রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

সাবেক মন্ত্রীদের রাজনীতি, কেউ সরব কেউ নীরব

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৫:৫৮ পিএম

সাবেক মন্ত্রীদের রাজনীতি,  কেউ সরব কেউ নীরব

ঢাকা : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গত দুই মেয়াদের সরকারে মন্ত্রী ছিলেন যারা, তাদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন কারণে নানাভাবে আলোচনা ও সমালোচনায় ছিলেন। সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভিসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর পর্দায় তাদের প্রায় টানা উপস্থিতি ছিল। এফএম রেডিওগুলো চালু করলে শোনা যেত তাদের কণ্ঠ। একইভাবে তারা থাকতেন পত্রিকার পাতায়। কেউ কেউ সংবাদমাধ্যমের প্রচারের বিষয়ে খুব আগ্রহীও ছিলেন।

মন্ত্রিসভায় থাকাকালে বিভিন্ন ইস্যুতে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে আলোচনা ও সমালোচনায় থাকলেও মন্ত্রিত্ব হারানোর পর তারা আর নেই টিভির পর্দা ও পত্রিকার পাতায়। অনেকেই এখন একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে। কেউ কেউ মন্ত্রিত্ব হারিয়ে ‘অভিমান থেকে নীরব-নিশ্চুপ’ হয়ে গেছেন। তারা পর্দার আড়ালে চলে গেছেন বলেও শুভানুধ্যায়ীদের অভিযোগ।

আবার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়া আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ সরব আছেন সরকার ও দলের ‘গঠনমূলক সমালোচনার’ মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে তারা কার্পণ্য করছেন না। রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় তাদের বক্তব্যের প্রতি অনেকেরই আগ্রহ বাড়ছে। বক্তব্য ও বিবৃতির মধ্য দিয়ে তাদের সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীদের। সামাজিক ইস্যুতে তারা দাঁড়াচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত ও জনগণের পাশে।

বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সরকার ও দলের বিরুদ্ধে যায়- এমন বক্তব্যও দিয়ে যাচ্ছেন সুযোগ বুঝে। এমনকি অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ উঠলে দলের নেতাকর্মীদের বিচারের দাবি জানাতেও পিছপা হচ্ছেন না। তাদের বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কারো কারো বক্তব্য প্রশংসিতও হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের মধ্য দিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি দলের প্রবীণ বেশ কয়েক নেতা ও সাবেক মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের। মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন ৩৬ জন। মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়ার ‘অভিমান’ থেকে কেউ কেউ দলীয় কার্যক্রমে আগের মতো সরব নন।

সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব পেয়েছেন একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই। তারা সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও কাউকে কাউকে আগের মতো দলীয় কার্যক্রমে মনোযোগী হতে দেখা যাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমের প্রচারেও নেই তারা।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হলেও কেউ কেউ নিজের এলাকার তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও আগের মতো যোগাযোগ রাখছেন না বলে অভিযোগ আছে। মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ বিষয়ে রাজনৈতিক মহল ও আওয়ামী লীগের মধ্যে জোর আলোচনা আছে। নতুন মুখ যোগ হওয়ার সময় ডাক পড়তে পারে- এমন আশায়ও দিন গুনছেন সাবেক মন্ত্রিসভার কোনো কোনো প্রভাবশালী সদস্য।

মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পেলেও নতুন সরকারের শুরুতে দলীয় কর্মকাণ্ড ও নানা অনুষ্ঠানে ব্যস্ত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু)  সাবেক ভিপি তোফায়েল আহমেদ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে গিয়ে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার সমালোচনা করেন। তার এ বক্তব্য সব মহলে প্রশংসিত হয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ে শিক্ষকরা রাজনীতি করতেন না। এ কারণে প্রতিটি ছাত্র তাদের শ্রদ্ধা করত। কিন্তু এখন শিক্ষকদের কেউ করেন বঙ্গবন্ধু পরিষদ, কেউ করেন জিয়া পরিষদ।’

আওয়ামী লীগের এ নেতা ওই অনুষ্ঠানে থাকা শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে যেসব শিক্ষক রয়েছেন, তারা সবাই একটি ভাবাপন্ন শিক্ষক, অন্য ভাবাপন্ন কেউ কিন্তু এখানে নেই।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও একইভাবে ব্যস্ত। ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির খুনিকে আশ্রয় দেওয়া আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকে ‘ক্রিমিনাল’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নুসরাতসহ সাম্প্রতিক সময়ে খুন হওয়া সব নারী ও শিশুর খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম।

তিনি বলেন, ‘কোনো ফাঁকফোকর রাখা যাবে না। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের জনগণ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। খুনিদের দ্রুত বিচার করুন। এতে জনগণ খুশি হবে। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরো বাড়বে।’ নাসিমের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্য নিয়েই ইতিবাচক আলোচনা চলে আসছে।

তবে সাবেক মন্ত্রীদের কেউ কেউ বক্তব্য দিয়ে আরো সমালোচনারও জন্ম দিচ্ছেন। ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় গত বছরের ২৯ জুলাই বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর স্বাভাবিক কারণেই ক্ষুব্ধ ও শোকাহত ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হেসেছিলেন সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। ঘটনার সাড়ে আট মাস পর শাজাহান খান তার সেই হাসির জন্য দোষ চাপালেন সাংবাদিকদের ওপর।

গত সোমবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ১৪ দল আয়োজিত এক বৈঠকে হাসির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, ‘৬৮ বছর পর মোংলা বন্দরে আমরা ক্রেন কিনেছিলাম। সেই চুক্তির বৈঠকে সাংবাদিকরা দুজন ছাত্র মারা যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেন। তখন আমি বলেছি, এর জন্য কোনো চালক যদি দায়ী প্রমাণিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। তখন সাংবাদিকদের একজন বলে ওঠেন, আপনার আশকারাতেই চালকরা এমন হয়েছে। ওই কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই আমি হেসে উঠি। আমি এমনিতেও একটু বেশি হাসি। তবে ওই দিনের হাসির জন্য সাংবাদিকরাই উসকানি দিয়েছিলেন।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র জানায়, বয়সে প্রবীণ, নিজের ও পরিবারের কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত ও দক্ষ হাতে মন্ত্রণালয় চালাতে না পারা- মোটাদাগে এই তিন কারণে মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য এবার বাদ পড়েন।

এছাড়া পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি থাকা ও অপেক্ষাকৃত নতুনদের দিয়ে মন্ত্রিসভা করে একটা ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টাও ছিল নতুন সরকারের। আওয়ামী লীগের টানা দুইবারের সরকারে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। বয়সের কারণে রাজনীতি থেকে দূরে আছেন তিনি। ফলে তিনিও নেই আগের মতো আলোচনায়। এখন লেখালেখি করে সময় কাটছে তার। বয়স বেশি হওয়ায় সাবেক ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী ইমাজউদ্দীন প্রামাণিককে এবারের মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। তারাও আছেন পর্দার আড়ালে। টানা দুই মেয়াদের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদেরও উপস্থিতি নেই গণমাধ্যমে। সরকার ও দলের অনুষ্ঠানেও তাকে তেমন দেখা যায় না।

সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া দলীয় কর্মকাণ্ডে মাঝেমধ্যে উপস্থিত থাকলেও তিনি নেই একাদশ সংসদেও। গত নির্বাচনের আগে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। তাই নিজেকে তিনি অনেকটা আড়াল করে রেখেছেন বলে মনে করেন তার অনুসারীরা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও আছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাকে দলীয় কর্মকাণ্ডে ও সরকারি অনুষ্ঠানেও তেমন দেখা যায় না। কোনো বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমের আলোচনাতেও তিনি নেই। সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ, বেসামরিক বিমানমন্ত্রী শাজাহান কামালও অনেকটা আড়ালে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই