৩০ বছরেও হয়নি ময়লাকান্দার স্থায়ী সমাধান

  • ময়মনসিংহ প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
৩০ বছরেও হয়নি ময়লাকান্দার স্থায়ী সমাধান

ছবি : প্রতিনিধি

ঢাকা: ৩০ বছর ধরে ময়মনসিংহ শহরের প্রায় ৩০০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষাক্ত ও বিপজ্জনক মেডিকেল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে চর কালীবাড়ি ময়লাকান্দা এলাকায়। সেই সাথে ফেলা হচ্ছে ৩৩টি ওয়ার্ডের সমস্ত আবর্জনা। এতে একদিকে দুর্গন্ধে দুষিত হচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে ছড়াচ্ছে রোগব্যাধি ও মশা মাছি। দীর্ঘদিনেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় উদ্বেগ স্থানীয়দের। 

শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ পথে মহাসড়কের পাশেই ফেলা হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের ময়লা আবর্জনা। বিভিন্ন বর্জ্য ফেলায় জায়গাটি পরিচিতি পেয়েছে ময়লাকান্দা নামে।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের সমস্ত ময়লা আবর্জনা ও  প্রায় ৩০০টি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এখানে। শুস্ক মৌসুমে দুর্গন্ধের তীব্রতা কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমে এর মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুন। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। এতে বাড়ছে পরিবেশ দুষণ, মশা মাছি ও বিভিন্ন রোগব্যাধি। দুর্গন্ধের কারণে দ্রুত যানবাহন চলায় ঘটছে দুর্ঘটনাও।

স্থানীয় বাসিন্দা মনির জানান, এই ময়লার দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। না আছে খাবার খাওয়ার শান্তি, না আছে ঘুমিয়ে শান্তি। সবসময় দুর্গন্ধ হয়ে থাকে পরিবেশ। যদি হাতে টাকা পয়সা থাকত তাহলে অন্য কোথাও জমি কিনে সেখানে চলে যেতাম। কিন্তু বাধ্য হয়ে এখানে থাকতে হচ্ছে।

সোহরাব হোসেন নামে একজন বলেন, প্রতিটা ঘরে শিশু বয়স্ক রোগী আছে। এই দুর্গন্ধে সব বাড়ির লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। এভাবে চলতে থাকলে এখানকার শিশুরা মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বড় হবে।

রাসেল মিয়া বলেন, এই এলাকার মানুষের সাথে কেউ আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়তে চায় না। ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে নানান সমস্যা দেখা দেয়। কেউ এই দুর্গন্ধ এলাকায় তাদের ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিতে চায় না। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে কোন আত্মীয় স্বজন এখানে আসতে চায় না। যার ফলে এই এলাকায় সামাজিক সম্পর্ক খুবই দুর্বল।

বয়স্ক ব্যক্তি মোতালেব হোসেন জানান, খেতে বসলে খাবারে মাছি উড়ে এসে বসে। ঘরে সবসময় মশা মাছির উপদ্রব থাকে। সন্ধ্যা বাড়লে মশার কারণে না থাকা যায় ঘরে, না থাকা যায় বাইরে। শীতের সময় এই দুর্গন্ধ কম থাকলে বৃষ্টি হলেই দুর্গন্ধ বেড়ে যায়। তখন এই এলাকায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যায়।

পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে সামাদ জানান, প্রতিদিন এই ময়লা পাড় হয়ে আমাদের স্কুলে যেতে হয়। এই এলাকায় আসলে বাতাসে দুর্গন্ধের কারণে বমিসহ মাথা ব্যথা করে। স্কুলে গিয়ে শরীর খারাপ লাগে। পড়ায় মনোযোগ দেওয়া যায় না। বাসায় ফেরার ফলে একই অবস্থা হয়। নাকে কাপড় চেপে বা দম বন্ধ করে এই এলাকার সামনে দিয়ে গেলেও দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।

রমজান ইসলাম নামে এক বাস চালক জানান, এই মহাসড়ক দিয়ে নেত্রকোনা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ সহ বিভিন্ন রুটে হাজার হাজার গাড়ী চলাচল করে। দুর্গন্ধের কারণে অনেকে এক হাত দিয়ে নাক ধরে গাড়ী চালায়। আবার অনেকে দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে দ্রুত গতিতে গাড়ী টান দেয়। এতে প্রায় সময় ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ লে.কর্নেল (অব) ড. মো.শাহাব উদ্দীন জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঐ এলাকায় সিটি কর্পোরেশন তাদের সমস্ত বর্জ্য ফেলছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের কথা চিন্তা না করে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। আধুনিক বিশ্ব ময়লা আবর্জনাকে পরিশোধন করে সেগুলোকে সম্পদে পরিণত করছে। আর আমরা সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে নির্মল বাতাসকে দূষিত করছি। এর ফলে মিথেন গ্যাস সহ বিভিন্ন গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে মানুষের দেহে প্রবেশ করছে। মানুষ জটিল সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সরকার তথা সিটি কর্পোরেশনের উচিত এই ময়লা আবর্জনাকে পরিশোধনে আধুনিক শোধনাগার নির্মাণ করা। 

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, কাঁচা ময়লা আবর্জনা গুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শহরের বর্জ্য গুলো যখন সেখানে ফেলা হচ্ছে সাথে সাথে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন ময়লা গুলোর বিষয়ে বিশ্বমানের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। সেখান থেকে বর্জ্য গুলোকে কেমিক্যালে রূপান্তর করা হবে। চারপাশে সবুজ বনায়ন করা হয়েছে। আগামীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

পিএস

Link copied!