শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

হোটেলে সুন্দরীদের পাঠিয়ে যেভাবে টোপ ফেলতেন জি কে শামীম!

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার ০৪:১০ পিএম

হোটেলে সুন্দরীদের পাঠিয়ে যেভাবে টোপ ফেলতেন জি কে শামীম!

ঢাকা: যুবলীগ নেতা পরিচয়ধারী এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম টেন্ডার পেতে সংশ্লিষ্টদের খুশি করতেন টাকা দিয়ে। চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, মাদক ও অর্থসহ গ্রেফতার হওয়া জি কে শামীম টাকা দিয়ে কাজ না হলে উঠতি মডেল কিংবা সুন্দরী তরুণী ব্যবহার করে টেন্ডার বাগিয়ে নিতেন। তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জি কে বিল্ডার্সের নামে এ কাজগুলো আদায় করতেন।

জি কে শামীম সম্প্রতি র‍্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর এ বিষয়টি সামনে আসে। শামীমকে গ্রেফতার করার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও পর্যায়ে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। মেসার্স জি কে বিল্ডার্সের হাতে প্রকল্প যাওয়া মানেই ধাপে ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি। এমনকি প্রকল্পের কাজ কমিয়ে দেওয়ার পরও ব্যয় বাড়ানোর নজির গড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন তথ্য গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ‘টেন্ডার কিং’ হিসেবে পরিচিত শামীম গ্রে’ফতার হওয়ার পর তার সম্পর্কে একের পর এক নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। 

সূত্র বলছে, জি কে শামীমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ত মন্ত্রণালয়ে দাপটের সঙ্গে ঘোরাফেরা করেন। তার নাম জিয়া। অথচ তিনি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। আবার তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতাও নন। তবে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সর্বস্তরে তার প্রভাব চোখে পড়ার মতো। সবাই তাকে দেখলে সালাম দেয়, সমীহ করে। লিফটম্যানরা তটস্থ হয়ে পড়ে। মন্ত্রীর কক্ষে ঢোকার আগেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকেন কর্মচারীরা।

জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে যে কয়জন সিঙ্গাপুরে মেরিনা বে ক্যাসিনোতে নিয়মিত জুয়া খেলতে যান জিয়া তাদের অন্যতম। সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে জিয়া হাজার হাজার ডলার উড়িয়ে দেন অবলীলায়। দেশের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চলাফেরা করেন হেলিকপ্টারে। জিয়ার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। রাজধানীর গুলশান-১ এ তিনি থাকেন। গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে তাকে নিয়মিত দেখা যায়। এই জিয়ার রাজনৈতিক ‘হট কানেকশন’ সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। বিএনপি আমলে তিনি বিএনপির লোক। আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী লীগ। 

টেন্ডার বাগিয়ে আনতে তাকে ব্যবহার করতেন জি কে শামীম। এছাড়া টেন্ডার হলেই জি কে শামীমের কাছ থেকে যুবলীগের কমিশন হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকার ভাগ পেতেন যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। গ্রেফতারের পর জি কে শামীমের অফিস কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত খাতাপত্র ও টেলিফোনের ভয়েস রেকর্ড থেকে কমিশনপ্রাপ্তদের নামের তালিকাসহ এসব তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‌্যাব বলছে, জি কে শামীমের সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী অনেকের হট কানেকশন ছিল। রাজনৈতিক পদ-পদবিধারী নেতা ছাড়াও ৫-৬ জন মন্ত্রীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল ওপেন সিক্রেট। তার ৩টি মোবাইল ফোনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। কাজ পেতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পাশাপাশি সচিব থেকে শুরু করে প্রকৌশলীদের কাউকেই প্রাপ্য কমিশন থেকে বঞ্চিত করতেন না তিনি। বড় বড় টেন্ডার বাগিয়ে আনতে তিনি নানা অ’পকৌশল ব্যবহার করতেন। প্রভাবশালীদের দামি উপঢৌকন দিতেন। তাতেও কাজ না হলে উঠতি মডেল কিংবা সুন্দরী তরুণী ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ম্যানেজ করতেন।

এদিকে শামীমের মুঠোফোনে কথা বলার ভয়েস রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে,জি কে শামীম প্রভাবশালী অনেকের সঙ্গেই অবৈধ কমিশন ও ঘুষ লেনদেনের আলাপ করেন নিজের মোবাইল ফোনে। তবে প্রমাণ রাখতে অনেকের সঙ্গেই কথাবার্তা বলার পর ফোনে তা রেকর্ড করে রাখতেন। আবার অনেকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার ও ইমো ব্যবহার করে কথাবার্তা বললেও অন্য আরেকটি ফোনে তা রেকর্ড করে রাখেন। এ কারণে শামীমের মোবাইল ফোনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে অ’বৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের ভয়েস চিহ্নিত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

সূত্র জানায়, জিয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের একাধিক ভয়েস রেকর্ড রয়েছে তার মোবাইল ফোনে। এসব কথোপকথনের বেশির ভাগই চিত্রজগতের নায়িকা, উঠতি মডেল ও শোবিজ জগতের তারকাদের ঘিরে। টেন্ডার সংক্রান্ত কাজে তিনি অনেক সময় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করতে এসব মডেল ও উঠতি নায়িকাদের তাদের রুমে পাঠাতেন।

র‌্যাব আরও জানায়, জি কে শামীম অভিনব উপায়ে টেন্ডারবাজি করতেন। সম্প্রতি ই-টেন্ডার পদ্ধতি চালু হওয়ায় মূলত জি কে শামীমের মতো ঠিকাদারদের আরও সুবিধা হয়েছে। কারণ আগে থেকেই দরপত্রে এমন শর্ত যোগ করা হয় যাতে পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদার হিসেবে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। এজন্য সংশ্লিষ্ট দফতর ও অধিদফতরের উচ্চপর্যায়ে নীতিনির্ধারকরা নির্ধারিত রেটে কমিশন নিতেন।

দীর্ঘদিন ধরে এমন কমিশন লেনদেনের ফলে জি কে শামীম অনেক কর্মকর্তারই আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে পূর্ত সংক্রান্ত মেগা প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকেবিপিএল যুক্ত থাকে বলে জানিয়েছে র‍্যাব। 

আর এই কাজের কোনোটি তিনি নিজেই করেন। আবার কোনো কোনো কাজ জেভি’র (যৌথ উদ্যোগ) মাধ্যমে করেন। আবার বেশ কিছু কাজ তিনি অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫ থেকে ৭ পার্সেন্ট কমিশনে বিক্রি করে দেন। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের বেশ কয়েকটি কাজ নিতে জি কের প্রতিষ্ঠানকে রীতিমতো মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে হয়। এভাবে রূপপুরে কাজ পায় সাজিন ট্রেডার্স, এনডিই, পায়েল, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স, জামাল অ্যান্ড সন্স ও হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স।

র‌্যাব জানায়, জি কে শামীমের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একাধিক মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদক বা অস্ত্রের যে কোনো একটি মামলা তদন্ত করবে র‌্যাব। যাতে করে আইনের ফাঁক গলে তার মুক্তি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম শনিবার বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে জি কে শামীমকে গ্রে’ফতার করে র‌্যাব। বিভিন্ন মহলে তার হট কানেকশনের কথা শুনেছি। তবে আইনের চেয়ে কারও হাত লম্বা নয়। সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।

গেলো শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের নিকেতনের কার্যালয় থেকে সাত দেহরক্ষীসহ গ্রেফতারের পর শামীমকে র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে নেয়া হয়। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন শামীম। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন তিনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শনিবার দুপুরে সাত দেহরক্ষীসহ শামীমকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে এ থানায় অস্ত্র, মাদক এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আলাদা তিনটি মামলা করে র‌্যাব।

সোনালীনিউজ/এমএএইচ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue