মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

৭ বছরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার ১২:৩১ পিএম

৭ বছরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

ঢাকা : ১৮৬২ সালে সোনার চামচ (ব্রডগেজ লাইন) মুখে দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর নানা বাঁক পেরিয়ে প্রায় ১৫৬ বছরের ইতিহাস এই রেলওয়ের। কখনো আসাম-বাংলা রেলওয়ে, কখনো পূর্ব-বাংলা রেলওয়ে হয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ রেলওয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে প্রায় সাড়ে সাত কোটি জনঅধ্যূষিত রেলকে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশে রেলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কাজ চলতে থাকে।

পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ, জ্বালানী সাশ্রয় এই বাহনটি দীর্ঘদিন সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে রূপকথার দুয়োরানির ভূমিকায় ছিল। ক্রমাগত অবহেলা আর ভুল পরিকল্পনায় রেল খাত বহুদিন থেকে মুমূর্ষু দশায় আটকে ছিল। ঠিক সে সময় রেলখাতের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরিত করার লক্ষ্যে পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি উঠে। বাংলাদেশের মতো দেশে রেলের মতো গণপরিবহনের যে কোনো বিকল্প নেই তা বুঝেই সরকার রেলখাতকে বাঁচাতে এবং রেলওয়েকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনায় ২০১১ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ‘রেলপথ মন্ত্রণালয়’ নামে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করেন। প্রত্যাশিত সেই মন্ত্রণালয়একে একে পারি দিয়েছে ৭ বছর। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে ৮৪ মাস ১ দিন, ৩৬৫ সপ্তাহ ৩ দিন।

রেলওয়ের উন্নয়নে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, রেল বাজেট বৃদ্ধি, রেললাইন, লোকোমোটিভ ও কোচ বৃদ্ধিসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর তেমন কোন সুফল মিলছে না। রেলের দুটি লাইন সমান্তরাল বয়ে গেলেও আয় ও ব্যয়ের হিসেব গানের মত- “আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে”। একের পর এক স্টেশনগুলো বন্ধ, মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক, জড়াজীর্ণ রেল কারখানা, লোকবল সংকট, সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছতে না পারা, টিকিট পেতে ভোগান্তি, ছেঁড়া- নোংরা আসন এই অবস্থা থেকে বের হতে পারছে না।

জনগনের থেকে লাভ রেলের মূল উদ্দেশ্য নয় বরং যোগাযোগ নিরাপত্তা ও জনগণের সেবা প্রদানই হচ্ছে রেলের মূল দায়িত্ব। কিন্তু সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলেই বিপুল চাহিদা ও সম্ভাবনা থাকার পরেও যে রেলওয়েকে লোকসান দিতে হবে তারও কোন কারণ নেই। দুর্নীতি, ভুলনীতি, লুণ্ঠন ও অপচয়ের কারণে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বানিয়ে রাখা হয়েছে। গত আট অর্থবছরে (২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭) রেলে ব্যয় করা হয়েছে ৩৮ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা এবং পরিচালন খাতে ১৪ হাজার ৬০২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পে বিনিয়োগের হিসাব ধরলে, আট বছরে রেলের ঘাটতি ৩১ হাজার কোটি টাকা।

সুষ্ঠ টিকিট ব্যবস্থাপনার অভাব : তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বিবেচনায় মানুষ রেলপথে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। কিন্তু যাত্রীদের ভ্রমনের শুরুতেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিবর্গ এবং কালোবাজারিদের দৌরাত্বের ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শুধু ঈদ-নববর্ষ ইত্যাদি পালা-পার্বণে নয়, টিকিট না পাওয়ার সংকটে প্রতিদিনই ভুগতে হচ্ছে যাত্রীদের।

ট্রেনের সময়সূচী : এ অঞ্চলের গাঁয়ের একজন সহজ-সরল লোক একদিন নিকটবর্তী রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘৯টার গাড়ি কয়টায় যায়?’ এই কথাটা নিয়ে এ পর্যন্ত আমরা কম হাসাহাসি করিনি। কিন্তু বাঙালির জীবনে এর চেয়ে চরম সত্য আর কিছুই নেই।

রেলের যাত্রীসেবা : রেলের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী যাত্রী সাধারনের জন্য ট্রেনের অভ্যন্তরে কুশনযুক্ত বসার আসনের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুশনযুক্ত আসন তো নেই বরং ছাড়পোকা যুক্ত ভাঙা সিটই এখন যাত্রীদের যাত্রার সঙ্গী। শুধু তাই নয় সিটের গিয়ার স্প্রিং ও ফোম নষ্ট, হাতল ভাঙ্গা, বাথরুমের দরজার লক ও বাতি নষ্ট। এসি বগিতে এসি নষ্ট, এসির পানি পড়ে সিট ও মেঝে ভিজে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এছাড়া প্রথম শ্রেণীর বগির যাত্রীরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যেমন (সাবান, টাওয়েল, এয়ার ফ্রেশনার)। বেশ কয়েকটি দরজা ও জানালার কাঁচ ভাঙা, কিছু ক্ষেত্রে লক নষ্ট থাকায় যাত্রী নিরাপত্তা ব্যাহত হচ্ছে।

