শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

স্বাস্থ্যসেবার সিস্টেম পরিবর্তন করলেই পাওয়া যাবে এ বাজেটের সুফল

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ জুন ২০২০, বৃহস্পতিবার ১০:৪৬ এএম

স্বাস্থ্যসেবার সিস্টেম পরিবর্তন করলেই পাওয়া যাবে এ বাজেটের সুফল

নোয়াখালী জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহবায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন বাবর

বৈশ্বিক করোনা মহামারির ভিতরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার স্বাস্থ্য খাতে বাজেট দিয়েছেন। যা বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বা ১৩.৬ শতাংশ বেশি৷ এর একটি বড় অংশই ব্যয় হবে পরিচালনার ক্ষেত্রে। জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় ১৬১১ টাকা মাথা পিছু বাজেট এসেছে স্বাস্থ্য খাতে। ‘নিরাপদ চিকিৎসা চাই’ এই স্লোগানে সুন্দর এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মডেল উপস্থাপন করেছেন নোয়াখালী জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহবায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন বাবর।

তার গুরুত্বপূর্ণ সেই মতামত সোনালীনিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের এ মহামারীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে অব্যবস্থাপনায় জনগণের ভোগান্তি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে আমরা আম জনতা হিসেবে যে উপলব্ধি করছি। জীবিকার সন্ধানে ফিনল্যান্ড, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবার করার সময় স্বাস্থ্য সেবা নিয়েছি। আমাদের দেশের সাথে উন্নত বিশ্বের সাথে তফাৎটা কোথায় আমাদের সিস্টেমটাকে পরিবর্তন করতে হবে। কি হচ্ছে, কেমন আছি এটা নিয়ে একজন আরেকজনের সমালোচনা করে বেড়ালে চলবে না। এসব অব্যবস্থাপনার সিস্টেমগুলো ভেঙে নিয়মতান্ত্রিক একটা পদ্ধতিতে চলতে হবে দেশ। এটা ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাবো এখন থেকে চিন্তাভাবন করে আমাদের উন্নত বিশ্বের ফরমেটে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাটা আনতে হবে। এ জন্য আমি কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে বলবো কি কি জিনিস করলে আমাদের এই দেশে সবার জন্য স্বাস্থ্য ও নিরাপদ চিকিৎসা পাবে জনগণ। 

এজন্য শুরুতে হেল্থ কার্ড করতে হবে। যে কার্ডে  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেন্টাল সার্ভারে সবকিছু লেখা থাকবে। অর্থাৎ এই ব্যক্তি কে, তার জীবনে কতগুলো রোগ হয়েছে, কতগুলো অপারেশন হয়েছে এবং তার রক্তের গ্রুপ কি, তাঁর শারীরিকপূর্ণ বিবরণ সেখানে দেয়া থাকবে। 

প্রত্যেক নাগরিককে হেল্থ ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই হেল্থ ইন্স্যুরেন্স তিন ক্যাটারির হতে পারে যেমন- অতি দরিদ্র : সে বিনামূল্যে হেল্থ ইন্স্যুরেন্স পাবে। তার হেল্থ ইন্স্যুরেন্স  সরকার বহন করবে। মধ্যবিত্ত : মধ্যবিত্ত তাঁর আয় অনুযায়ী, হতে পারে তা মাসে ৫০ টাকা। উচ্চবিত্ত: উচ্চবিত্তের জন্য ৫ হাজার থেকে হতে পারে ১ লাখ হতে পারে। তবে উচ্চবিত্তদের হেল্থ ইন্স্যুরেন্স কয়েক ক্যাটাগরিতে হতে পারে। যেমন কেউ ৫ হাজার টাকা মাসে দিলে ১ লাখ টাকার নিচে হেল্থ ইন্স্যুরেন্স কাভার করবে। যদি ৫ লাখ টাকার উপর হয় বা ১ লাখ টাকার বেশি হয় তখন হেল্থ ইন্স্যুরেন্স মাত্রা বাড়বে। এটা যারা স্পেশালিস্ট তারা চিন্তা ভাবনা করে বের করতে পারবেন। মোটের উপর প্রত্যেক নাগরিক এই হেল্থ ইন্স্যুরেন্সের আওতাভুক্ত হয়ে যাবেন। তাহলে সরকারের এক্ষেত্রে আর ভর্তুকি দিতে হবে না।
      
আমরা বাংলাদেশে সরকারি চাকরি যারা করি বা যারা দেই তারা কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিজে বুঝি না পুরোপুরি। এবং যারা দেন তারা হয়তো বুঝেই দেন না। তার একমাত্র উদাহরণ আমি একজন নাগরিক হিসেবে এখনও আমি জানি না আমার সরকারিভাবে আমার ফ্যামিলি ডাক্তার কে?  

