বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার ১১:৫৬ এএম

হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ঢাকা : হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ও মৌলিক ইবাদত। সচ্ছল মুসলিম নর-নারীর ওপর হজ পালন করা ফরজ। জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট তারিখে পবিত্র বায়তুল্লাহ বা কাবাঘর প্রদক্ষিণ, আরাফাত ময়দানের মহাসম্মিলনে যোগদানসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালনের মাধ্যমে হজ আদায় করতে হয়।

এই নশ্বর দুনিয়ার অবিনশ্বর মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কালোত্তীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, তা মক্কা যা বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত ও বরকতময়। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, মাকামে ইব্রাহিম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, নিরাপদ হয়ে যাবে সে। সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। আর যে কুফরি করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৃষ্টিজীব থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সুরা আল ইমরান : আয়াত-৯৬, ৯৭)

বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহতায়ালা কত চমৎকার করে হজের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। এরও প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির জনক হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে লোকদের মাঝে হজের ঘোষণা দেওয়ার জন্য আল্লাহতায়ালা নির্দেশ প্রদান করেন। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর মানুষের মাঝে হজের জন্য ঘোষণা প্রচার করো। তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তোমার কাছে আসবে।’ (সুরা হজ : ২৭)

আখেরি নবীর (সা.) পবিত্র জবান মোবারকেও হজের অসাধারণ গুরুত্বের বিষয়টি স্থান পেয়েছে। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত : তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর স্থাপিত আর সেগুলো হচ্ছে— ১. এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু নেই। আর হজরত মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসুল; ২. সালাত প্রতিষ্ঠা করা; ৩. জাকাত প্রদান করা; ৪. হজ করা; ৫. রমজান মাসে রোজা রাখা।’ (মিশকাত শরিফ)

উল্লেখিত হাদিসে হজকে ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া আল্লাহর প্রিয়তম হাবিব তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে, সুতরাং তোমরা সবাই হজ আদায় করো।’ (মিশকাত শরিফ)

হজ পালনকারীকে হজের সময় যথাযথ নির্দেশিত নিয়ম মেনে চলতে হয়। হজ পালনের সময় একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকতে হয়। একদিকে একনিষ্ঠ ইবাদত-বন্দেগি; অন্যদিকে নিরহংকার, অনাড়ম্বর ও নির্মোহ জীবনযাপনের মাধ্যমে হজ পালনকারীদের আত্মা ষড়রিপুর কুপ্রভাব থেকে কলুষমুক্ত ও বিশুদ্ধ হয়। হজের মাধ্যমে যেমন আত্মার উন্নতি সাধিত হয়, তেমনি গুনাহও দূরীভূত হয়। হাদিসে আছে, ‘পানি যেমন ময়লা-আবর্জনা দূর করে, তেমনি হজও গুনাহ দূর করে।’ সঠিকভাবে ও ইখলাসের সঙ্গে হজ আদায়কারী নিষ্পাপ শিশুর মতো হয়ে যায়। যেমন, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং হজ সম্পাদনকালে কোনো প্রকার অশ্লীল কথা ও কাজ কিংবা গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়নি, সে সদ্যোজাত নিষ্পাপ শিশুর মতো প্রত্যাবর্তন করল। (বুখারি ও মুসলিম) অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, হজে মাবরুর বা কবুল হজের বিনিময় হলো (আল্লাহর) জান্নাত।’ (মিশকাত শরিফ)

হজে গমনকারী ব্যক্তির কতই না খোশ নসিব যে, সে আল্লাহর যাত্রীদলের অন্তর্ভুক্ত। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘তিন শ্রেণির লোক আল্লাহর যাত্রীদল, (তারা হলো) যোদ্ধা, হাজি ও ওমরাহকারী।’ (মিশকাত শরিফ) হজের অনন্য মর্যাদার কারণেই প্রিয় নবী (সা.) হজ সম্পন্নকারীর কাছে দোয়া চাওয়ার জন্য আদেশ করেছেন। যেমন, হাদিস শরিফে এসেছে, বিশ্বনবী (সা.) বলেন, যখন তুমি কোনো হাজির সাক্ষাৎ পাবে, তখন তাকে সালাম করবে, মুসাফাহা করবে এবং তিনি তার গৃহে প্রবেশ করার আগে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ করবে। কেননা হাজি হলেন ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। (মিশকাত শরিফ) তাই মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজের ইচ্ছা করেছেন, তিনি যেন তাড়াতাড়ি করেন। (মিশকাত-২০১৫)

হজ যে শুধু ইবাদত তা কিন্তু নয়; বরং বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য খুবই ব্যাপক। হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ পবিত্র মক্কা নগরীতে একত্রিত হয়। ভাষা-বর্ণের ভিন্নতা, সাংস্কৃতিক-জাতীয় পরিচয়ের পার্থক্য ও ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বিশ্বমুসলিমের ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত এবং সুসংহত হয় পবিত্র হজ উদযাপনে। বিশ্বমুসলিমের পারস্পরিক দুঃখ-অভাব, অভিযোগ-সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া ও তার সমাধানের সুযোগ হয় পবিত্র হজের বিশ্বসম্মিলনে।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সংহতিতেও হজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আরাফাত ময়দানে অবস্থান হজের অন্যতম জরুরি কাজ। এর প্রধান উদ্দেশ্য সমবেত বিশ্বমুসলিমের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের দিকনির্দেশনা প্রদান। মহানবী (সা.)-এর হজ থেকে এ শিক্ষাই পাওয়া যায়। তিনি বিদায় হজের সময় আরাফাত ময়দানে উপস্থিত মুসলিমদের উদ্দেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের দিকনির্দেশনা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন।

হজের প্রতিটি বিধানেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব ঐতিহ্য। কাবাঘর প্রদক্ষিণ ও পশু কোরবানির মাধ্যমে হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইলের আদর্শ-ত্যাগের প্রতি প্রকাশ করা হয় গভীর শ্রদ্ধা। জামারায় পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িত আছে শয়তানের প্রতি বালক ইসমাইলের অবজ্ঞার নিদর্শন। আবার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানোর মধ্যে নিহিত আছে শিশুপুত্র হজরত ইসমাইলের প্রতি বিবি সারার ব্যাকুলতার ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে হজ একটি ঐতিহ্যবাহী অনন্য ফরজ ইবাদত ও বিশ্বমুসলিম সম্মিলন। হজের মাধ্যমে বিশ্বমুসলিমের আধ্যাত্মিক-নৈতিক উন্নতি, সামাজিক-রাজনৈতিক সংহতি, অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি এবং আধুনিক বিশ্বব্যবসায় ইসলাম-মুসলিমের অবস্থান সুসংহত ও সুদৃঢ় হবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue