মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

সব ‘ভুল‍‍’ মধ্যবিত্তের?

রাজু নূরুল | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২০, বুধবার ০৮:৩৮ পিএম

সব ‘ভুল‍‍’ মধ্যবিত্তের?

ঢাকা : আমার ফেসবুক বন্ধুরা 'মধ্যবিত্তের ভুল ছিল' শিরোনামে একটা লেখা শেয়ার দিচ্ছেন। সেখানে মধ্যবিত্ত টাকা না জমিয়ে ফাস্টফুড খায়, রেস্টুরেন্টে যায়, গ্রামে না গিয়ে পাহাড়ে যায় ঘুরতে বলে অভিযোগ করছেন। বলছেন যে, এই করোনায় যে মধ্যবিত্ত খুব বিপদাপন্ন অবস্থায় ঢাকা ছাড়ছেন তার দায় তাদেরও! লেখাটা খুব মন দিয়ে পড়লাম। আমার দুই-চারটা কথা আছে!

আজকের এই মহাসংকটের জন্য আসলে কে দায়ী? মধ্যবিত্ত নাকি অন্য কেউ? এই খেটেখুটে খাওয়া জনগণ নাকি যারা নীতিনির্ধারণ করেন তারা? এই যে করোনা প্রায় ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল, তার জন্য কি মধ্যবিত্ত দায়ী নাকি এয়ারপোর্টে আমাদের নিরাপত্তার অভাব, টেস্ট কিটের অভাব, লকডাউনের নামে সাধারণ ছুটি, শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে আবার টেনে ঢাকায় নিয়ে আসা, ঈদে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকা, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ডাক্তার না থাকাটা মূলত দায়ী?

আমাদের কি ধারণা আছে এ দেশের কত মানুষ দারিদ্র্য কিংবা দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে এখনো? সরকারের হিসাবে দারিদ্র্য সীমার নিচে ১৩ শতাংশ আর ২০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ধরলে এই ২০ শতাংশ জনসংখ্যা মানে প্রায় সোয়া সাড়ে তিন কোটি! করোনায় গত চার মাসে নতুন করে আরো কোটি মানুষ দারিদ্রের খাতায় নাম লিখিয়েছে! আগের হিসাবটা ধরলেও, সাড়ে তিন কোটি মানুষকে দিনে এনে দিনে খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হয়। এক দিন আয় করতে না পারলে তাদের না খেয়ে থাকতে হয়। এটাই কিন্তু বাংলাদেশ। এসব মানুষকে নিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এখন এসব মানুষ যখন কাজ করতে পারছে না, তাদের না খেয়ে থাকতে হচ্ছে, তখন তাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব আসলে কার? কারণ এ মানুষগুলো কিন্তু কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে না। কাজ করার অনুমতি নাই কিংবা কাজের অভাবে এই মানুষগুলো ঘরে বসে আছে। কাজ না পেয়ে আমেরিকার মতো সভ্য দেশের মানুষের মতো লুটপাট করছে না। তারা নিভৃতে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে শহর ছেড়ে যাচ্ছে! তাদের সঞ্চয় শেষ হয়ে এসেছে, তাই তারা 'পালিয়ে' যেতে বাধ্য হচ্ছে! তাহলে যার কোনো অপরাধই নাই, তাকে দায়ী করার কারণটা কি?

এই সাড়ে তিন কোটি প্লাস নিম্ন মধ্যবিত্ত আরো কয়েক কোটি মানুষ এই শহরে কোথায় থাকেন? তারা কোনো মতে বাসার মতো কিছু একটায় মাথা গুঁজে রাখেন। শহরে যত মানুষ এদেশে থাকে, তার প্রায় ৩৮ ভাগ বস্তিতে থাকেন! আশ্চর্যের কথা হলো, সেই বাসা ভাড়াও আকাশ ছোঁয়া। কখনো কখনো তাদের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক শুধু বাড়ি ভাড়া বাবদ খরচ করতে হয়। আজ থেকে ১০ বছর আগে এই বাড়ি ভাড়া কত ছিল? অথবা সেই ৯০ দশকে যার কথা লেখাটায় বলা হলো? যেউ বাসায় মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই, সেখানে ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডার প্রশ্ন কোত্থেকে আসে? বাড়ির ছাদ আসলে কার? ৩৮ শতাংশ বস্তিবাসীর আড্ডার জায়গা তো রাস্তা! এই যে ১০ বছরে বাড়ি ভাড়া এতগুণ বাড়ল, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কি মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কিংবা দরিদ্র মানুষের বেতন বেড়েছে? এর সঙ্গে যোগ করুন খাদ্যদ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, বিদুৎ পানি গ্যাসের লাগামহীন দামবৃদ্ধি, বাচ্চাদের শিক্ষা খরচ। তাহলে তাদের যে সঞ্চয়ের কথা বলা হলো, সেই মধ্যবিত্ত সঞ্চয় করবে কী করে? প্রায় ৫০ লাখ পোশাক কারখানার শ্রমিক যে বেতন পায়, যেটা মাসে ৫ থেকে ১৫০০০ হাজারের মধ্যে; সেই টাকা দিয়ে দৈনন্দিন জীবনযাপন করে টাকা জমানোর প্রসঙ্গ অবান্তর!

মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত বড় বড় রেস্টুরেন্টে খেয়ে টাকা ওড়ায়, সেই ধারণা সত্য কী মিথ্যা তারচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, কেউ আয় করলে খরচ করার অধিকার তার আছে। সে তার রোজগার করা টাকা কীভাবে খরচ করবে, সেই প্রশ্ন করাটা রীতিমতো অসভ্যতা। আজ দরিদ্র বলে টাকা খরচ করার বিষয়ে তাকে যেরকম উপদেশ দেওয়া যাচ্ছে, ঠিক একইরকম উপদেশ কি আমরা উচ্চবিত্তকে করার সাহস রাখি? অথবা যাদের মাসের আয় ৫০ হাজার টাকা হলেও ৩ লাখ টাকা মাসে খরচ করছে, আমরা কিন্তু তার আয়ের উৎস জিজ্ঞাস করছি না। বরং আমরা উদ্বিগ্ন মধ্যবিত্ত কেনো রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত কেনো পাহাড়ে ঘুরতে যাচ্ছে। এ থেকে মনে হয়, পাহাড়ে শুধু তারাই যাবে, যাদের অনেক টাকা। মধ্যবিত্তের পাহাড় দেখার অধিকার নাই! আচ্ছা মধ্যবিত্ত তো আজকাল সিনেমাও দেখতে পারে না। সিনেমা হল কেড়ে নেয়া হয়েছে। ওখানে যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নাই! তার বদলে বানানো হয়েছে মাল্টিপ্লেক্স। কয়জন মধ্যবিত্তদের সামর্থ আছে সিনেপ্লেক্সে গিয়ে মুভি দেখার? কেউ কালেভদ্রে গেলেও তার যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছি!

আমরা হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি দেখছি৷ আড়াই কোটি টাকা দিয়ে একটা ওয়েবসাইট বানানোর পায়তারা দেখছি, আমরা দেখছি যে কেনাকাটার নামে গোটা স্বাস্থ্য খাতকে লুটপাট করা হয়েছে। যার জন্য আজ গোটা খাতে শুধু নাই আর নাই। কেন নাই, সেই ন্যায্য প্রশ্নটা উত্থাপন না করে আমরা প্রশ্ন তুলছি, মধ্যবিত্ত কেন পালাচ্ছে, কেন টাকা জমা রাখে না, কেন তারা রেস্টুরেন্টে যায়, কেন তারা পাহাড়ে ঘুরতে যায়, কেনো পকেটে টাকা থাকলে ভালো খাবার-দাবার নিয়ে মেতে ওঠে!

আমাদের মতিভ্রম এই লেভেলে পৌঁছে গেছে যে, আমরা ভুলে যাচ্ছি কাকে কী প্রশ্ন করতে হয়। আসল কথা হলো, মধ্যবিত্তকে নিয়ে প্রশ্ন করা সহজ! তাই সিস্টেম কলাপ্সের অপরাধীকে প্রশ্ন না করে আঙ্গুল তোলা যাচ্ছে যে, তুমি ভালমন্দ খাও কেন?

অথচ সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়িয়ে 'মানুষ' করার পণটা মাটিচাপা দিয়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাওয়া মধ্যবিত্তের কান্নাটা এই ব্যস্ত শহরের গোঙ্গানির শব্দে চাপা পড়ে যাচ্ছে! অভিযোগ নয়, কান পাতুন, সেই শব্দ বক্ষভেদি! ‍

লেখক : উন্নয়নকর্মী


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।