বিষয়টি আরেকটু সুন্দরভাবে একটি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পরিস্কার করছি। যেমন সুইজারল্যান্ডে ২৫০ জন নাগরিকের জন্য ১ জন ফ্যামিলি ডাক্তার থাকেন। তার কোনো সমস্যা হলে তিনি টেলিফোনে যোগাযোগ করেই চিকিৎসা নিতে পারেন। ফিনল্যান্ডে এই সংখ্যা ১৮৪ জনের ১ জন একজন চিকিৎসক। ইতালিতে ২৬০ জনের জন্য ১ জন চিকিৎসক। আমাদের দেশে সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালের ৪৩ হাজার ৫৩৭ জন চিকিৎসক ছিলেন। এরপরও অনেক চিকিৎসক নিয়োগ হয়েছেন। ধরে নিলাম বাংলাদেশে সরকারি নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসক ৫০ হাজার। যদি এই সংখ্যা হয় তাহলে ১৮ কোটি মানুষের জন্য ৩৬০০ চিকিৎসক ১ জন চিকিৎসক। 

সংখ্যাটা অনেক বেশি। তারপরও আমাদের সরকারি ডাক্তারদের নিয়োগ দিয়ে কতজনের জন্য একজন ডাক্তার তা নিশ্চিত করতে হবে। এই ৩৬০০ জনগণের চিকিৎসার দায়িত্ব একজন চিকিৎসককে নিতে হবে এবং তিনি যেটা পারবেন না সেটা সরকারি হাসপাতালে পাঠাবেন। এধরণের প্রত্যেক নগরিকের জন্য একজন নির্দিষ্ট চিকিৎসক নির্ধারন করতে হবে। আর ওই চিকিৎসক যদি পোস্টিং যান এবং তার পোস্টে যিনি আসবেন তিনি ওই এরিয়ার লোকদের ডাটাবেজ কিংবা টেলিফোন নাম্বারগুলো সংরক্ষণ করবেন। যাতে ওই নাগরিকরা জানতে পারেন তার কোনো সমস্যা হলে তিনি নির্দিষ্ট চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন।  

জরুরী বিভাগগুলো সরকারি যেকোনো হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালে যেমন অ্যাক্সিডেন্ট, স্টোক, হঠাৎ করে মানুষ অসুস্থ হয়ে যাওয়া। জরুরী চিকিৎসায় কোনো অবস্থায় পয়সা এবং তার পরিচয়পত্র জানার জন্য বসে থাকতে পারবে না। জরুরী চিকিৎসায় একটা রোগী যেকোনো হাসপাতালে যাওয়া সাথে সাথেই শুরু করতে হবে। হ্যাঁ, প্রয়োজনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় থানায় বিষয়টি জানিয়ে রাখতে পারেন। যে এই ধরনের একটি রোগীর আমরা চিকিৎসা করছি। যদি রোগী ওই চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে না পারেন সে ক্ষেত্রে সরকার এটার ব্যবস্থা করবে। এক্ষেত্রে জরুরী চিকিৎসা না পেয়ে কোনো নাগরিক মারা যাবে না বা মেজর কোনো ক্ষতি সম্মুখিন হবেন না।  

আমাদের দেশে ফার্মেসীগুলোতে ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে। আপনারা একটু ভালো ভাবে খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন অনেক ফার্মেসি আছে যেখানে আলমিরাতে ওষুধ রাখা হয় সেখানে সরাসরি সূর্যের আলো গিয়ে পড়ে। ওষুধ সংরক্ষণ করতে হয় তার ক্লাসিফিকেশন অনুযায়ী নির্দিষ্টি তাপমাত্রায়। আমাদের এদেশে যেহেতু গরমে তাপমাত্রা একটু বেশি, এসি কিংবা ফ্রিজে টেম্পারেচার নিয়ন্ত্রণ না করে ওষুধ সংরক্ষণ করলে ওই ওষুধ নির্দিষ্ট রোগের জন্য কর্মক্ষমতা হারায়। এই জিনিসগুলো আমাদের দেশে মানা হয়না কারণে ব্যাঙের ছাতার মতো ওষুধের কোম্পানি বের হয়। ব্যাঙের ছাতার মতো অনেকে যত্রতত্র ফার্মেসি খুলে বসে। ওষুধ কিনে খাচ্ছেন কিন্তু রোগ ভালো হচ্ছে না। তাই ওষুধ ব্যবস্থাপনার সংরক্ষণ, বিপণন ও উৎপাদন শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বছরখানে আগে এক চিকিৎসক বন্ধুকে ফোন করলাম, বন্ধু কই, ও বললো ঘুমাচ্ছি ‘তখন ছিল তার ডিউটির টাইম’। জিজ্ঞেস করলাম কেন ঘুমাচ্ছো? বললো, রাতে প্রাইভেট হাসপাতালে নাইট ডিউটি আছে। সরকারি ডাক্তারগুলো, সবাইকে বলছি না, কিছু কিছু চিকিৎসক আছেন যারা সরকারি কাজ ঠিক মত করেন না। কিন্তু মাসে মাসে বেতন নিচ্ছেন। এধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। পক্ষান্তরে, উনাদের আন্ডারেই প্রাইভেট হাসপতালগুলো দিন দিন বড় হচ্ছে। যার সিজারের দরকার নেই তাকেও সিজার করছে। এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার জন্য প্রাইভেট হাসপাতাল লিমিটেড কোম্পানিগুলো অনেকাংশেই দায়ী। তাই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা এসব হাসপাতালকে কঠোর মনিটরিংয়ে রাখতে হবে। যদি উন্নত চিকিৎসা আসলেই দেয়, স্পেশালাইজড হাসপাতাল হয় তাদের রাখতে হবে। যারা জনগণের পাশে মহামারির সময় চিকিৎসা দিচ্ছেন একজন মানবিক কর্মী হিসেবে তাদের রাখবেন। আর যারা কসাইখানা মত ক্লিনিক খুলে বসেছেন, চিকিৎসা দেয়ার কিছুই নেই, শুধু জনগণের পকেট কাটার জন্য তাদের দ্রুত বন্ধ করতে হবে। 

এই বৈশ্বিক করোনা মহামারির ভিতরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ হাজার কোটি টাকার কিছু ওপর স্বাস্থ্য খাতে বাজেট দিয়েছেন। এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। এরই সাথে জনগণকে বলতে চাই  ১৬১১ টাকা আমাদের মত দেশে মাথা পিছু সরকারি বাজেট এসেছে স্বাস্থ্য খাতে। যদি সঠিক ব্যবস্থাপনা হয় তাহলে এই বাজেট দিয়েই দেশের প্রত্যেকটি জনগণ সরকারি স্বাস্থ্য সেবা পাবে। যেভাবে এখানে আলোকপাত করেছি যদি এভাবে ব্যবস্থাপনা শুরু করা হয় প্লেনিং এবং টেন্ডার বাণিজ্য, সাপ্লাই বাণিজ্য করা করেছে কারা এর সাথে জড়িত স্বাস্থ্য খাতটাকে পুরো মনিটরিং করে  যারা আছেন ভালো হয়ে যান। জনগণের টেক্সের টাকা আপনার টাকা না। সরকারি হাজার চেষ্টা করছে, আমি, আপনি, আমরা সবাই মিলেই সরকার। আমরা যদি এই খাতের সবাই সৎভাবে কাজ না করি তাহলে এই দেশে সিস্টেম আসবে না। প্রত্যেকটা জিনিসের স্বচ্ছতা থাকতে হয়, একটা বিল্ডিং কত টাকায় বানাবেন কি রেট, একটা এক্স-রে মেশিন কোথায় কিনছেন এসব বিষয় মিডিয়ার সমানে ওপেন এবং ওপেন টেন্ডার ছাড়া কোনো জিনিস কেনা যাবে না। স্বচ্ছাতা থাকলে সেখানে দুর্নীতি হয় না। কিন্তু স্বচ্ছতা করতে হবে আইন করে। যেন বাংলাদেশের প্রত্যেকটা টিভির নিউজে যায় কোথায় কি করা হচ্ছে। তাই কাদা ছোড়াছুড়ি না করে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। 

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
নোয়াখালী জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহবায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন  
বাবর


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।