নীতি সুদহার কমানোর ফলে সাধারণ মানুষের পাতে কি সুখবর আসবে?

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ১, ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
নীতি সুদহার কমানোর ফলে সাধারণ মানুষের পাতে কি সুখবর আসবে?

দীর্ঘ ২১ মাস কড়া মুদ্রানীতির পথ হাঁটার পর অবশেষে সুর নরম করল বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ঝিমিয়ে পড়া বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ও বেসরকারি খাতে ঋণের খরা কাটাতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়াচ্ছে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে, যা কার্যকর হচ্ছে ২ আগস্ট থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ইউ-টার্নে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে— এটা স্পষ্ট। তবে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত যেখানে ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি’, সেখানে নীতি সুদহার কমানোর এই দাওয়াই সাধারণ মানুষের জীবনে কতটুকু স্বস্তি আনবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সুফল আমজনতার ঘরে পৌঁছাতে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লেগে যেতে পারে।

কেন এই উল্টো রথ?

টানা প্রায় দুই বছর সুদের হার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতির লাগাম পুরোপুরি টেনে ধরা যায়নি। উল্টো চড়া সুদের ধাক্কায় ব্যাংক ঋণের হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে ঠেকেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন তো দূরের কথা, ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে উদ্যোক্তাদের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে— যা বিগত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

মূলত বিনিয়োগে এই স্থবিরতা কাটাতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রবৃদ্ধির গতি ফেরাতেই নীতি সুদহার কমানোর এই কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি বনাম মূল্যস্ফীতির খাঁড়া

নীতি সুদহার কমার সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যাংক ঋণে। আগামী কয়েক মাসে ব্যবসায়িক ঋণ, গৃহঋণ কিংবা ব্যক্তিগত ঋণের সুদ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য আসল সংকট তো বাজারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারকে তাদের আয়ের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে শুধু খাবার কিনতে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঋণের সুদ সামান্য কমলেই কি চাল-ডাল, বাসাভাড়া কিংবা জ্বালানির দাম কমবে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণ মানুষের প্রকৃত সুফল নির্ভর করছে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি এবং মানুষের আয় বাড়ার ওপর।

আমানতকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

ব্যাংকাররা বলছেন, নীতি সুদহার কমার ফলে ঋণের সুদ যেমন কমবে, তেমনি ব্যাংকগুলো আমানতের (ডিপোজিট) সুদের হারও কমিয়ে দেবে। ফলে যারা ব্যাংকে টাকা জমিয়ে সেই লভ্যাংশ দিয়ে সংসার চালান, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মজীবীরা, তাদের আয় কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হলো।

লক্ষ্য যখন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি

সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। আর সেই লক্ষ্য ছোঁয়ার মূল চাবিকাঠি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে সেই মহাপরিকল্পনারই অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিশ্লেষকদের সাফ কথা— নীতি সুদহার কমানো একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু এটি কোনো ‘ম্যাজিক সমাধান’ নয়। কম সুদের ঋণের পাশাপাশি যদি বাজার কারসাজি বন্ধ না হয়, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট না কাটে এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে না আসে, তবে এই সিদ্ধান্তের সুফল কেবল বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের খাতার ভেতরেই বন্দি থাকবে; সাধারণ মানুষের পকেট পর্যন্ত পৌঁছাবে না।

এম

Link copied!