বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬

বয়স্ক ও বিধবা ভাতা

হতদরিদ্ররা বাদ, তালিকায় কোটিপতিদের নাম

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সোমবার ০৪:২১ পিএম

হতদরিদ্ররা বাদ, তালিকায় কোটিপতিদের নাম

ছবি : সোনালীনিউজ

ঝিনাইদহ : জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ১নং সুন্দরপুর-দূর্গাপুর ইউনিয়নে ভাতা ভোগীদের তালিকা প্রণয়নে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তালিকা প্রণয়নে পরিপত্র বিধি মোতাবেক না হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক প্রণীত তালিকা অনুমোদন না দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেছেন ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি শ্রী নিখিল দত্ত ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান। তারা আবেদনপত্রে উল্লেখ করেছেন উপজেলার অত্র ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক গত-২৭ জানুয়ারি-১৯ ইং তারিখে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উপকার ভোগীদের যে চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদনের জন্য কালীগঞ্জ সমাজ সেবা অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ সরকারি পরিপত্র ও নীতিমালা বহির্ভূত। সরকারের মহতী উদ্দেশ্যকে বিঘ্ন ঘটানোসহ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই তালিকা তৈরি করে সমাজ সেবা অফিসে প্রেরণ করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

সূত্রমতে, যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তাতে ৬১ জনকে বয়স্ক ভাতা, ২৭ জনকে বিধবা ও স্বামী নিগৃতা দুঃস্থ মহিলা ভাতা এবং ২৩ জনকে অচল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ মোট ১১১ জনকে উপকারভোগীর নাম উল্লেখ করে তালিকাভুক্ত করে জমা দেওয়া হয়েছে। যাতে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। তারা এই তালিকা তদন্তপূর্বক পুনরায় সরকার ঘোষিত নীতিমালা মোতাবেক প্রকৃত উপকারভোগীরা যাতে তালিকাভুক্ত হয় সে ব্যাপারে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এবং সমাজ সেবা কর্মকর্তার সু-দৃষ্টি কামনা করা হয়েছে। ১নং সুন্দরপুর-দূর্গাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে সভাপতি নিখিল দত্ত ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান এক লিখিত অভিযোগে জানায়, আমরা দুইজন ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে ওই তালিকা তদন্তপূর্বক বিধি মোতাবেক করার জন্য ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেছি। তারা ওই আবেদনে উল্লেখ করেছেন সুন্দরপুর-দূর্গাপুর ইউনিয়নের বর্তমান নির্বাচিত চেয়ারম্যান ইলিয়াস রহমান মিঠু গত সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে কালীগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে অবস্থান করে।

এরপর গত ২৭ জানুয়ারি চেয়াম্যানের অনুপস্থিতিতে এক সভায় উক্ত ১১১ জন উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয় এবং গত ৩ ফেব্রয়ারি কালীগঞ্জ সমাজসেবা অফিসে ৪১.০১.৪৪৩৩.০০০.০৫.০০১.১৭.৮(৪৫) নং স্মারক মোতাবেক প্রেরণ করা হয়। উক্ত তালিকায় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, লাখোপতি, কোটিপতিদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ যে জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের এ কর্মসূচিটি চালমান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সেই হতদরিদ্র ব্যক্তিরা বাদ পড়েছে ফলে তারা সরকারের এ আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে বয়স্কভাতা পাওয়ার উপযুক্ত দরিদ্র ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার অনিয়ম সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

এই ইউনিয়নের স্বচ্ছল পরিবারের তালিকায় যাদের নাম দেওয়া হয়েছে তারা হলেন- ভাটপাড়া গ্রামের মৃত নেপাল দাসের ছেলে মধুসুদন দাস (৬৯), একই গ্রামের মৃত কুমারেশ দাসের ছেলে কমলেশ দাস (৬৭), দূর্গাপুর গ্রামের মৃত বসন্ত বিশ্বাসের ছেলে নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের (৭২)। এদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের গোয়ালে বিদেশি ৪টা গরু রয়েছে যার প্রতিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তার ১ ছেলে থাকে কানাডায় উচ্চ বেতনে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। একই গ্রামের মৃত জিতেন্দ্রনাথের ছেলে সোনাতন বিশ্বাসের মাঠে রয়েছে ২৫ বিঘা আবাদি জমি, দৃষ্টি নন্দিত পাকাবাড়িও আছে ২০টি গরু রয়েছে।

অন্যদিকে এই তালিকায় সম্পদশালী আরও যাদের নাম ভাতার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তারা হলো যথাক্রমে সিংদহ গ্রামের আব্দার আলী মন্ডলের ছেলে আনোয়ার মন্ডল (৬৬), কমলাপুর গ্রামের মৃত হারেজ আলী মন্ডলের ছেলে ইমারত আলী মন্ডল, একই গ্রামের মৃত আনছার আলী বিশ্বাসের ছেলে ইসরাইল বিশ্বাস (৮১), নিয়ামত আলী খাঁ এর ছেলে মতিয়ার রহমান খা (৬৬), মহাদেবপুর গ্রামের হরেন্দ্রনাথ পালের স্ত্রী আশালতা পাল (৭৩), একই গ্রামের মৃত গঞ্জাধরের ছেলে সুনিল সরকার (৬৮), সিংদহ গ্রামের ছবুর আলীর স্ত্রী নবিরন নেছা (৬৬), মহাদেবপুরের ধনী বাড়ির মৃত ধিরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের ছেলে অদ্যনাথ বিশ্বাস (৭১), ভাটপাড়া গ্রামের মৃত রসিক দাসের ছেলে কৃঞ্চপদ দাস (৬৬), মহাদেবপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিনের স্ত্রী জহুরা বেগম (৬৬), দূর্গাপুর গ্রামের জালাল মালিথার স্ত্রী সালেহা খাতুন (৬৬), সিংদহ গ্রামের মৃত খোরশেদ আলমের ছেলে জামাত আলী (৬০), মহাদেবপুর গ্রামের সুবল বিশ্বাসের স্ত্রী অনিতা বিশ্বাস (৫০)।

এ ব্যাপারে আদালত কর্তৃক জামিনে মুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ইলিয়াস রহমান মিঠু বলেন, আমি তালিকা করার কথা শুনেছি, কিন্তু তারা যখন ওই তালিকা চূড়ান্ত করে তখন আমি কারাগারে ছিলাম। ইউপি আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, কথিত একাই উক্ত ইউনিয়নের ৭টি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন। এগুলো হলো-সুন্দরপুর দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি, সুন্দরপুর বেসরকারি দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি, দূর্গাপুর ডিপটি মেশিন কমিটির সভাপতি, ইউনিনয়ন সোলার প্যানেলের দায়িত্ব, দশ টাকা কেজি দরে চাউলের ডিলার, বিআরডিবি উপজেলা সভাপতি ও ইউনিয়ন উন্নয়ন কার্য পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধি। তার ইন্ধনে কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অসহায় মানুষের ভাগ্য বঞ্চিত করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে আসছে। যে তালিকা চূড়ান্ত করেছে সেই তালিকাটি টাকার বিনিময় এবং স্বজনপ্রীতির প্রমাণও আছে। এই ইউনিয়নে দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে ৬নং ওয়ার্ড। অন্যান্য ওয়ার্ডে অল্প সংখ্যক কার্ড পেলেও তার নিজ ওয়ার্ডে ২৩ জনের নামের তালিকা করেছে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এইচএআর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue