বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

হারিয়ে যাচ্ছে জলাভূমি ও কৃষিজমি

নজরুল ইসলাম লিখন | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২২ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৪:৪৩ পিএম

হারিয়ে যাচ্ছে জলাভূমি ও কৃষিজমি

ঢাকা : জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কৃষিজমি হ্রাস সংক্রান্ত প্রতিবেদন পড়ে অবাক হয়ে গেলাম। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও আবাসনে দ্রুত কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। পাশাপাশি বাড়ছে জনসংখ্যা। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষিজমি সংরক্ষণে আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে প্রলম্বিত হয়ে চলেছে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া। আইনের খসড়া বছরের পর বছর ঘুরছে টেবিল থেকে টেবিলে। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত।

এক গবেষণায় কৃষিজমি বলতে ফসলি জমি, বন, নদী, লেক, বিল ও হাওর, চা বাগান ও লবণাক্ত এলাকাকে ধরা হয়েছে। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে কৃষিজমির মোট পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩ হাজার ৬৫৪ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের ৯১ দশমিক ৮৩ ভাগ। ২৪ বছরের মাথায় ২০০০ সালে কৃষিজমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২৭ লাখ ৪২ হাজার ২৭৪ হেক্টর এবং ৩৪ বছরে অর্থাৎ ২০১০ সালে এই কৃষিজমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৪ হেক্টর। গবেষকদের হিসাবে, এই এক দশকে কৃষিজমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৪১৬ শতাংশ হারে কমেছে।

বহু বছর ধরেই দেশে কৃষিজমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তার প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে। সেই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বাড়িঘর নির্মাণ, জলাভূমি ভরাট, চিংড়ি চাষ, তামাক চাষ, দোকানপাট নির্মাণ, হাউজিং সোসাইটি, ইটভাটা, বনভূমি ধ্বংস করার আত্মবিনাশী প্রক্রিয়া চলছে। এভাবে চলতে থাকলে বসবাস উপযোগী পরিবেশই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, নিকট-ভবিষ্যতে সমগ্র জনগোষ্ঠীই এক বিপর্যয়কর অবস্থায় গিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ ছোট একটি ভূখণ্ড। অথচ জনসংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১৬ কোটি। এখনই মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অতি সামান্য। তারপরও যদি কৃষিজমি এমন দ্রুত হারে কমতে থাকে, তাহলে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দেওয়া একসময় কষ্টকর নয়, রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ঢাকা শহরে প্রায় ২ কোটি লোকের বসবাস। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৮ হাজার ৪৬১ জন লোকের বাস। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৫ ভাগ। হুড় হুড় করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বসবাসের জন্য বাড়িঘর তৈরিতে জমির চাহিদাও বেড়েছে বহু গুণ। অন্যদিকে জমির চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জমির দামও বৃদ্ধি পেয়েছে অত্যধিক। কৃষিজমিতে তৈরি হচ্ছে আবাসন। আর হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমি। উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক আয় কমে যাচ্ছে। খাদ্যাভাব দেখা দিচ্ছে।

এমনিতেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। আর সে কারণে সাগরতীরের অপেক্ষাকৃত নিচু জমি লোনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ লোনা পানিতে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মরুকরণের প্রভাব বেশি করে দেখা যাচ্ছে। ভূগর্ভের পানির স্তর অত্যধিক নিচে নেমে যাওয়ায় এখনই অনেক জায়গায় গভীর নলকূপে পানি ওঠে না। খাল-বিল, নদী-নালা, ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে যেতেও পারছে না। দেশে মোট ভূমির ষাট শতাংশ কৃষিকাজে ব্যবহূত হলেও প্রতিবছর এক শতাংশ হারে ফসলি জমি হ্রাস পাচ্ছে। যার পরিমাণ ৬৯ হাজার হেক্টর বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধ্বংসের হাত থেকে কৃষিজমি রক্ষা ও কৃষকের অধিকার রক্ষা করা যাচ্ছে না।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩৪ বছরে দেশের অকৃষি জমি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৮ দশমিক ১৭ ভাগ থেকে ১৬ দশমিক ৪৭ ভাগে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৬ সালে দেশে মোট ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৬০৫ হেক্টর অকৃষি জমি ছিল; যা ২০০০ সালে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৩০৭ হেক্টরে পরিণত হয়। পরবর্তী ১০ বছরে গড়ে দশমিক ৪১৬ শতাংশ হারে বেড়ে ২০১০ সালে ২৪ লাখ ৮৬৭ হেক্টর হয়েছে। অকৃষি জমির মধ্যে গ্রামীণ আবাসন, শহুরে ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং চাষ অযোগ্য পতিত জমিকে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ আবাসনেই সবচেয়ে বেশি জমি গেছে। গত দশকে বছরে গ্রামীণ আবাসনে শূন্য দশমিক ২০৮ শতাংশ হারে বেড়ে ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ১২৩ হেক্টর হয়েছে; যা ২০০০ সালে ১৪ লাখ ৫৮ হাজার ৩১ হেক্টর এবং ১৯৭৬ সালে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬৩৭ হেক্টর ছিল। বর্তমানে গ্রামীণ আবাসন খাত দেশের মোট আয়তনের ১২ দশমিক ১২ ভাগ দখল করে রয়েছে।

দেশে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরিকল্পিত আবাসন, নগরায়ণ, শিল্পায়ন। যেখানে খুশি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে আবাসন প্রকল্প। স্থাপন করা হচ্ছে শিল্পকারখানা। ব্যক্তিগত বাড়িঘর কৃষিজমিতে তৈরি হচ্ছে। অতীতের তুলনায় পাঁচগুণ হারে কমছে ফসলি জমি। সম্প্রতি জাতিসংঘের সহায়তায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (এসআরডিআই) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক দশকে প্রতিবছর দেশে ফসলি জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর করে কমছে; যা মোট ফসলি জমির শূন্য দশমিক ৭৩৮ শতাংশ। অথচ এর আগের তিন দশকে প্রতিবছর ফসলি জমি কমেছে মাত্র ১৩ হাজার ৪১২ হেক্টর। একই সঙ্গে প্রতিবছর আবাসন খাতে ৩০ হাজার ৮০৯ হেক্টর, নগর ও শিল্পাঞ্চলে ৪ হাজার ১২ হেক্টর এবং মাছ চাষে ৩ হাজার ২১৬ হেক্টর জমি যুক্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষিজমি সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ’১৩ সালে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে পাঠানো হয় মন্ত্রিসভায়। মন্ত্রিসভায় এটি একদফা অনুমোদন দিলেও পরে কিছু সংশোধনীর জন্য আবার ফেরত পাঠানো হয়। এরপর একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও এখনো তা রয়ে গেছে পর্দার আড়ালে। দীর্ঘ সময় ধরে আইনটি না হওয়ায় ক্রমান্বয়ে কমছে কৃষিজমি।

পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, রূপগঞ্জে পূর্বাচল সিটি, পূর্বাচল আমেরিকান সিটি, পূর্বাচল গোল্ডেন সিটি, পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্প, পূর্বাচল ঠিকানা, আশালয়, ঢাকা ভিলেজ, ভুলুয়া রয়েল সিটি, ইস্টার্ন হাউজিং, পোর্ট লিং হাউজিং, বসুন্ধরা হাউজিং, পারফেক্ট প্রকল্প, ঢাকা সিটি, ফুলমেলা, জেএমবি হাউজিং প্রকল্প, আনন্দ হাউজিং, ফুলজান, এনআরবি, এফআইসিএল, বেস্টওয়ে হাউজিং, বাসেবা হাউজিং, গ্রীন সিটি, পিক্সজেল সিটি, বিসিএস, ওয়েলফেয়ার, ওয়েলকেয়ার, আশিয়ান গোল্ডেন সিটি, নিউ ঢাকা, আশিয়ান শীতলছায়া, হোয়াট ইস্টোন হাউজিং প্রকল্প নামে সাইনবোর্ডে ভরে গেছে ফসলি জমিগুলো। ঢাকা শহরের চারদিক ঘিরে সরকারের নতুন শহর বা উপশহর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আশপাশের জমিগুলো তারা দখলে নিচ্ছে।

হাউজিং কোম্পানিগুলো তাদের নামের আগে ঢাকার খুব কাছে নতুন শহর বা উপশহর প্রকল্প শব্দটি ব্যবহার করছে কৌশলে। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে জনগণকে প্রতারিত করছে। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করছে হাউজিং কোম্পানিগুলো। ফসলি জমিতে অথবা কৃষিজমিতে ও জলাশয় ভরাট করে হাউজিং নিষিদ্ধ হলেও ফসলি জমিতে হাউজিং কোম্পানিগুলোর সাইনবোর্ড ও বালি ভরাটের দৃশ্য চোখে পড়ে। সুযোগ পেয়ে অনুমোদনহীন নামে-বেনামে রাতারাতি গড়ে ওঠা হাউজিং কোম্পানিগুলো জমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ফলে ওইসব অঞ্চলের জলাশয় ও কৃষিজমি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

আবার প্লট বরাদ্দের নামে প্রতিনিয়ত চলছে নানা ধরনের প্রতারণা। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে একই জমি একাধিকবার বহুসংখ্যক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। তাতে ক্ষমতাসীনরাই দখল পাচ্ছে। অনেকে ভুয়া মালিক সেজে অন্যের জমি হাউজিং কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। কারো আবার জমি পরিমাণে কম থাকলেও দখলীসূত্রে বেশি পরিমাণ বিক্রি করে দিচ্ছেন। অর্পিত এবং খাসজমিও বাদ পড়ছে না। নানা কৌশল অবলম্বন করে জমি বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী দালালচক্র কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করছে।

স্থানীয় জনগণের দাবি ‘দালাল হটাও, বাঁচাও দেশ, গড়তে হবে দালালমুক্ত কৃষিসমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ’। ঢাকা শহরের আশপাশের ফসলি জমি আর জলাশয় অবৈধভাবে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের খালগুলোও দখলদারদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সাধারণ কৃষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে, প্রলোভন দেখিয়ে, নানা কৌশলে জমি-জিরাত দখল করে নিচ্ছে। গ্রাম্য সহজ-সরল জনগণ বুঝে না বুঝে হাউজিং কোম্পানির কাছে তাদের জমি বিক্রি করে প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বন্যা ও জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে হলে শহরের চারপাশে পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হবে। কিন্তু হাউজিং কোম্পানিগুলো কোনো আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের কর্মকাণ্ড অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সেচ, নৌ-চলাচল, গবাদিপশুর খাদ্য, পাখির আশ্রয়স্থল, জ্বালানি ও জৈবসারসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভাব ও কর্মস্থল বিলীন হচ্ছে। হাউজিং কোম্পানির কর্মচারীরা বলেন, জমির মালিকরা জমি বিক্রি করে দিলে কারো কিছু করার থাকে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্যরকম। দালালদের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়।

তবে ফসলি জমি ও জলাশয় ধ্বংস করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। হাউজিং প্রকল্পগুলো সবদিক বিবেচনা করে আধুনিক পদ্ধতিতে শহরায়ন করবে বলে পরিবেশবাদীরা আশা প্রকাশ করেন।

লেখক : সাংবাদিক

 


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।