কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণ, সালিশে দেড় লাখ টাকায় রফাদফা

  • শরীয়তপুর প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণ, সালিশে দেড় লাখ টাকায় রফাদফা

ছবি : প্রতিনিধি

শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের জাজিরায় মাদরাসার ৯ম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ ওঠেছে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। ওই কিশোরী কিছুটা সহজসরল প্রকৃতির হওয়ায় সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধর্ষণ শেষে ভয়ভীতিও দেখিয়ে আসছিলো ওই ব্যক্তি। বিষয়টি জানাজানি হলে সালিশ করে অর্থদণ্ডের মাধ্যমে ঘটনার ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের মতো এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় স্থানীয় সালিশির হস্তক্ষেপে বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো ও মানবাধিকার লংঘনের শামিল বলছেন সচেতনমহল। যদিও অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস পুলিশের। 

স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়নের সফি কাজির মোড় চোকদার কান্দি এলাকায় ৯ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরীকে নিজ বাড়িতে একাধিকবার ডেকে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে সফি কাজির মোড়ের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী আতিক হাওলাদারের বিরুদ্ধে। পরে ওই ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় আনোয়ার চোকদার, আজিজুল চোকদার, বিলাসপুর ইউপি সদস্য জামাল খা, হাকিম মাদবর, আশ্রাফ উদ্দিন, নাসির মাদর সহ আরও কয়েকজন মিলে সম্প্রতি আনোয়ার চোকদারের বাড়িতে একটি সালিশি বৈঠক করেন। ওই সালিশি বৈঠকে অভিযুক্ত আতিক হাওলাদারকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা করা দেড় লাখ টাকা থেকে ১ লাখ টাকা ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারকে প্রদান করা হয়।

এদিকে ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার খুবই দরিদ্র এবং নিরীহ হওয়ায় তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযুক্তরা সালিশিতে মিমাংসা হতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আতিক হাওলাদার প্রতিবন্ধী ওই কিশোরীর সাথে যে কাজ করেছে তা খুবই জঘন্য। এঘটনা ধামাচাপা দিতে যারা সালিশি করেছে তারাও অপরাধ করেছে। তাদের প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা উচিৎ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

ঘটনার বিষয়ে কথা হয় ভুক্তভোগী কিশোরীর মায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘বাবা আমার ঘরে ৪টা মেয়ে। একজন বিয়ে দিয়েছি। আরও তিনটা মেয়ে ঘরে আছে। তাদের বিয়ে দিতে হবে। আমার এই মাইডার একটু মাথায় সমস্যা আছে। আমরা গরিব মানুষ।  এলাকার মুরুব্বিরা যা করছে তাই আমরা মাইনা নিছি। এগুলা নিয়া আর ঝামেলা করতে চাইনা।’’

এবিষয়ে জানতে চাইলে সালিশিতে নেতৃত্ব দেওয়া আনোয়ার চোকদার সালিশি-মিমাংসার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘‘আমাদের বংশের মেয়ে। ভবিষ্যতে বিয়ে দিতে হবে। সেই চিন্তা মাথায় রেখে আমরা বিষয়টি এক জায়গায় বসে সমাধান করেছি।’’

জানতে চাইলে সালিশিতে থাকা স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল খা সালিশি-মিমাংসার বিষয়ে স্বীকার করে বলেন, আমরা সার্বিক দিক চিন্তা করে ভালো মন নিয়ে বিষয়টি সমাধান করেছি। এখন যা হওয়ার হোক।

ধর্ষণের ঘটনায় গ্রাম্য বিচার-সালিশি না করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এরপরও তারা কেন এঘটনায় সালিশি করে মিমাংসা করলেন তা জানতে চাইলে ইউপি সদস্য জামাল খা বলেন, এসব আমরা বুঝিনা। আমরা যেটা ভালো মনে করেছি তাই করেছি।

ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত আতিক হাওলাদার কাছে জানতে গেলে তিনি কৌশলে গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে পালিয়ে যায়। এরপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের শরীয়তপুরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান বলেন, ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ। যেখানে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে ধর্ষণের ঘটনায় আপোষ মিমাংসা করাও ফৌজদারি অপরাধ। আমরা মনে করি যারা কিশোরী মেয়েটির সাথে এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তা মানবাধিকার লংঘন। অভিযুক্ত এবং সালিশি করা সকলকে আইনের আওতায় আনা উচিৎ।

এবিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহাম্মদ বলেন, এমন কোন ঘটনার বিষয়ে আমার জানা নাই। কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পিএস

Link copied!