রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

ওইসব নেতাকে বাছাইয়ে ভুল ছিল হাইকমান্ডের

সাবেক ৩০০ এমপিসহ মাঠে নেই মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতারা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২০, শনিবার ০৪:৪৫ পিএম

সাবেক ৩০০ এমপিসহ মাঠে নেই মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতারা

ঢাকা : তাদের নাম আছে দলের খাতায়, তবে তারা ঘরেও নেই, মাঠেও নেই। স্থানীয় নেতারাও দেখা পাচ্ছেন না, পাশে পাচ্ছেন না কেন্দ্রীয় নেতারাও। বিএনপির সাবেক ৩০০ এমপি এবং গত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পাওয়া ৩০০ এমপি প্রার্থী গেলেন কই?

এমন প্রশ্ন দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের। তৃণমূলের প্রশ্নের সঙ্গে একমত দলটির কেন্দ্রীয় নেতারাও।

ওইসব সাবেক এমপি ও গত নির্বাচনের প্রার্থীরা কেন্দ্রকে বোঝাচ্ছেন—তারা এলাকায় আছেন আর এলাকার নেতাকর্মীদের বোঝান পুলিশি হয়রানি এড়াতে বাইরে আছেন।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা বহাল তবিয়তে আছেন নিজ নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। কেউ কেউ মাসের পর মাস অবস্থান করছেন দেশের বাইরে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নেপথ্য নায়কের ভূমিকা পালন করছেন।

নির্বাচনে মনোনয়ন নেওয়ার সময় মনোনয়ন বোর্ডের কাছে কথা দিয়েছিলেন, ‘জয়-পরাজয় যা-ই হোক এলাকা ছাড়বেন না, এমপি না হলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকবেন সশরীরে, অব্যাহত রাখবেন মানসিক ও আর্থিক সহযোগিতা’।

কিন্তু কথা রাখেননি তারা। ক্ষোভ প্রকাশ করে দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, দলের ভেতর ত্যাগী নেতার সংকট দেখা দিয়েছে। সাবেক এমপি, মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ নেতারা এলাকা ছেড়ে ঢাকায়। যারা এলাকায় আছেন তারা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।

সাবেক এমপিরা বয়সের কারণে ঘরে ঢুকে গেলেও এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপ্রাপ্ত ওইসব নেতাকে বাছাইয়ের বেলায় হাইকমান্ডের ভুল ছিল।

এর মাশুল দিচ্ছেন দলপ্রধান, দিচ্ছে দলও। কেন্দ্র থেকে কর্মসূচি দিলে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ১০-১২ জেলাতেও পালিত হয় না। নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন তো দূরে থাক পোস্টার পর্যন্ত সাঁটানোর লোক মিলছে না। যেসব জেলায় কর্মসূচি হয় তা ফেসবুকের ওয়ালে ছবি পোস্টের জন্য ঝটিকাগতিতে পালন করা হয়।

ফলে সরকার এবং দলীয়প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন এখন স্রেফ বুলিতে পরিণত। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়ার দৃশ্যচিত্র একই। এ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন দলটির সর্বোচ্চ নেতারা।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে ৬৩ জেলায় সংসদীয় আসন ৩০০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগের ১৩টি জেলা থেকে ৭০ জন এমপি, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় ৫৮, ৮ জেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহীতে ৩৯, খুলনা বিভাগের ১০ জেলা থেকে ৩৬, রংপুর বিভাগের ৮ জেলা থেকে ৩৩, ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলায় ২৪, বরিশালের ৬ জেলায় ২১, সিলেটের ৪ জেলা থেকে ১৯ জন এমপি নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার পর বিএনপি চারবার রাষ্ট্রপরিচালনা করেছে। নির্বাচনে মনোননয়ন দিয়েছে, এমপিও হয়েছে—এ সংখ্যা হাজারের কোটায়। অনেকেই মারা গেছেন, নানা প্রতিকূল পরিবেশে দলবদলও করেছেন অনেকেই।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দলীয় প্রতীক ধানের শীষ পেতে ৫ হাজার টাকায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ৪ হাজার ৫৮০ জন। ২৫ হাজার টাকা জামানতসহ মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন ৪ হাজার ২শ জন। বাছাই এবং জোটের শরিকদের দাবি-দাওয়া পূরণ শেষে ২৫৪ জনের হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেওয়া হয়। তবে চরম ভরাডুবি হয়েছে নির্বাচনে। আসন উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৬টি।

জাতীয় সংসদের ১ নম্বর আসন পঞ্চগড়-১। এ আসনে সাবেক এমপি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। পিতা সাবেক এমপি আর তার ছেলে নওশাদ জামির মনোনয়ন পান ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের জন্য। পিতা-পুত্র দুজনেই বসবাস করেন ঢাকায়। উচ্চ আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত তারা। ফলে নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের কাছে তারা অমাবশ্যার চাঁদের মতো। দেশের ৩০০ আসন পার্বত্য-বান্দরবান। এখানে সাবেক এমপি সাচিং প্রু জেরি ছিলেন একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী। যিনি জেরি বাবু নামেও পরিচিত।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাভেদ জানান, বর্তমানে জেরি বাবুর বয়স ৭১ বছর, শরীরের ওজন ১শ কেজি। রাজপথে আন্দোলন করার মতো শারীরিক অবস্থা নেই তার। মাঝখানের জেলাগুলোর চিত্র কাছাকাছি। আন্দোলন কর্মসূচি চাঙা করার জন্য বিভাগীয় সমাবেশ করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। সময়ের ব্যবধানে গত ৬ মাস আগে। তাতে অনেক সাবেক এমপির দেখা মেলেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এ প্রতিবেদককে জানান, সাবেক অনেক এমপি নিজ থানা বা উপজেলা ছেড়ে বসবাস করছেন জেলা সদরে। অনেকেই আবার ঢাকায় বসবাস করছেন। কিন্তু তারা স্থানীয় নেতাকর্মীদের দেখা দিচ্ছেন না, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন না।

খোঁজ করে বের করা হলে তারা বলেন, সরকারের নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য কৌশল অবলম্বন করছেন।

রংপুর বিভাগের আওতায় দিনাজপুর জেলা। ওই জেলার বিএনপি নেতা কায়সার পারভেজ মিলন এ প্রতিবেদককে জানান, দিনাজপুরের ৬টি আসনেই বিএনপির কোনো কর্মসূচি পালিত হয় না রাজপথে। কট্টরপন্থি নেতাকর্মীরা দু’একটি কর্মসূচি পালন করেন চার দেয়ালের ভেতরেই। গত দুই বছরে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো ধরনের পোস্টার নজরে পড়েনি বলে জানান তিনি।

বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম এ প্রতিবেদককে বলেন, তার বিভাগে দলের কেন্দ্রীয় নেতার সংখ্যা বেশি। সাবেক এমপিদের বেশিরভাগই সক্রিয়। তবে মাঠের চিত্রে গরমিল আছে।

রাজশাহী বিভাগে বিএনপির সাবেক এমপির সংখ্যা বেশি। তবে কার্যক্রম আশানুরূপ নয়। দলের কর্মীরা এলাকা ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকাসহ অন্য বিভাগগুলোতে।

এ বিভাগের দায়িত্বে থাকা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নাটোরের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বাংলাদেশের খবরকে বলেন, সরকারের জুলুম, নির্যাতনের ভেতরেই দলের নেতাকর্মীরা ১৩ বছর বেঁচে আছেন, তাতেই অনেক কিছু। দলের সাবেক এমপিদের অনেকের বয়স আশির কোটায়। তারা এই সময়ে কী ভূমিকা রাখতে পারবেন? তবে তরুণরা সক্রিয় আছে। সংখ্যায় কম হলেও ধীরে ধীরে বাড়বে বলে আশা করেন সাবেক এই এমপি।

গত একযুগে সিলেট বিভাগের নেতাকর্মীদের অনেকেই শুধু সিলেট নয়, দেশত্যাগ করেছেন। রাজনীতি ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় যোগদান করেছেন। রাজনীতি ছাড়ার নেপথ্যে প্রধান কারণ অভিভাবকহীনতা, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া এবং গুম-খুন হামলা-মামলাভীতি।
সিলেট-৩ আসনে বিএনপির সাবেক এমপি শফি আহমেদ চৌধুরী বসবাস করেন ঢাকায়।

মৌলভীবাজারের নাসের রহমান ঢাকা-মৌলভীবাজারে যাতায়াত করেন।

দলীয় নেতাদের দাবি, এই বিভাগে বিএনপির পোস্টার থাকে ঘণ্টা খানেক। আর কর্মীরা জানিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে পাঠানো পোস্টার নষ্ট হয় দলীয় কার্যালয়ে কিংবা নেতাদের বাণিজ্যিক কার্যালয়ে।

সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন এ প্রতিবেদককে বলেন, তার বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে সাবেক এমপি ও এমপি প্রার্থীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। কেন্দ্র থেকে তাদের দায়িত্ব দেওয়া আছে, তারা স্থানীয় কর্মীদের খোঁজ রাখবেন।

কিছু কিছু এমপি এলাকায় থাকেন, কিছু বিদেশে যাতায়াত করেন। এলাকার কর্মীদের চাহিদার শেষ নেই। তবে খবর রাখেন বলে দাবি এই নেতার।

বরিশালের সাবেক এমপি-মন্ত্রীরা বেশিরভাগই অবস্থান করেন ঢাকায়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়াদের বেশিরভাগ এলাকায় থাকলেও হয়রানির ঝুঁকি নিতে চান না। নির্বাচনের পর থেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন শরফুদ্দীন সান্টু।

এলাকায় যাননি ঢাকায় বসবাসকারী ভোলার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন, নাজিম উদ্দিন আলম। কর্মসূচিতে যান না খন্দকার মাহবুব উদ্দিন, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরসহ অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে বরিশালের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন এ প্রতিবেদককে বলেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বরিশালের। তারা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। কর্মসূচির দিন এলাকায় আসা হয় না। সাবেক এমপি এবং গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়াদের অনেকেই এলাকার নেতাকর্মীদের খবর রাখেন না বলে স্পষ্টতই জানান শিরিন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই