মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬

সময় মেড ইন বাংলাদেশের

রায়হান উল্লাহ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ জুন ২০১৯, সোমবার ০১:০৩ পিএম

সময় মেড ইন বাংলাদেশের

ঢাকা : দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী দক্ষিণ এশিয়ার অপেক্ষাকৃত তরুণ দেশ বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর এর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীনা ঋণের কথা বলছেন তারা। তাদের মতে, দেশটির ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

জানা যায়, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ ভাগ। কিন্তু চলতি বছর তা ৮ দশমিক ১৩ ভাগ অর্জিত হবে বলে আশা করছে সরকার। যদি তা অর্জিত হয় তবে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হবে অন্যতম।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। এতে অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ক্রমেই বিদেশি বিনিয়োগের আকর্ষণে এসেছে।

এর জন্য অনেক কারণও আছে। এদেশে শ্রমের মূল্য কম। সে কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখান। এমনকি বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ প্রস্তুতেও সহায়ক সরকার। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যা যা করা দরকার সবই করছে।

আশার কথা, এমনই প্রচেষ্টার ফসল বাংলাদেশে ৩৫ লাখ শ্রমিক স্থানীয় ও ইউনিকোল, এইচঅ্যান্ডএমের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করছে। মাইকেল কোরসের মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাকও এখন বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। চীনে মজুরি বেড়ে যাওয়ায় অনেক পোশাক প্রস্তুতকারকই আগামীতে ‘মেড ইন চায়না’র বদলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ ব্যবহার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

অনেকে এও বলছেন, সময় এখন মেড ইন বাংলাদেশের। নিচের কিছু খণ্ডচিত্র এ কথার সত্যতা প্রকাশ করে।

চীনা ব্যবসায়ী লিও ঝুয়াং লিফেং ২২ বছর আগে প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখন দেশটির চিত্র ছিল ভিন্ন। এতটা সময় পেরিয়ে অনেক বদলে গেছে দেশ। লিও ঝুয়াং লিফেংয়ের বয়স এখন ৫১ বছর। তিনি ১৯৯৭ সালে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি দেওয়ার জন্য ঢাকায় আসেন। সে সময় শ্রম খরচ কম ও পর্যাপ্ত শ্রমিকের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি।

বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তন নিয়ে ঝুয়াং বলেন, সে সময় ঢাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাব ছিল। এমনকি ইন্সট্যান্ট নুডলস কেনাটাও সহজ ছিল না। বর্তমানে তার এলডিসি গ্রুপে কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক।

ঝুয়াংয়ের কারখানাটি দেখতে একটি গ্রামের মতো। সেখানে স্টাফ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিনা পয়সায় সেবা দিতে মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। এমনকি শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টারেরও ব্যবস্থা রয়েছে।

ঝুয়াং এখন বাংলাদেশে চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট। তিনি যখন প্রথম বাংলাদেশে পা রাখেন তখন মাত্র ২০ থেকে ৩০টি চীনা কোম্পানি এদেশে কাজ করত। তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০-তে।

এমন আকর্ষণেই হংকং এবং চীনের অনেক উদ্যোক্তার মতো এদেশে কারখানা গড়ে তুলেছেন চীনা ব্যবসায়ী ফেলিক্স চ্যাং ইয়োই-চোং। শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় ১০ বছর আগে নিজের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি। তার মতো আরো অনেকে একই কাজ করছেন। তিনি বলেন, আমাকে এশিয়ার যেকোনো স্থানে কারখানা সরিয়ে নিতে হয়েছিল। এটা শুধু বেতনের কারণে নয়, আমাদের দেশে শ্রমিকদের যে সামাজিক কল্যাণমূলক সুবিধা দেওয়ার কথা তার মূল্যও অনেক বেড়ে যাচ্ছিল।

এক দশক আগে চীনের শেনঝেন, গুয়াংঝৌউ এবং কুনমিংয়ের মতো শহরে কারখানা ছিল ফেলিক্স চ্যাং ইয়োই চোংয়ের। তিনি গুয়াংঝৌউয়ের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। এছাড়া অন্য কারখানাগুলোও সীমিত করা হয়েছে। বর্তমানে তার কোম্পানিতে যে পরিমাণ পরচুলা উৎপাদন হয় তার শতকরা ৯৩ ভাগই হয় বাংলাদেশে।

এসব সুখের চিত্রকল্পের মাঝেই গত ৯ মে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৬৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে দেশে প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে প্রত্যক্ষ মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে ১ হাজার ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। এসব অর্থের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করেছে ৮৩৪ কোটি ডলার। এছাড়া নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতে ১১৩ কোটি ডলার, বস্ত্রখাতে ৪০ কোটি, ব্যবসা খাতে ১৫ কোটি ও অন্যান্য খাতে ১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেদারল্যান্ডস মোট ৬৯২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করলেও খাদ্যে বিনিয়োগ করেছে ৬০৮ কোটি ডলার, যুক্তরাজ্য বিনিয়োগ করেছে ৩৭১ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ১৭৪ কোটি, সিঙ্গাপুর ১৭১ কোটি, হংকং ১৭০ কোটি, ভারত ১২১ কোটি, নরওয়ে ১০৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

এছাড়া মালয়েশিয়া ৯৩ কোটি, উত্তর কোরিয়া ৭৩ কোটি, মরিশাস ৬৮ কোটি, শ্রীলঙ্কা ৬১ কোটি, জাপান ৫৮ কোটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৫৬ কোটি, তাইওয়ান ৫২ কোটি, সুইজারল্যান্ড ৪৯ কোটি, ব্রিটিশ ভার্জিন আইসল্যান্ড ৪৪ কোটি, বারমুডা ৩৭ কোটি, জার্মানি ২৬ কোটি, সুইডেন ২২ কোটি ও অন্যান্য দেশ মিলে বিনিয়োগ করেছে ১৩৭ কোটি ডলার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৯২ মিলিয়ন ডলার, ২০০৮-এ এসে ১ বিলিয়ন অতিক্রম করলেও ২০০৯ সালে আবারো ১ বিলিয়নের নিচে নেমে যায়। ২০১১ সাল থেকে বিনিয়োগ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সাল শেষে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদন বলছে, সমমূলধন হিসেবে পাওয়া বিনিয়োগ ২০১৭ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি অর্জিত হয়েছে, পুনঃবিনিয়োগ খাতও গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। ২০১৭ সালের মতো ২০১৮ সালেও সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এসেছে বিদ্যুৎখাতে, পরের অবস্থানে রয়েছে খাদ্য ও বস্ত্র খাত।

সামগ্রিক বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম বলেন, অর্থনীতি শক্তিশালী থাকার কারণে ঋণ মোকাবিলা করতে সক্ষম বাংলাদেশ। এদিকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ এখন অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলাম মনে করেন, সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে শিগগিরই বাংলাদেশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকার কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচকে বাংলাদেশের যে ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত পূরণের চেষ্টা চলছে। এক দরজায় সেবা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেওয়া শুরু হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগ পরিবেশ ভালো। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রার মজুত বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের উপরে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি সহনীয়। এমনকি নির্বাচনের বছরেও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি দেখা যায়নি। দেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। সরকার অত্যন্ত বিনিয়োগবান্ধব। তিনি বলেন, নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য জনশক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রভৃতি খাতের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাতিষ্ঠানিক মুনাফার দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই