বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬

স্বামীর জন্য অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন রোহিঙ্গা নারীরা

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২০ মে ২০১৯, সোমবার ০২:২৪ পিএম

স্বামীর জন্য অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন রোহিঙ্গা নারীরা

ঢাকা: মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবকদের সাথে কক্সবাজারের ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নারীদের টেলিফোনে বিয়ে হচ্ছে। আর এসব নারী এখন সমুদ্র পথে কিংবা অন্য কোনভাবে তাদের স্বামীদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করছেন।

গত কয়েকমাসে মালয়েশিয়া পাচারের সময় আইন-শৃংখলা বাহিনী কর্তৃক উদ্ধার হওয়া কয়েক’শ রোহিঙ্গার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই হচ্ছে তরুণী। তাদের সাথে কথা বলে আইন-শৃংখলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের এই ধরনের প্রবণতার কারণে সম্প্রতি সমুদ্র পথে মানব পাচারের মতো ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত সপ্তাহে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে যে ২৯ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে পাচারের সময় উদ্ধার করা হয়। তাদের একজন ২০ বছরের তরুণী বালুখালি ক্যাম্পের বাসিন্দা।

ওই তরুণী জানান, কয়েকদিন আগে পরিবারের সম্মতিতে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এক রোহিঙ্গা যুবকের সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামীর কাছে পৌঁছার জন্য তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

‘যেহেতু আমার স্বামী বাংলাদেশে আসতে পারবে না, সেহেতু আমাকে তার কাছে যেতে হবে। এখানে এসেও কোনও লাভ হবে না। সেখানে সে ভালো আছে, আয় রোজগার করতে পারছে, তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তার কাছে আমাকে যেতে হবে,’ বলেন এই তরুণী।

গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আইন-শৃংখলা বাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থা সমুদ্র ও আকাশ পথে পাচারের সময় প্রায় দুইশ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে। এরমধ্যে বেশির ভাগ উদ্ধার হয়েছে উ্রপকূলীয় এলাকায়। এদের গন্তব্য ছিলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া। যেখানে ২০১২ সালের পর থেকে অনেক রোহিঙ্গা তরুণ পাড়ি জমিয়েছিলো। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তারা মালয়েশিয়ায় আটকা পড়েছে। স্বগোত্রীয় তরুণীর সংকট থাকায় তারা সেখানে বিয়েও করতে পারছিলো না। এমন পরিস্থিতিতে টেলিফোনে এবং অন্যান্য মাধ্যমে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত তরুণীদের তারা বিয়ে করছে, অথবা বিয়ে করার জন্য মালয়েশিয়া নিয়ে যাচ্ছে।

নিজদেশে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় রোহিঙ্গা তরুণী ও তাদের অভিভাবকরাও এভাবে বিয়ের মাধ্যমে মালয়োশিয়া পাড়ি জমানোকে তুলনামূলক ভালো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

কক্সবাজারের ক্যাম্পে মানব পাচার প্রতিরোধ কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত আন্তর্জাতিক অভিবাসি সংস্থা আইওএম এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইপসা’র কেইস ম্যানেজমেন্ট কো-অডিনেটর ওমর সাদেক বলেন, এক সময় রোহিঙ্গা তরুণরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করতো, এখন রোহিঙ্গা তরুণীরাও এই পথে পা বাড়িয়েছে।

‘এখন যেসব তরুণী যাচ্ছে অথবা যাওয়ার চেষ্টা করছে তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো সেখানে গিয়ে বিয়ে করা। অনেকে আছে আগেই বিয়ে করে তারপরে স্বামীর সাথে একত্রে বসবাসের জন্য মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়াও অনেকে পরিবারের সদস্য ভাই-বাবা এমন নিকট জনের কাছে পৌঁছানোর জন্য মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ভাবছে,’ উল্লেখ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে বেশকিছু তরুণীসহ প্রচুর রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া পৌঁছে গেছে। এখনও  নিয়মিত রোহিঙ্গারা সেখানে যাচ্ছে। এরমধ্যে অল্প কিছু সংখ্যক বাংলাদেশসহ ভারত, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে। সমুদ্র্ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পাশাপাশি, ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে সড়ক পথেও অনেকে মালয়েশিয়া যাচ্ছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় সংগঠন ইন্টার সেক্টর কো-অডিনেশন গ্রুপ আইএসসিজি’র মুখপাত্র ও আইওএম এর সাবেক কর্মকর্তা সৈকত বিশ্বাস বলেন, এখন যে ধরনের ঘটনা ঘটছে তার মধ্যে অর্ধেকই হচ্ছে স্বেচ্ছায় তারা যাওয়ার চেষ্টা করছে পরিবারের সদস্যদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। অপর অর্ধেককে দালাল ও পাচারকারীরা ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রোহিঙ্গারা যেকোনভাবে ক্যাম্প থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার উপায় খুঁজছে বলেও জানান তিনি।

সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের পাচারের চেষ্টার অভিযোগে বেশ কয়েকজন দালাল ও পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের অনত্র চলে যাওয়ার আগ্রহকে পুঁজি করে এসব দালালরা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

ইপসা কর্মকর্তা ওমর সাদেক বলেন, দালালরা রোহিঙ্গাদেরকে মালয়েশিয়ার নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে যায়। কিন্তু টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পর দালালরা এসব রোহিঙ্গাকে দেশের কোনও একটি এলাকায় রেখে পালিয়ে যায়।

আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া দালালরা জানিয়েছে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে রোহিঙ্গাদেরকে ক্যাম্প থেকে বের করে গভীর  সমুদ্রে অপেক্ষামান বড় বোটে তুলে দেয়া, সেখান থেকে অন্য দালালরা তাদের মালয়েশিয়া পৌঁছে দিচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এসব রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সেই জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। সূত্র-জুমবাংলানিউজ।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন