বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন তারা

ফিচার ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০১৯, শনিবার ০২:৩১ পিএম

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন তারা

ঢাকা: শারীরিক সমস্যার কারণে তাদের প্রতিবন্ধী বলা হয়। কেউবা খাটো, কেউবা হুইল চেয়ারে চলাফেরা করে, কারো আবার এক পা নেই। কেউবা হাত-পায়ের সমস্যা নিয়ে জন্মেছেন। কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় অঙ্গ হারিয়েছেন।

তাতে কি, যাদের স্বপ্ন আকাশছোঁয়ার, স্বপ্নকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনার অদম্য আগ্রহ যাদের, তাদের কে-ই বা দমাতে পারে? ব্যাডমিন্টনের মতো গতিময় খেলায় তারা নিজেদের দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। একজন সাধারণ মানুষের চাইতেও তারা বেগমান। ছুটছেন সামনের দিকে। এবারের প্যারা ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে তারা দেখিয়েছেন সাফল্যের চমক। শুধু তা-ই নয়, প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামী বছর প্যারা অলিম্পিকে খেলার জন্য।

বলছি হেলাল, আবু তাহের, মৌলভীবাজারের আলীরাজ রাজু, নারায়ণগঞ্জের ইয়ামীন, আবদুর রহিমের কথা। শারীরিক বাধা তাদের একটুও দমাতে পারেনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তারা দাঁড়াতে চান নিজ পায়ে। কারো নির্ভরশীলতা নিয়ে নয় বরং জীবনযুদ্ধে জয়ী হতেই তারা বেছে নিয়েছেন খেলাধুলা।

‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ মন খারাপ হলেই গভীর রাতে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা গানটি শোনেন হেলাল হোসেন। কবি রুদ্রের এলাকা মোংলাতেই জন্ম হেলালের। কিন্তু এই শহরে তার মনের কথা শোনার মতো কেউ নেই। হেলালের বয়স ২২ বছর। শারীরিক উচ্চতা ৩ ফুট। স্বপ্ন দেখতেন বড় ফুটবলার হবেন। বাধা হয়ে দাঁড়াল উচ্চতা। আকারে ছোট বলে কেউ তাকে দলে নিতে চাইত না। শেষ পর্যন্ত রাগে ক্ষোভে ফুটবলই ছেড়ে দিলেন। সেই হেলাল প্যারা ব্যাডমিন্টনে নিজের ঝলক দেখালেন। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া প্যারা ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে এসএস সিক্স শ্রেণিতে (শর্ট স্ট্রেচারে) চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন হেলাল। কাজ করেন বড় ভাইয়ের মোটর পার্টসের দোকানে। গ্যারেজের সামনে পরিত্যক্ত সিনেমা হলের ভেতর রাতের বেলা চলে অনুশীলন। আগামী সেপ্টেম্বরে থাইল্যান্ড ও চীনে আন্তর্জাতিক প্যারা ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেবে বাংলাদেশ। সেই দলে খেলবেন হেলাল। স্বপ্ন দেখেন আগামী বছর টোকিও প্যারা অলিম্পিক খেলার।

নারায়ণগঞ্জের আবু তাহের নিয়মিত ব্যাডমিন্টন খেলেন। সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পা হারিয়ে যখন বেঁচে থাকার আশাটাই কমে যাচ্ছিল, তখন তাকে আলোর পথ দেখান ব্যাডমিন্টন কোচ ও সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন এনায়েত উল্লাহ খান। তাহেরের মনোবল এখন এতটাই যে, একপায়ে মোটর সাইকেল চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে পল্টন উডেনফ্লোর জিমনেসিয়ামে আসেন অনুশীলন করতে।

উচ্চতা কম বলে ইয়ামীনকে নিয়ে বন্ধুরা হাসাহাসি করত। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডে মুদি দোকানদার তিনি। ইয়ামীন প্যারা ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের এসএস সিক্স শ্রেণিতে রানারআপ হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই ইয়ামীন ব্যাডমিন্টন খেলতেন। কিন্তু তার উচ্চতার কারণে কেউই তাকে খেলায় নিত না। অবশেষে তার আশা পূরণ হয়েছে। ইয়ামীন স্বপ্ন দেখেন দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবেন। অলিম্পিক প্যারা ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট খেলবেন। দেশের জন্য বয়ে আনবেন নতুন গৌরব।

বড় ভাইয়ের পথ ধরে এখন ব্যাডমিন্টন খেলছেন ইয়ামীনের ছোট ভাই আবদুর রহিম। তারও ইচ্ছা ভালো কিছু করার।

জন্মগতভাবে এক পায়ে সমস্যা আলীরাজের। বাঁ পায়ের আঙুলে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটাচলা করতে হয়। কিন্তু ওই এক পা নিয়েই ধুমছে ফুটবল, ক্রিকেট আর ব্যাডমিন্টন খেলেন তিনি। তিনি এবার এসইউ (স্টান্ট আপার) ফাইভ ক্যাটাগরিতে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। মৌলভীবাজারে আলীরাজের বাবা অটোরিকশা চালান। সংসারের হাল ধরতে বাড়ি বাড়ি পার্সেল সরবরাহ করতে হয় আলীরাজকে। সারাদিনে এসব কাজ করতে করতে সময় কেটে যায়। খেলার সময় পাওয়া যায় না। এত বাধার মধ্যে প্যারা ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন হয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত আলীরাজ।

প্রতিবন্ধী ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের (শার্টলার) নিয়ে কাজ করছেন কোচ এনায়েতউল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ায় দুই বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রথমবার প্রতিবন্ধীদের নিয়ে তৈরি একটা প্রামাণ্যচিত্র দেখেছিলাম। এরপরই ভাবী আমাদের দেশের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কিছু করব। টাকাপয়সা ও খেলার সরঞ্জাম দিয়ে তাদের উৎসাহ বাড়িয়েছি। এরকম কিছু খেলোয়াড় নিয়ে একাডেমি করেছি। প্যারা ব্যাডমিন্টনের পাঁচটি ধাপ আছে। এগুলো হলো- হুইল চেয়ার ওয়ান, টু; এসএল থ্রি, এসএল ফোর, এসইউ ফাইভ, এসইউ সিক্স।

বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ও তথ্যসচিব আবদুল মালেক এ ব্যাপারে যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন বলে জানালেন তিনি। তাছাড়া নিখিল চন্দ্র ধরের (ব্যাডমিন্টন এশিয়ার রিজিওনাল কর্মকর্তা) প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান।

এনায়েতউল্লাহ বলেন, “আমি ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় এশিয়ান প্যারা গেমসে যাই এবং সেখানে তাদের খেলা দেখি। সেখান থেকে ‘স্পোর্টস ওয়ার্কশপ’ করি। ২০১৮ সালে জাপান থেকে ‘কোচ ডেভেলপার’ কোর্স করি। স্বপ্ন দেখি এই টিম নিয়ে ২০২০ সালে জাপানে প্যারা অলিম্পিক খেলায় অংশগ্রহণ করব। চেষ্টা করব দেশের জন্য তারা যাতে সম্মান বয়ে আনেন।”

২০১৯ সালের ১২ ও ১৩ এপ্রিল প্রথম প্যারা ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। এ বছরই ১৫-১৬ মে ‘প্যারা ব্যাডমিন্টন ট্রেনিং ক্যাম্প’ অনুষ্ঠিত হয়। প্যারা ব্যাডমিন্টনে খেলোয়াড় নির্বাচনের জন্য পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন এনায়েতউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিভিন্ন  জেলা থেকে শহরে, তারপর শহর থেকে গ্রামেও গিয়েছি ভালো খেলোয়াড়ের সন্ধানে। অনেকেই প্রথমে এই খেলা নিয়ে উৎসাহ দেখাত না। অনেকই মনে করত এই ব্যাডমিন্টন খেলে কী হবে। আস্তে আস্তে তাদের ব্যাডমিন্টন খেলায় প্রলুব্ধ করা, তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছি।’

বর্তমান প্যারা অলিম্পিক কমিটি অব বাংলাদেশের সভাপতি হলেন পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। সাধারণ সম্পাদক হলেন মাকসুদুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘প্যারা ব্যাডমিন্টন খেলায় প্রতিবন্ধীরা আরো যাতে বেশি বেশি অংশগ্রহণ করতে পারে, সেজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। আমরা চেষ্টা করছি তাদের কিছু দেওয়ার। ইতোমধ্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য অনুদানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্যারা অলিম্পিক কমিটির কাছে আবেদন করেছি। আশা করছি অচিরেই আমরা সুখবর পাব।’

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এসআই