শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

সাফল্যের বাতিঘর সাইদা খানম

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার ০৮:৪৮ পিএম

সাফল্যের বাতিঘর সাইদা খানম

ঢাকা : সাইদা খানম বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার নারী আলোকচিত্রী, যিনি নিজেকে রেখেছেন সবার আড়ালে। প্রচারে যিনি একেবারেই বিশ্বাস করেন না। যারা ফটোগ্রাফির জগতের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছে সাইদা খানম আদর্শ এক তারকার নাম। সাইদা খানম সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি সিনেমাটোগ্রাফার নন, তাই চলচ্চিত্রে সরাসরি কাজ করেননি। কিন্তু সত্যজিতের ছবির শুটিংয়ে উপস্থিত থেকে তিনটি ছবিতে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন।

১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন সাইদা খানম। মায়ের নাম, নাছিমা খাতুন। তার বাবা আবদুস সামাদ খান কাজ করতেন শিক্ষা বিভাগে। মাত্র বারো বছর বয়স থেকে ছবি তোলা শুরু করেন। সে সময় মুসলিম পরিবারের নারীরা পড়াশোনা করার সুযোগই ঠিকমতো পেতেন না।

সেই আমলে কারো তোয়াক্কা না করে ছবি তোলার সাথে সংযুক্ত হওয়াটা ছিল অন্যরকম এক সাহসের ব্যাপার। একজন নারী হয়েও তিনি এই সাহস দেখিয়েছিলেন।

তার বাবা ছবি তোলায় সম্মতি দিলেও আপত্তি ছিল কেবল দুটি জায়গায়। বিয়ের আসরে আর স্টেডিয়ামে গিয়ে ছবি তোলা যাবে না। প্রথমটি মানলেও দ্বিতীয় কথাটি রাখতে পারেননি। ছবি তুলেছেন, আসলে কাজের খাতিরে তুলতে হয়েছে।

ক্যামেরা হাতে তুলে নিয়েছিলেন ১৯৪৯ সালে। তবে পেশাদারিত্বের শুরুটা ‘বেগম’ পত্রিকার হাত ধরে, ১৯৫৬ সালে। মেজো বোন একটি ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন। সেটি দিয়ে কিশোরী কাজের মেয়ের ছবি তুলেছিলেন সাইদা। পত্রিকায় ছবি প্রকাশ হওয়ার পর যা হওয়ার কথা, তা-ই হলো। একে তো নারী আলোকচিত্রী, তার ওপর ছবির বিষয়বস্তুও এক কিশোরী- এলাকার মানুষ নানা ধরনের বিরূপ মন্তব্য করতে শুরু করল। তবে এদিক দিয়ে তাকে সম্পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে তার পরিবার।  

সবচেয়ে বড় সুযোগটি করে দিয়েছিলেন ‘জায়েদী স্টুডিও’র মালিক জায়েদী। ঢাকায় সে সময় ছবি তোলার স্টুডিওর সংখ্যা হাতেগোনা। এর মধ্যে জায়েদী স্টুডিওর ডাকনাম ছিল বেশ। জায়েদী সাহেব সাইদাকে শুধু যে ছবি নিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তা-ই নয়, তিনি এ সম্পর্কিত প্রচুর বইপত্র-ম্যাগাজিন পড়ার সুযোগও করে দিয়েছিলেন। ফটোগ্রাফির বিভিন্ন খুঁটিনাটি, অ্যাপারচার, এক্সপোজার, এমনকি ছবির কম্পোজিশন ইত্যাদি বিষয় এভাবেই শিখতে শুরু করেন সাইদা। একজন সত্যিকারের আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার পেছনে জায়েদী সাহেবের অবদান তিনি সবসময় স্বীকার করেন। তার ভাষ্যমতে, জায়েদী সাহেবই আমার ফটোগ্রাফির প্রথম শিক্ষক।

ছবি তোলার পাশাপাশি পড়াশোনার দিকেও দারুণ মনোযোগী ছিলেন তিনি। সে সময় মেয়েরা পড়াশোনাও এত বেশি করতো না। সাধারণত ইন্টারমিডিয়েট পাস করেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলত। সেখানে সাইদা খানম দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছিলেন।

১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স করার পর ১৯৭২ সালে লাইব্রেরি সায়েন্সে আরেকটি মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। তারপর ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সঙ্গে প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

১৯৫৬ সালেই ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি। সে বছরই জার্মানিতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন পুরস্কার পেয়ে যান। মানুষ তাকে ততদিনে চিনতে শুরু করেছে। ‘অবজারভার’, ‘ইত্তেফাক’সহ বেশকিছু দেশি পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হয়। দুটি জাপানি পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল তার ছবি। তারই সূত্র ধরে জাপান, ফ্রান্স, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তার ছবি দেখা যেতে থাকে।

