বিক্ষোভে রণক্ষেত্র গাজীপুর, থমকে গেছে অর্থনীতির চাকা

  • গাজীপুর প্রতিনিধ | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম
বিক্ষোভে রণক্ষেত্র গাজীপুর, থমকে গেছে অর্থনীতির চাকা

ছবি: সংগৃহীত

সকালে দোকানের ঝাঁপ খোলার কথা, কিন্তু ভাঙচুরের আতঙ্কে বন্ধ রাখতে হচ্ছে সেটিও। কারখানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও কাজ পাচ্ছেন না শ্রমিকেরা। মহাসড়কে যানবাহন চলাচল করছে কম, কোথাও কোথাও আটকে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ন্যূনতম মজুরি মাসে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা শ্রমিক আন্দোলনে এমন স্থবিরতা তৈরি হয়েছে গাজীপুরে। 

আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বন্ধ থাকছে দোকানপাট ও বিপণিবিতান। এতে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহন মালিকেরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, থমকে গেছে গাজীপুরের অর্থনীতির চাকা।

শিল্প পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা সাত দিন ধরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন শ্রমিকেরা। শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও গত ১ নভেম্বর থেকে তা সহিংস রূপ নেয়। এরপর থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। গত ২ নভেম্বর সকাল থেকে কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় সাত ঘণ্টা যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুরসহ আশপাশের দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

সহিংসতার অংশ হিসেবে নাওজোড় এলাকায় একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। এর আগের দিন কোনাবাড়ী এলাকায় দুটি পুলিশ বক্স ও একটি কারখানার ঝুটের গুদামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং ভাঙচুর চালানো হয় ১৫টি যানবাহনে।

বুধবার সকালেও নগরীর সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকেরা। এ সময় যানবাহন ভাঙচুর করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এ ছাড়া নলজানি এলাকায় আন্দোলনের চেষ্টা করলে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করা হয়। আন্দোলনের ধাক্কায় বুধবার গাজীপুরের অন্তত ৪০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এদিকে চলমান আন্দোলনের মধ্যে হামলায় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আন্দোলনপ্রবণ এলাকার ব্যবসায়ীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলায় নিরাপত্তাহীনতা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় দোকানপাট খুলতে পারছেন না তারা। মৌচাক এলাকার মুদি দোকানি রাব্বি জানান, প্রতিদিনই শ্রমিকদের হামলা ও পুলিশের টিয়ারশেল ছোড়ার ভয়ে দোকান বন্ধ রাখতে হয়। ছোট দোকানটির আয় দিয়ে চলা সংসার এখন পুরোপুরি অচলাবস্থায় পড়েছে।

অন্যদিকে কারখানা বন্ধ থাকায় কাজ হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সোয়েটার খাতের চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা। শ্যানন সোয়েটার কারখানার শ্রমিক সালমা বেগম বলেন, উৎপাদিত পণ্যের ওপর তাঁর বেতন নির্ভর করলেও আন্দোলন ও সহিংসতায় কারখানা বন্ধ থাকায় তাঁকে বেকার বসে থাকতে হচ্ছে। এভাবে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চলতে থাকলে কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার এবং কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবহন খাতেও পড়েছে আন্দোলনের বড় নেতিবাচক প্রভাব। গাজীপুর জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তানভীর সিরাজ জানান, আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ায় বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে এবং বিভিন্ন রুটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান আটকে থাকায় ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে পরিবহন মালিকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, ভোগড়া বাইপাস এলাকায় টোল প্লাজা ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করলে ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় ১ হাজার ২০০ অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে বাসন থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, চলমান শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতা রোধে পুলিশ, আনসার ও এসআরবি সদস্যদের পাশাপাশি ১৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।

এসএইচ 

Link copied!