আরো ৩ সপ্তাহ বাড়ল লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১১:১২ এএম
আরো ৩ সপ্তাহ বাড়ল লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, বৈঠকটি ‘খুবই ফলপ্রসূ’ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সঙ্গে কাজ করে দেশটিকে হিজবুল্লাহর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, এই প্রক্রিয়া বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ, যার মধ্যে ইরান সম্পর্কিত উদ্যোগও রয়েছে।

গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর যুদ্ধবিরতি প্রথম ঘোষণা করা হয়, যা রোববার শেষ হওয়ার কথা ছিল। সাত সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সংঘাত বন্ধ করাই এর লক্ষ্য। এই সংঘাত গত কয়েক মাসে দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে এবং সীমান্তজুড়ে নিয়মিত হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোশেপ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু শিগগিরই হোয়াইট হাউসে সফর করবেন। তিনি বলেন, লেবাননের সামনে হিজবুল্লাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করব।

বৈঠকে উপস্থিত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। লেইটার বলেন, লেবানন থেকে এই ক্ষতিকর প্রভাব হিজবুল্লাহকে সরানোর লক্ষ্যেই উভয় দেশ কাজ করছে।

তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও মাটিতে উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। বৃহস্পতিবার রাতে হিজবুল্লাহ দাবি করে, তারা উত্তর ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুড়েছে, যা ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী  ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স প্রতিহত করেছে।

এর আগের দিন দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক সাংবাদিক নিহত ও আরেকজন আহত হওয়ার ঘটনায় লেবানন এটিকে যুদ্ধাপরাধ বলে অভিযোগ করে। যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তারা সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি।

এই নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ওয়াশিংটনের বৈঠকটি ছিল প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারে।

সংঘাতের পটভূমিতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে বড় ধরনের আঘাত হানার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যায়। এর জবাবে মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায় এবং দক্ষিণ লেবাননে সেনা মোতায়েন করে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২,২৯৪ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানে বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করে দেখানো হয়নি। অন্যদিকে, ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর হামলায় কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে এবং লেবাননে অভিযানে অন্তত ১৫ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতের কারণে লেবাননে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। দক্ষিণাঞ্চলের বহু গ্রাম ও বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।

হিজবুল্লাহ একটি শিয়া মুসলিম সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দল, যা লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং লেবাননের অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠী এর নিরস্ত্রীকরণ দাবি করলেও, হিজবুল্লাহ এখন পর্যন্ত তাদের অস্ত্র ছাড়ার বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহ দেখায়নি।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোশেপ আউনসতর্ক করে বলেছেন, জোর করে নিরস্ত্রীকরণ করলে দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এ বিষয়ে সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।

সামগ্রিকভাবে, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলেও স্থায়ী শান্তি এখনো অনিশ্চিত। কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং মাটির বাস্তবতার মধ্যে ফারাক থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

Link copied!