ডিলার মনোনয়নে দলীয়করণ, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

  • রংপুর ব্যারো | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
 ডিলার মনোনয়নে দলীয়করণ, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

ফাইল ছবি

রংপুরের পীরগাছায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত তালিকার ব্যক্তিরাই শেষ পর্যন্ত 'কৃষি সার ডিলার' হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এই তালিকা প্রকাশিত হয়। তবে ডিলার মনোনয়নে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ওই তালিকার বিবরণীতে জানানো হয়, জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির (জেলা প্রশাসক) সুপারিশকৃত গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রেরিত স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে এবং সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে অস্থায়ীভিত্তিতে এই ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ৭ অক্টোবর প্রকাশিত এই তালিকায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির পক্ষে কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তার স্বাক্ষর করেন।

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, পীরগাছা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে মোট ১৯ জনের নাম রয়েছে। এর বাইরে রংপুর সদর উপজেলায় ৪ জন, কাউনিয়ায় ৬ জন, তারাগঞ্জে ৩ জন, বদরগঞ্জে ৯ জন, মিঠাপুকুরে ১৪ জন, পীরগঞ্জে ১৬ জন, গঙ্গাচড়ায় ৯ জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনে একজন নতুন সার ডিলার ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।

পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মনোনীত ডিলারদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কল্যাণী ইউনিয়নে জেলা কমিটির সুপারিশ তালিকার প্রথমে থাকা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিনের 'বেলী ফার্টিলাইজার' মনোনীত হয়েছে। পারুল ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার ১ নম্বরে থাকা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মতিন সরকারের 'মেসার্স নুহা ট্রেডার্স'। ইটাকুমারী ইউনিয়ন থেকে মনোনীত হওয়া 'মেহেজেবিন ট্রেডার্স'-এর স্বত্বাধিকারী মো. আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

অন্নদানগর ইউনিয়ন থেকে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী জয়িতা আক্তার জিনি, যার প্রতিষ্ঠানের নাম 'জয়িতা সার বিতান'। ছাওলা ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সহকোষাধ্যক্ষ জাকির হোসেনের 'মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স'। তাম্বুলপুর ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী সুইটি বেগম ('মেসার্স শামান্তা এন্ড সিফা ট্রেডার্স') এবং পীরগাছা সদর ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী মোছা. সুলতানা ফেরদৌসীর প্রতিষ্ঠান 'রিয়া এন্টারপ্রাইজ'।

এ ছাড়া কৈকুড়ি ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে মীর তৌফিক হাসান এবং কান্দি ইউনিয়নে মনোনীত হওয়া 'মেসার্স সান ট্রেডার্স'-এর স্বত্বাধিকারী আতাউর রহমান ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। আতাউর রহমানের বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু আবার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর দলীয় প্যাডে উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত ডিলার নিয়োগ-২০২৬ শিরোনামের একটি তালিকা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই তালিকা থেকেই জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। ১৯ জনের ওই তালিকায় বিএনপি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের স্ত্রী, অনার্স পড়ুয়া মেয়ে, ছেলে, শ্বশুর ও ফুফাতো ভাই ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের স্বজনদের নামও রাখা হয়েছিল।

ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক এবং কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও উপজেলা ও জেলা প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পীরগাছার বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের হিসাব অনুযায়ী, সাতটি ইউনিয়নেই সার ডিলারের পজিশন পেতে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত অডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়লেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সার ডিলার নিয়োগে টাকা গ্রহণের এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন।

এসএইচ 

Link copied!