১৯৬০ সালে ‘অল পাকিস্তান ফটো প্রতিযোগিতা’য় প্রথম হয়েছিল তার ছবি। সে সময় বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। পাকিস্তানের মতো একটি গোঁড়া দেশে একজন নারী আলোকচিত্রী প্রথম হয়ে গেছেন, ব্যাপারটা হেলাফেলা করার মতো ছিল না মোটেও।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অন্যান্য ফটোসাংবাদিকদের মতো তিনিও যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর একটি তুলেছিলেন ঢাকার আজিমপুরে। যুদ্ধ শুরুর আগে অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত একদল নারীযোদ্ধার ছবি তুলেছিলেন সাইদা খানম। ১৬ ডিসেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সেনাদের গোলাগুলির খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন ছবি তুলতে। শেষ পর্যন্ত গোলাগুলির প্রচণ্ডতা ডিঙিয়ে ছবি তোলা আর হয়নি। তবে উপস্থিত অনেকেই তার সাহস দেখে চমকে গিয়েছিলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন ছবি তোলা থেকে একটু দূরে ছিলেন। তারপর আবার হাতে তুলে নিয়েছেন ক্যামেরা। ১৯৭৩ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘অল ইন্ডিয়া ফটো জার্নালিজম কনফারেন্সে’ যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ এশিয়ান গেমসে বেগম পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্ণাঢ্য এবং বিশাল এক কর্মজীবন পার করেছেন সাইদা খানম। ক্যামেরার সঙ্গে তার প্রায় ৬৪ বছরের সংসার। বিয়েও করেননি। ৮২ বছর বয়সী এই মানুষটি এখনো ক্যামেরা নিয়েই দিন কাটান। নিজের তোলা মাদার তেরেসার ছবি নিয়ে তিনি একটি একক প্রদর্শনীও করেছিলেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে উপমহাদেশের বিখ্যাত প্রায় সব ব্যক্তিত্ব- ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানী, বেগম সুফিয়া কামাল, মৈত্রেয়ী দেবী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আশাপূর্ণা দেবী, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, সৌমেন্দ্র নাথ ঠাকুর, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়- সব নামকরা ব্যক্তির ছবি তুলেছেন। সেই সঙ্গে রানি এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা, মার্শাল টিটো, অড্রে হেপবার্ন, চন্দ্রবিজয়ী নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিনস, মাইকেল কলিন্সের মতো বিখ্যাত মানুষদের ছবিও তুলেছেন।

১৯৬২ সালে ‘চিত্রালী’ পত্রিকার হয়ে এক কাজে গিয়েছিলেন সাইদা খানম। এর আগেও নানা কাজে কলকাতায় যেতেন। একবার এই পত্রিকার থেকেই বলা হলো সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে কাজ করতে। সেই অনুসারে  সাইদা খানম গেলেন তার বাসায়। কথায় কথায় একফাঁকে তার ছবি তুলে ফেললেন। পরে সেই ছবির প্রশংসা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। পরে সত্যজিৎ রায়ের পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। সত্যজিতের স্ত্রীও তাকে বেশ স্নেহ করতেন। নানা সময় দুজনেই তাকে চিঠি লিখেছেন, আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বাসায়, ছবির শুটিংয়ে। ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’ এবং ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’- এই তিনটি ছবির শুটিংয়ে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন।

ক্যামেরা ছাড়াও কলম হাতে বেশকিছু কাজ করেছেন সাইদা খানম। এর মধ্যে ‘ধুলোমাটি’, ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’, ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’ উল্লেখযোগ্য।

সাইদা খানম বাংলা একাডেমি এবং ইউএনএবি’র আজীবন সদস্য। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এবং বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সঙ্গেও যুক্ত আছেন। একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন এই গুণী আলোকচিত্রী।

দেশের প্রথম এই আলোকচিত্রী অবসরে গান শোনেন। ঠুমরি-গজল আর রবীন্দ্রসংগীত তার খুব পছন্দ। এখনো ফিল্মের ক্যামেরাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ডিজিটাল ক্যামেরা তার কাছে মনে হয় ‘ফাঁকি দেওয়া’। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তখনকার দিনে আমরা খেয়াল করতাম কখন রোদ আসবে, কী এক্সপোজার দেব। এখন তো শুধু ক্যামেরা ধরে রাখলেই হয়।’

ক্যামেরার ক্লিকের পাশাপাশি লেখালেখি করতেন সব সময়। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ধুলোমাটি’, ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’, ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’, ‘আলোকচিত্রী সাইদা খানমের উপন্যাসত্রয়ী’।

সোনালীনিউজ/এমটিআই