ব্লেড দিয়েই ৩৫ বছর গরিবের সেবায় আবেদ তেলি

  • কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি  | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
ব্লেড দিয়েই ৩৫ বছর গরিবের সেবায় আবেদ তেলি

ছবি : প্রতিনিধি

কুড়িগ্রাম: কাঁচি নেই, চিরুনি নেই, নেই কোনো আধুনিক সরঞ্জাম। একটি ব্লেডই তাঁর একমাত্র ভরসা। ডান হাতে ব্লেড আর বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করে মানুষের চুল কেটে দেন আবেদ তেলি। বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক। এভাবেই প্রায় ৩৫ বছর ধরে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের পাশে রয়েছেন তিনি।

আবেদ তেলি নিজেও সচ্ছল নন। ছোট একটি দোকান রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি সাইকেলে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফলগাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এসব কাজের আয়েই চলে সংসার। তবে নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সময় দেওয়াকে তিনি আনন্দের কাজ হিসেবেই দেখেন।

প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের চুল কাটেন আবেদ। বিশেষ করে অর্থের অভাবে যারা সেলুনে যেতে পারেন না, তাদের অনেকেই তাঁর কাছে আসেন। কারও চুল বড় হয়ে গেলে নিজেই কাটার পরামর্শ দেন। চুল কাটার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত নখ কাটা ও পরিপাটি থাকার বিষয়েও মানুষকে সচেতন করেন।

আবেদ তেলি জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে এক স্কুলছাত্রের ঘটনা থেকেই তাঁর এই কাজের শুরু। একদিন স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরা এক শিশুর কথা শুনে তিনি জানতে পারেন, চুল বড় হওয়ায় শিক্ষক তার চুল ধরে টেনেছেন। কিন্তু পরিবারের কাছে চুল কাটানোর টাকা ছিল না। এরপর একটি ব্লেড এনে ওই শিশুর চুল কেটে দেন তিনি। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর বিনামূল্যের চুল কাটার পথচলা। ছেলে-পেলে আসে, আমাকে বলে ভালো করে কেটে দেন। যে যেভাবে চায়, আমি সেভাবেই চুল কেটে দিই। চুল কেটে দিলে তারা খুশি হয়, এতেই আমার ভালো লাগে।”

তিনি আরও বলেন, “অপরিষ্কার মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। চুল বড় হয়ে ঝাকড়া-পাকড়া থাকলে দেখতে ভালো লাগে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে মানুষকে সুন্দর লাগে, তাই টাকা-পয়সার কথা চিন্তা করি না।”

আবেদের কাছে ছোটবেলা থেকেই চুল কাটান আহছান হাবীব হাসান, রবি দাস জানান, ছোটবেলা থেকেই টাকা ছাড়াই আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই। আমাদের মতো অনেকেই তাঁর কাছে চুল কাটিয়ে থাকি। টাকা না থাকলেও তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।”

শাহ আলম সরকার বলেন, টাকার অভাবে যখন চুল কাটাতে পারি না, তখন আবেদ দাদাই আমার শেষ ভরসা। তাঁর কাছে চুল কাটাতে কোনো টাকা লাগে না। তাই অভাবের সময় তাঁর কাছেই আসি।”

স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন, “নিজে অভাবের মধ্যে থেকেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগ সমাজের অন্যদেরও মানবিক কাজে উৎসাহিত করতে পারে।”

কুড়িগ্রামের সহকারী সমাজসেবা অফিসার ববিতা খাতুন বলেন, “নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবেদ তেলির মতো মানুষের উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে পারে। তাঁর এই মানবিক কাজটি দরিদ্র মানুষের জন্যও বেশ উপকারী।”

রাজারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের আবেদ তেলির হাতে কাঁচি নেই, নেই বড় কোনো সেলুনও। আছে শুধু একটি ব্লেড আর মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা। সেই ইচ্ছাতেই ৩৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে চুল কেটে চলেছেন তিনি। অর্থের অভাবে সেলুনে যেতে না পারা মানুষের কাছে তাই আবেদ তেলি শুধু একজন নাপিত নন—তিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার এক ব্যতিক্রমী নাম।

পিএস

Link copied!