রেলওয়ের গৃহিত প্রকল্পসমূহ ও প্রাপ্তি : উন্নয়ন প্রকল্প সংক্রান্ত নথি অনুসারে, বর্তমানে রেলে উন্নয়ন প্রকল্প চলমান আছে ৪৮টি। এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়ন হওয়ার পথে। কিছু মাঝপথে আছে, আর কিছু কিছু প্রকল্প অনুমোদন হয়ে আছে। গত সাত বছরে ৪০টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রায় প্রকল্পেরই সুফল পাচ্ছে না রেলওয়ে। যেমন: ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে প্রথম ডেমু ট্রেন চালু করা হয়। কিন্তু বিগত ৫ বছরে এই ট্রেন যাত্রী পরিবহন করে ১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় করলেও এরজন্য ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। ৬৫৪ কোটি টাকা দিয়ে কিনে ২০ সেট ডেমু ট্রেনের ১১ সেটই এখন নষ্ট।

মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক : বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে বর্তমানে লোকোমোটিভ আছে ২৭৮টি। এর মধ্যে ১৯৫টি ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। রেলের বহরে ৪০ বছরের বেশি পুরনো ইঞ্জিন রয়েছে ৯৩ টি ইঞ্জিন। যাত্রীবাহী ১ হাজার ৬৫৬টি কোচের মধ্যে ৫৯২টি মিটার গেজ ও ২৬৬টি ব্রড গেজ বগির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। অপর দিকে পণ্যবাহী ৮ হাজার ৬৮০টি ওয়াগনের মধ্যে ৩ হাজার ৯৩৯ টির আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। ফলে লোকোমোটিভ এর যান্ত্রিক ক্রটির কারণে ট্রেনের সময়সূচি এবং নির্ধারিত গতি প্রায়ই বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি পন্য ও যাত্রী পরিবহনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না রেলওয়ে।

জড়াজীর্ন রেল কারখানা: বহু বছরের পুরোনো যন্ত্রপাতি, চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নেওয়া, আধুনিক যন্ত্রপাতি না কেনা, খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব ইত্যাদি কারণে ওয়ার্কশপগুলো ক্রমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনেক দক্ষ কর্মচারীও অবসরে চলে গেছেন। এক্ষেত্রে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ওয়ার্কশপ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে মেরামত কাজে ব্যবহারের জন্য ৭৩৭টি যন্ত্রপাতি থাকলেও মাত্র ৭২টি যন্ত্রের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (২০ বছর) আছে। বাকিগুলোর মধ্যে ২১৭টি যন্ত্রের বয়স ২০-৫০ বছরের মধ্যে। আর ৪৪৮টির বয়সই ৫০ বছরের বেশি।

এছাড়া সৈয়দপুর ওয়ার্কশপের তিন হাজার ১৮৪ জন কর্মচারীর পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১ হাজার ৩৭৯ জন। অপরদিকে পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের ৪৪৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৭২টির বয়স ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। বাকিগুলোর মধ্যে ১৬৫টি যন্ত্রের বয়স ২০-৫০ বছরের মধ্যে। শুধু ১২টির আয়ুষ্কাল ২০ বছরের নিচে রয়েছে।

লোকসান থেকে উত্তরণের উপায় : একসময়ের লাভজনক রেলওয়ে খাত নব্বই দশক থেকেই লোকসানের ঘানি টানতে থাকে। সময়ের চাহিদানুযায়ী উন্নয়নের উদ্যোগ না নেয়ায় অব্যাহত লোকসান আর হরিলুটের বোঝা বইতে বইতে গৌরবময় রেল রীতিমতো অভিশাপ হয়ে উঠেছে। কোন অপারেশনের জন্য তিনটি উপাদান আবশ্যকীয়। যেমন মেশিন, ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন আর এনভায়রনমেন্ট। রেলের এ তিনটি উপাদানই আজ অচল। ইঞ্জিন, জনবল, আর স্টেশন, তিনটিই রেলে সংকুচিত। মেশিন, এনভায়রনমেন্ট কার্যোপযোগী থাকলেও ম্যানের অভাব হলে স্টেশনও চলবে না, কোচও নড়বে না।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে নিন্মোক্ত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি: বিগত দিনগুলোতে যে জায়গাগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে তার পরিমাণ ও আয় সঠিকভাবে নিরূপণ করা; দখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা; রেলের জায়গা রেলের অধীনে রেখে উৎপাদন/আয় বর্ধনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা; স্টেশনগুলোর আশেপাশের জায়গা রেলের উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত করে উৎপাদন/আয় বর্ধনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইসিডি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা; কনটেইনার পরিবহনে সক্ষমতা বাড়ানো; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে সহজে ও কম খরচে মালামাল পরিবহন করতে পারে তার ব্যবস্থা করা; পণ্য পরিবহনে রেলের সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহকে বিশেষ করে মার্কেটিং বিভাগকে সচল করা; রেলের চলমান উন্নয়ন প্রকল্প সমূহের অনিয়ম বন্ধ করে তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; ডাবল লাইনের কাজ দ্রæত বাস্তবায়ন; রেল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত দপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন ও গতিশীল সম্পর্ক তৈরি করা; রেলের গবেষণা সেল তৈরি করা; রোলিং স্টক বৃদ্ধি করা; কারখানাগুলিকে আরো কার্যকর করা।

মাটির উপরের রেললাইন ধরে যে রেল চলাচল করে এটি শুধু একপ্রকার যানবাহন নয়, বাঙালির সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা এক এবং অদ্বিতীয় আপনজন। রাস্তায় চলাচলকারী দামি বাস, বহুমূল্যের প্রাইভেট কার কিংবা মিনিবাস দেখে বুঝতে পারি এগুলোর কোনোটাই আমাদের না। কিন্তু সামান্য ১০ টাকার টিকেট কেটে যখন ট্রেনে চড়ি তখন অনুভবে বুঝি ট্রেনটি আমাদের। কাজেই রেলওয়েকে স্বনির্ভর করে তুলতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই