভাবে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। সমাবেশের আগের দিন ১৪ দলের কয়েক নেতাকে আওয়ামী লীগের কার্যালয় থেকে ফোন করা হলেও তা ছিল ‘শ্রোতা’ হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ।

সোনালীনিউজ/এমটিআই