সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬

স্বাস্থ্য পুষ্টি প্রকল্পে ভুলের মাশুল

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৮ মে ২০১৯, বুধবার ০৪:০২ পিএম

স্বাস্থ্য পুষ্টি প্রকল্পে ভুলের মাশুল

ঢাকা : সাত জেলায় দরিদ্র অন্তঃসত্ত্বা নারীদের গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ২৪ মাস পর্যন্ত বয়সী শিশুদের মাসে একবার ও ৫ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুদের তিন মাসে একবার বৃদ্ধি পরীক্ষা ও নগদ সহায়তা বিতরণে ২০১৫ সালে নেওয়া হয়েছিল ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওরেস্ট (আইএসপিপি) শীর্ষক কর্মসূচি।

আগামী বছরের জুনে শেষ হতে যাওয়া প্রকল্পে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দের বিপরীতে চার বছরে ছাড় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলার। চার শতাংশের কম অর্থ ব্যয় করে এ পর্যন্ত ৮৮ হাজার ৪২৫ জনকে প্রকল্পের আওতায় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদে ৬ লাখ নারীকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য পূরণ সংশয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটির আওতায় বিপুল পরিমাণের বিদেশি সহায়তা ফেরত যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অবশ্য মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ ছাড় করাতে চাইছে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সরকার বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে বিশ্বব্যাংক। অর্থ ছাড়ের বিভিন্ন শর্ত (ডিএলআই) মূল্যায়নের লক্ষ্যে এ পর্যালোচনার ফলাফলে প্রকল্পের বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে হতাশাজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদে ৬ লাখ দরিদ্র মানুষকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও মাত্র ৮৮ হাজার ৪২৫ নারীকে সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কর্মসূচির আওতায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে চার ইউনিয়নে ৪ হাজার সুবিধাভোগী চিহ্নিত করে তাদের সেবা দেওয়া হয়েছে। এক বছর পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের পর এর আওতা বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদকালে ২৫০ ইউনিয়নে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার সুবিধাভোগীকে সেবা দেওয়া যাবে বলে আশা করছে বিশ্বব্যাংক।

দারিদ্র্য নিরসন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে নেওয়া প্রকল্পটি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা রয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নারী, শিশু ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগে ন্যস্ত করা ঠিক হয়নি। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি উপস্থাপনের সময় এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। আপত্তি জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকেই।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাঁধে সুবিধাভোগী নির্বাচনে ব্যর্থতার দায়ভার চাপিয়ে দিতে চাইছেন প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা। তারা জানিয়েছেন, অর্থ ব্যয়ের বিবেচনায় দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারে প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।

আর ইউনিয়ন পর্যায়ে দরিদ্র পরিবারের তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরোর ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেজ (এনএইচডি) নামক প্রকল্প থেকে সরবরাহ করার কথা ছিল। ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে এনএইচডি প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। বিবিএস তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পিছিয়ে গেছে সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্পটিও।

ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওরেস্ট প্রকল্পে দুই বছরের বেশি সময় ধরে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে দরিদ্র পরিবারের তথ্য না আসায় সুবিধাভোগী নির্বাচন করা যায়নি। সংস্থাটির কাছে বর্তমানে থানাপর্যায়ে দারিদ্র্যের তথ্য রয়েছে। ইউনিয়ন বা পারিবারিক পর্যায়ে দারিদ্র্যের কোনো তথ্য নেই।

২০১৩ সালে নেওয়া এনএইচডি প্রকল্প থেকে তথ্য আসার কথা ছিল। বিবিএস থেকে তথ্য না আসায় বিশ্বব্যাংকের সম্মতিতে সনাতন পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমানে প্রকল্পে গতি এসেছে। ব্যয় ঠিক রেখে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে বিবিএস মহাপরিচালক ড. কৃষ্ণা গায়েন বলেন, এনএইচডি প্রকল্পের আওতায় সারা দেশের দরিদ্র মানুষের তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা হচ্ছে। কাজের পরিধির তুলনায় প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় কম ছিল। তিন পর্যায়ে প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হয়েছে। সংগ্রহ করা তথ্যের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আগামী অর্থবছর থেকে এ তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দরিদ্রতম সাত জেলার ৪২ উপজেলার ৪৪৩টি ইউনিয়নে ছয় লাখ দুস্থ মহিলা বাছাই করে তাদের দারিদ্র্য নিরসনের পাশাপাশি সন্তানদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করতে আইএসপিপি প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। এতে ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বিশ্বব্যাংক।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশের বেশি। এসব জেলায় অপুষ্টির হারও অন্য এলাকার চেয়ে বেশি। তাই এ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে এসব জেলাকে বাছাই করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের গর্ভকালীন মোট চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর কথা রয়েছে। প্রতিবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় ২০০ টাকা করে দেওয়া হবে। সন্তান জন্মের প্রথম ২৪ মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে একবার শিশুর শরীর বৃদ্ধির পরীক্ষা করে নগদ ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। শিশুর বয়স ২৫ থেকে ৬০ মাস পর্যন্ত তিন মাসে একবার শিশুর শরীর বৃদ্ধির পরীক্ষা করে মাকে নগদ এক হাজার টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই