মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

শেষ মুহূর্তে আ.লীগের প্রার্থী তালিকা ওলটপালট

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৮, বুধবার ১২:২৮ পিএম

শেষ মুহূর্তে আ.লীগের প্রার্থী তালিকা ওলটপালট

ঢাকা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে এসে তাতে পরিবর্তন হচ্ছে। এক প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও নানা কারণে যোগ হচ্ছে অন্যপ্রার্থীর নাম।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল, শক্তিশালী তদবির, জোট-মহাজোটের শরিক দলের জন্য আসন বণ্টন ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী বিবেচনায় ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নির্ধারিত প্রার্থী তালিকা।

ঘোষণার আগে খসড়া তালিকা থেকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মিলিয়ে আরো অন্তত ২৫ থেকে ৩০ সংসদ সদস্যের নাম বাদ পড়তে পারে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড সূত্র এসব তথ্য জানায়।

সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের অন্তত তিনজন সদস্য নিশ্চিত করেন, মন্ত্রিসভায় থাকা ৪২ জনেরই নাম আছে মনোনীত প্রার্থীদের খসড়া তালিকায়। তবু তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো মনোনয়ন ‘ঝুঁকিতে’ আছেন। গত সোমবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদীয় বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বোর্ডের ওই তিন সদস্য বলেন, জোট ও মহাজোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগিসহ ব্যবসায়ী, তারকা, সাবেক আমলা ও পেশাজীবীদের মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। ফলে দল মনোনীত প্রার্থীর সবশেষ খসড়া তালিকা থেকে আরো অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জনের নাম বাদ পড়তে পারে বলে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার (২০ নভেম্বর) বলেন, ‘হেভিওয়েট ব্যক্তি, সংসদ সদস্য ও নেতারা মনোনয়ন তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন। কারা পড়তে পারেন, এ মুহূর্তে বলব না। চমক বলব না, নানা কারণে বাদ পড়তে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন আপাতত শেষ হয়েছে। এখন জোটের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালানো হচ্ছে। আসন ভাগাভাগির বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে। ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময় আছে, ২৪ বা ২৫ নভেম্বরের মধ্যে তালিকা প্রকাশ করা হবে। শরিকদের ৬৫ থেকে ৭০টি আসন দেওয়া হবে।’

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের খসড়া তালিকায় ঢাকা-১ আসনে নাম আছে দলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের। মহাজোটের প্রার্থীর কারণে এ আসনে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী বদলে যেতে পারে। নোয়াখালী-৪ আসনে দলের মনোনীত একরামুল করিম চৌধুরী। তবে আসনটি দলের সম্ভাব্য শরিক ও বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানকে ছেড়ে দিতে ইতোমধ্যে একরামুলকে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েক নেতা জানান, দলের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছে, এমন প্রার্থীদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে তা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের কাছ থেকে প্রার্থীরা নানাভাবে মনোনয়ন পাওয়া ও না-পাওয়ার বিষয়ে জানতে পারছেন। এরপর দলের সম্ভাব্য তালিকা থেকে বাদ পড়া মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে অনেকে শুরু করেন তদবির।

সূত্র জানায়, কোনো কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এসে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করছেন। দলের শীর্ষ সারির ও প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়েও মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ভিড় করছেন গণভবনে। তাদের নিয়ে গণভবনে অনির্ধারিত সভাও হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২০ নভেম্বর) রাতেও আওয়ামী লীগের কয়েক শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক হয় গণভবনে। শক্তিশালী চেষ্টা ও তদবিরের মাধ্যমে কারো কারো নাম সম্ভাব্য তালিকায় যোগ হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের জরিপে এগিয়ে থাকলেও দলের দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমানের নাম খসড়া তালিকায় ছিল না। তদবিরের পর তাদের নাম ‘ঝুলন্ত’ অবস্থায় আছে। তবে তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়নি।

কে কোন আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন, এ বিষয়েও দলের নীতিনির্ধারকরা এখনো ভাবেননি। নানকের নিজ এলাকা ঢাকা-১৩ ও আবদুর রহমানের ফরিদপুর-১ আসন।

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের জেরে ‘ঝুঁকির’ মুখে আছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েক নেতা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল বদলের হিড়িক পড়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে বা অন্য দলে যাচ্ছেন। আবার বিএনপি বা অন্য দল থেকেও আওয়ামী লীগে আসছেন।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কাছে তথ্য আছে, বিএনপির মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করার পর দলটির বঞ্চিত ও শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারেন। এমন অন্তত তিন চারজনকে মনোনয়ন দেওয়ার পরিকল্পনা আছে আওয়ামী লীগের।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এবার মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল দলের। এ সিদ্ধান্ত থেকেও শেষ মুহূর্তে সরে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

অভিযোগ আছে, নানা কারণে আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে দলের মনোনয়ন দিতে নিজস্ব গঠনতন্ত্রও ‘উপেক্ষা’ করছে। মনোনীত প্রার্থীর তালিকা করতে দলের সভাপতির করানো জরিপকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশের ঐতিহ্যবাহী এ রাজনৈতিক দল মনোনয়নপ্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে।

তথ্য মতে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে গঠনতন্ত্রে একটি বিধান যোগ করে। দলের গঠনতন্ত্রের ২৭ অনুচ্ছেদে তখন যোগ হয়, ‘প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা কেন্দ্রীয় সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডে পাঠাতে তৃণমূলকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং এই তালিকা থেকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে হবে।’

দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, দলের বিতর্কিত নেতাদের অনুসারীরাও তৃণমূলের বিভিন্ন পদে আছেন। মতামত পাঠাতে বললে তারা ওই বিতর্কিতদের নাম পাঠান। বিতর্কিত ও অজনপ্রিয় নেতাদের অনেককেই এবার মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। ফলে তৃণমূলের মতকে ক্ষেত্র বিশেষে উপক্ষো করা হয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই