ভারত মহাসাগরে ইরানের হামলায় মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ব্যাটেলশিপ ধ্বংস

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
ভারত মহাসাগরে ইরানের হামলায় মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ব্যাটেলশিপ ধ্বংস

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবার এক নতুন ও ভয়ংকর মোড় নিয়েছে। পারস্য উপসাগর বা লোহিত সাগর ছাড়িয়ে এবার সরাসরি ভারত মহাসাগরের উন্মুক্ত জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ 'আর্লি বার্ক' ক্লাস ডেসট্রয়ারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এই হামলার দায় স্বীকার করে একে 'অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪' (Operation True Promise 4) হিসেবে অভিহিত করেছে।

উল্লেখ্য গত মাসের প্রথমার্ধে ভারতের আমন্ত্রণে শ্রীলঙ্কায় একটি নৌ বাহিনীর যৌথ মহরায় অংশগ্রহণ শেষে ফিরে আসার পথে ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে ইরানের একটি যুদ্ধ জাহাজ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে মার্কিন নৌবাহিনী যেখানে প্রায় ১০০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়। এর প্রতিশোধ হিসেবেই এই ঘটনাকে দেখা হচ্ছে।

যেভাবে চালানো হলো এই নিখুঁত স্ট্রাইক (কৌশলগত বিশ্লেষণ)
ইরানি সামরিক বাহিনী এই হামলার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং কৌশলগতভাবে উন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, হামলাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘ সময়ের গোয়েন্দা নজরদারির ফল।

সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ (Refueling Window): ইরানি বাহিনী মার্কিন ডেসট্রয়ারটিকে দীর্ঘক্ষণ ট্র্যাক করার পর সেই মুহূর্তটি বেছে নেয় যখন জাহাজটি মাঝ সমুদ্রে অন্য একটি সাপ্লাই জাহাজের সাথে জ্বালানি সংগ্রহের (Refueling) কাজ করছিল। এই সময়ে যুদ্ধজাহাজগুলো একটি হোস পাইপ দিয়ে অন্য জাহাজের সাথে বাধা থাকে, যার ফলে তাদের নড়াচড়া করার ক্ষমতা (Maneuverability) শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই 'ম্যাক্সিমাম ভালনারেবিলিটি' বা সর্বোচ্চ দুর্বলতার সুযোগটিই নিয়েছে ইরান।
 
দ্বিমুখী আক্রমণ পদ্ধতি (Saturation Strike): হামলাটি চালানো হয়েছে দুটি ভিন্ন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে, যা আধুনিক নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম:

 গদ-৩৮০ (Godd 380): এটি একটি হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল। এটি অত্যন্ত উচ্চতা থেকে শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানে।

তালাইয়েহ (Tallayeh): এটি একটি লো-অল্টিচিউড ক্রুজ মিসাইল, যা সমুদ্রের পানির সমান্তরালে রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে উড়ে গিয়ে জাহাজের ওয়াটার লাইনে আঘাত করতে সক্ষম।

এই দুটি ক্ষেপণাস্ত্র একসাথে আসার কারণে জাহাজের অত্যাধুনিক 'ইজিস' (Aegis) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একই সাথে আকাশ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ—দুই দিক সামলাতে গিয়ে হিমশিম খায় এবং ব্যর্থ হয়।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন ডেসট্রয়ারের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই সাপ্লাই জাহাজে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি ছিল, যা হামলার পর বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে। প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই ডেসট্রয়ারে হামলা বিশ্বজুড়ে নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

 মার্কিন প্রতিক্রিয়া ও নিরবতা
পেন্টাগন এই হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো নিশ্চয়তা বা অস্বীকার করেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যখন কোনো হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয় বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তখন ওয়াশিংটন সাধারণত 'কৌশলগত নিরবতা' পালন করে। এর আগে আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার গ্রুপে হামলার সময়ও একই ধরনের ধীরগতি সম্পন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এই হামলার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হুমকিতে পড়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের এই পালটা আঘাত প্রমাণ করছে যে, দেশটি তার সামরিক সক্ষমতা হারানোর পরিবর্তে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে।

এসআই

Link copied!