সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

শেষ হলো জেল‍া প্রশাসক সম্মেলন

সমৃদ্ধ দেশ গড়ার নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার ১২:৩২ পিএম

সমৃদ্ধ দেশ গড়ার নির্দেশনা

ঢাকা : প্রথমবারের মতো পাঁচ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) শেষ হয়েছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে ২০২১ সালের মধ্যে পরিপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখে দুর্নীতিমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি খাদ্যে ভেজালরোধ এবং কৃষিজমি রক্ষা করে পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ করে দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টির ওপর এবারের ডিসি সম্মেলনে জোর দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, এবারের ডিসি সম্মেলনে অন্য বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ পুনর্বাসন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসৃজন পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, শিক্ষার মানোন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ, ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

এদিকে এবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশব্যাপী চলমান উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে ডিসিদের মাঠপর্যায়ে আরো আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের যে গতিধারায় এগিয়ে চলেছে সে ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস-জঙ্গি, মাদক, খাদ্যে ভেজালসহ বিভিন্ন বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

নির্দেশনাগুলো হচ্ছে-বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বছরব্যাপী মুজিববর্ষ পালন। দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশের নিচে নামানো। মাদক নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ। মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা। অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা, তবে অপ্রয়োজনীয় সেতু ও রাস্তা নির্মাণ না করার দিকে নজরদান। তথ্যপ্রযুক্তিগত যোগাযোগ নিশ্চিত করা। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে কাজ করা।

নারীশিক্ষার হার বৃদ্ধিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। ভূমি প্রশাসনের স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাইজড করা। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। ভেজাল খাদ্য রোধ করা। দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ডাক্তারদের উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকা নিশ্চিত করা। পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১২ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া।

আদালতে মামলাজট কমাতে গ্রাম্য সালিশ-বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ। জেলার কমিটিগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। বিভিন্ন সেবা সপ্তাহ যথাযথ মর্যাদায় পালন করা। শিল্পের পরিবেশ বজায় রাখতে পরিবেশ উন্নয়ন করা। পাশাপাশি চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পদক্ষেপ গ্রহণ। বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ। নারী নির্যাতন, সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ। নারীর প্রতি সহিংসতা কঠোরভাবে প্রতিরোধ। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতে উদ্যোগ গ্রহণ। প্রতিবন্ধীদের সেবা নিশ্চিত করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ। পার্বত্য জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা। গ্রাম পর্যায়ে থেকে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ।

জেলার আকার বিবেচনায় রেখে উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ। চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। স্কুল-কলেজের মাঠের পাশাপাশি মিনি স্টেডিয়াম তৈরির জন্য জায়গা নির্ধারণ। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে মডেল মসজিদ নির্মাণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গৃহহীন মানুষদের পুনর্বাসন ও নিজগৃহে ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ।

জানা গেছে, এবারের ডিসি সম্মেলনে দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাস-জঙ্গি-মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ভেজাল খাদ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ধনী-গরিব নির্বিশেষে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিতকল্পে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুতি, এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন ডিসিরা। এছাড়া মাঠপর্যায়ে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে মানুষের সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে বন্যাসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাদের। এছাড়া প্রয়োজনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রাকৃতিক যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় সিভিল প্রশাসনকে সহযোগিতা করবে বলেও ডিসি সম্মেলনে জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

উল্লেখ্য, এবারের ডিসি সম্মেলনে মোট ২৯টি অধিবেশন ছিল, এর মধ্যে কার্য-অধিবেশন ছিল ২৪টি। এবারের সম্মেলনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত ৩৩৩টি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগসংক্রান্ত সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ২৯টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে।

এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত ২৬টি এবং ভূমি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত ২০টি প্রস্তাব এসেছে। কার্য-অধিবেশনগুলোতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনগুলো সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কার্য-অধিবেশনগুলোতে নিয়মানুযায়ী সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম।

জানা গেছে, প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনের উদ্বোধনের পর ডিসিদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। এদিন একটি কার্য-অধিবেশনই অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিন সোমবার ছয়টি কার্য-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেন ডিসিরা। এরপর ওইদিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারা। তৃতীয় দিন মঙ্গলবার পাঁচটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

এদিন ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেন ডিসিরা। এরপর প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারা। চতুর্থ দিন আটটি কার্য-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে ডিসিদের বৈঠক সম্পন্ন হয়।

এছাড়া এদিন সকালে তিন বাহিনী প্রধানের সঙ্গে বেঠক সম্পন্ন করেন তারা। শেষ ও পঞ্চম দিন বৃহস্পতিবার চারটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেষদিন চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া শেষদিন বিকালে জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে (স্পিকার ড. শিরীন শারমিন দেশের বাইরে থাকায়) সাক্ষাৎ করেন ডিসিরা।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue